বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি কি চলতেই থাকবে?

মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন : চেনা পৃথিবী আজ বড় অচেনা। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের নিষ্ঠুরতায় বদলে গেছে পৃথিবী। কিন্তু বদলায়নি মানুষ। পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গরীবের চাল চুরির যে মহোৎসবের চিত্র উঠে আসছে তা রীতিমতো ভয়াবহ। নিজের নিঃশ্বাসকে যেখানে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে সেখানে মানুষ কি করে অসহায় গরীব মানুষের ত্রাণ চুরি করে? অথচ  দুর্বৃত্তরা জোট বেঁধে নেমে পড়েছে নগরে বন্দরে,গ্রামেগঞ্জে। যখন লিখছি তখন কিশোরগঞ্জের ভৈরব খাদ্য গুদামের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। তদন্ত কমিটির ভাষ্যমতে ৮১ টন চাল ও ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪২৬টি নতুন খালি বস্তার হদিস পায়নি। সেগুলো গুদামে মজুদ নেই। সরকারি হিসাবে এর মূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি। করোনার বিভীষিকায় যেখন জীবন বিপন্ন সেখানে চাল চুরির খবর দেখে অস্বস্তিবোধ আরো বেড়ে গেছে। বাড়ছে লাশের মিছিল। জীবন মৃত্যুর এ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও চাল চোরদের চৌর্যবৃত্তি থামেনি। লকডাউনের কারণে এক একটি দিন কয়েক বছর মনে হচ্ছে। ঘড়ির কাটা যেন কিছুতেই ঘুরছে না। এ পরিস্থিতিতে অদৃশ্য শক্রুর মোকাবেলায় পুরো বিশ্বের মানুষ যখন ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করছে তখন বাংলাদেশে চাল চুরির খবর পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হচ্ছে। এর চেয়ে লজ্জার একটা জাতির আর কী হতে পারে! বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের আগ্রাসী থাবায় জীবন আজ বিপন্ন। কোথাও যেন এতটুকু জায়গা নেই যেখানে দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। সবর্ত্র হাহাকার আর কান্নার আওয়াজ আকাশে-বাতাশে ভাসছে। কিন্তু আশার আলোর দেখা মেলছে না। বাংলাদেশে চলছে লকডাউন। প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে দেশের মানুষ। কি গ্রাম কি শহর সর্বত্র একই অবস্থা বিরাজমান। এই লকডাউনের কারনে কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। বন্ধ হয়ে আছে কল কারখানা। জাতির এই ক্রান্তিকালে যারা ত্রাণের চাল চুরি করছে,তারা কারা? প্রশাসন কি তা জানেন না? নিশ্চয় জানেন। যে সব জনপ্রতিনিধি চুরির দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছে তারা কি জনগণের ভোটে নির্বাচিত? এই সরকার বিরোধীমতালম্বীদের উপর যেভাবে নির্যাতনের স্টিমরোলার প্রয়োগ করেছে, তার ছিটেফোটাও যদি অসৎ দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করতো তাহলে স¤্রাট পাপিয়াদের জন্ম হতো না। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কথা এখনো মরুব্বীদের মুখে শোনা যায়। কিন্তু সে দুর্ভিক্ষ কেন হয়েছিল? এটা পর্যালোচনা করতে গিয়ে কিছু মানুষ মত দিয়েছেন যে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল মানবসৃষ্ট। সত্তর দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছিল। আর সে কারণে প্রতিটি দেশ তার নিজ নিজ খাদ্য মজুতের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু মন্ত্রী-এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি,খাদ্যশস্য মজুতের অব্যবস্থাপনা, প্রতিবেশী দেশগুলো হতে খাদ্যশস্য আমদানির ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। তবে বেসরকারি হিসেব মতে অনুমানিক এক লাখ বা তারও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। দেশব্যাপী ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে লুটপাট,দুর্নীতি ও অনিয়মের তেলসমাতি কারবার চলছে। বস্তা বস্তা চাল জব্দ,জড়িতদের আটক, জরিমানা, মামলা হলেও থামছে না চাল চুরির ঘটনা। ত্রাণ বণ্টনের দায়িত্ব ন্যস্ত যারা তাদের কেউ কেউ ভক্ষকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। চাল চুরির ঘটনা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। তবু কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলাম। একটি সহযোগি পত্রিকা রিপোট করেছে যে,দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩৬১ বস্তা চাল জব্দ করা হয়েছে। 

এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২২৬ বস্তা, জয়পুরহাটে ৮৭৫ বস্তা, বগুড়ায় ১৬৮ বস্তা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩১ বস্তা, মাদারীপুরে ২৬ বস্তা, খাগড়াছড়িতে ২৮ বস্তা ও ভোলায় ৭ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে। ইহা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই চাল বিতরণের অনিয়মের খবর পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়েছে। জামালপুরে যুবলীগ ও আওয়ামীলীগ নেতার গুদাম থেকে ৫০৪ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনার পুলিশ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহসভাপতিসহ ২ জনকে গ্রেফতার করেছে। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর বাজারের আওয়ামী লীগ নেতার একটি গুদাম থেকে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ৬২৫ মণ চাল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এ ঘটনায় গোপীনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আল ইসরাইল জুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

পটুয়াখালীতে জেলেদের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফ এর চাল চুরির ঘটনায় সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা মেম্বারস ফোরামের সভাপতি মো.মনিরুজ্জামান মনিরের বাসা থেকে ত্রাণের আড়াই টন চাল জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন। বরগুনায় জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৪ মেট্রিকটন চালের মধ্যে ২৭ মেট্রিকটন চাল আত্মসাৎ করার অভিযোগে এক ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ত্রাণ দেওয়ার ছবি তোলার পর ২৬টি পরিবারের কাছ থেকে তা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্রগ্রামের হাটহাজারীর এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। লকডাউনের আদেশ মানতে গিয়ে নি¤œ আয়ের মানুষ বেশি বিপাকে পড়েছে। কর্মহীন মানুষগুলোর ঘরে খাবার নেই। যাদের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তারা কি ঠিকমতো ত্রাণ পাচ্ছে কিনা তা খতিয়া দেখা প্রয়োজন। ব্র্যাকের এক জরিপে বলা হয়েছে দেশের ১৪ শতাংশের ঘর খাবার শূন্য হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশে চরম দারিদ্র্যের হার আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। 

সরকার যে পরিমাণ চাল বিতরণ করছে তা পর্যাপ্ত নয়। অথচ মরার উপর খাড়ার ঘা হিসাবে চাল চুরির ঘটনা বেড়েই চলছে। করোনায় ভয় সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ালেও কিছু মানুষরূপী অমানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে না। তারা মানুষ কি না? তা রক্ত পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন । তা না হলে মানুষ কি পারে এমন দুর্দিনে চাল চুরির হিম্মত দেখাতে পারে? স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ চোর মুক্ত হয়নি। সেজন্য তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেছিলেন,সবাই পায় সোনার খনি আমি পেয়েছি চোরের খনি। তাঁর শাসনামল থেকেই চোর, দুর্নীতিবাজরা সক্রিয় ছিল। যার ক্রমধারা এখনো চলছে। যে দেশে বালিশ দুর্নীতি,পর্দা দুর্নীতি, ব্যাংক লুটপাট হয় সেদেশে ত্রাণের চাল চুরি ঠেকাবে কে? সরষের ভেতর যদি ভূত থাকে ওই ভূত যেমন কেউ সরাতে পারেনি, তেমনি রাষ্ট্রের ভেতর যখন আইনের সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেয় তখন সেখানে হাজারো অপরাধ উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। তখন কারো কথায় কাজ হয় না। কথায় আছে তো চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। 

কারণ তারা করোনাও মানে না মানবতাও মানে না।ত্রাণ বিতরণের অনিয়ম প্রতিরোধে দেশের সেনাবাহিনী,স্থানীয় প্রশাসন, স্কুলের শিক্ষক,মসজিদের ইমাম, খতিব ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। দেশের প্রতিটি গ্রামে এই কমিটির মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করলে ত্রাণের চাল চুরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষ এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ