ঢাকা, বৃহস্পতিবার 4 June 2020, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১১ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

প্যারেন্টিং:শিশু বয়সই ভাষা শেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন: রাইয়ানের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। নার্সারিতে ভর্তি হয়েছে। একদিন সে তার মাকে হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বলল, 'আম্মু, মুঝে দুধ চাহিয়ে পি¬জ...'। রাইয়ানের আম্মু বাচ্চার মুখে এই নতুন ভাষা শুনে প্রথমে হেসে উঠলেও পরে তিনি তার স্বামীর কাছে সন্তানের এই 'ভাষাবিকৃতি' নিয়ে রীতিমত উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, টেলিভিশনে হিন্দি ও ইংরেজি কার্টুন দেখে দেখে তার ছেলের ভাষা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তার আরো ধারণা এত অল্প বয়সে একসাথে দু'/তিনটি ভাষা শেখা শিশুর মনোবিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে। কিংবা সে মাতৃভাষায় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থা তো এখন ঘরে ঘরে। তাহলে রাইয়ানের আম্মুর মত সব মায়েরাই কি এমনটি মনে করেন? 

যদি সত্যি সত্যিই তারা এতটা উদ্বিগ্ন হন, তাহলে আমরা বলব, শান্ত হোন এবং ব্যাপারটিকে খুব সিরিয়াসলি নেবেন না। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, শৈশব বয়সেই একটি শিশু একাধিক ভাষা শেখার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকে। সুতরাং দু'/তিনটি ভাষার মিশেলে শিশু যখন কথা বলে তখন উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বরং হতে পারে, দু'/তিন ভাষায় কথা বলার এই সক্ষমতা তার পুরো জীবনে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

একটি শিশু একই সময়ে কয়টি ভাষা শিখতে পারে :আপনি যদি ব্যাপারটিকে এভাবে ভাবেন তাহলেই এটি আপনার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে যে, আপনার শিশুর ব্রেনটি শূন্য পাত্রের মত পড়ে আছে, নতুন কিছু জানার জন্য সে প্রস্তুত। বিশেষ করে ভাষা শেখার জন্য সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং এক্ষেত্রে বিশেষ কোন সীমাবদ্ধতা তার নেই। সিঙ্গাপুরে বহু শিশু আছে, যারা মাত্র তিন বছর বয়সে স্কুলে যায় এবং সেই ছোট্ট বয়সেই তারা একটি দ্বিতীয় ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। কথাটি শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সেখানকার বাস্তবতাই এমন! সিঙ্গাপুর বহুভাষাভাষি মানুষের দেশ। সেখানকার বহুজাতিক সমাজ-সংস্কৃতির বাস্তবতায় নাগরিকরা প্রতিনিয়ত দু'/তিনটি ভাষায় কথা বলতে বাধ্য হয়। এটি তাদের কাছে তেমন কঠিন কাজ নয়। বরং উদার সাংস্কৃতিক মণ্ডলে বড় হওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা শিশু বয়সেই বহুভাষা রপ্ত করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয়, শিশুরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও দুই/তিনটি ভাষা শিখে রীতিমত পরিপক্বতা অর্জন করে। সুতরাং শিশুর একাধিক ভাষা শেখা দোষের বা ভয়ের কিছু নয়।

এ প্রসঙ্গে শিশু ভাষা বিশেষজ্ঞ বেথ ওয়াল্টন বলেছেন, 'বেশিরভাগ শিশুই একের বেশি ভাষা রপ্ত করে থাকে।' তিনি ইউএস টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত তার গবেষণামূলক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, জন্মের পর শিশুরা যখন ভাষা শিখতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যে একই সময়ে একাধিক বা বহুভাষা শেখার সক্ষমতা থাকে এবং কোন ধরনের কনফিউশন ছাড়াই তারা এটি করতে পারে। কারণ, প্রতিনিয়তই তাদের ব্রেন ডেভেলপড হয় এবং এক ভাষা থেকে অন্য ভাষাকে তারা পৃথকও করতে পারে।

আপনার শিশু একটি নতুন ভাষা শেখার জন্য কখন প্রস্তুত হয় : ভাষাতাত্ত্বিক ও ভাষা গবেষকদের মতে, একটি শিশু মাত্র দশ বছর বয়সেই একটি বিদেশি ভাষায় অনর্গল কথা বলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজ উইকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে একজন বিশেষজ্ঞ দাবি করেন যে, দশ বছর বয়সে একটি শিশু একটি বিদেশি ভাষা ঐ ভাষার নেটিভদের মতই আয়ত্ত করতে পারে। তবে দশ বছরের কম বয়সেও শিশুরা এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। তাদের মতে, যত কম বয়সে ভাষা শিক্ষা শুরু করা যায় ততই মঙ্গল। এর ফলে শিশুদের পক্ষে ভাষা শিক্ষা সহজ হয়। গবেষকরা আরো মনে করেন, শিশু বয়সে দ্বিতীয় ভাষা শিখলে পরবর্তীতে নিজের ভাষা ও বিদেশি ভাষা দুটিতেই সমান দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তবে এই দক্ষতা নির্ভর করে যুগপত্ ও নিয়মিত চর্চার উপরে।

শিশুরা দ্বিতীয় ভাষা কীভাবে শিখবে :সাধারণভাবে শিশুদের দ্বিতীয় ভাষা শেখার দুটি প্রধান উপায় রয়েছে: যুগপত্ অথবা ক্রমানুসারে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের National association for the education of young children- এর 'Office of the Applied Research' এর কো-অর্ডিনেটর লিন্ডা সি-হালগুনসেথ তার How children learn a second language শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন, তিন বছরের কম বয়সী যেসব শিশু একসাথে দুটি ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে তাদেরকে বলা হয় যুগপত্ শিক্ষার্থী (simultaneous learners)। তিনি মনে করেন যুগপত্ শিক্ষার্থীরা ছয়মাস বয়স হওয়ার আগেই উভয় ভাষা শেখা শুরু করে এবং তখন তারা কোন একটি ভাষাকে অন্যটির চেয়ে প্রাধান্য দেয় না। প্রকৃতপক্ষে ছয় মাস বয়স হওয়ার আগেই তারা ভাষা রপ্ত করা শুরু করে এবং এক বছর বয়সের মধ্যে কোন একটির প্রতি বিশেষ অনুরাগী হয় এবং সেটিকে গ্রহণ করে। তিন বছর বয়সের মধ্যে তারা যুগপত্ দুটি ভাষা শিখে ফেলতে সক্ষম হয়। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে শিশু বয়সই হচ্ছে বিদেশি ভাষা শেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এবং এ বয়সেই তারা নেটিভদের মত কথা বলতে শেখে।

গবেষণাটিতে বলা হয়, চার থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুরা শুধুমাত্র নিরব দর্শক হয়ে থেকে শব্দ ও ধ্বনির স্পষ্ট উচ্চারণ শুনে ইংরেজি ও ফরাসী ভাষার তফাত্ বুঝতে পারে। এমনকি শিশুটি যদি একক ভাষাভাষি পরিবারে বেড়ে ওঠে তাহলেও। এতে আরো বলা হয়, ছয় মাস বয়সে শিশুরা একাধিক ভাষার মধ্যকার শ্রুতিগত পার্থক্য সনাক্ত করতে শুরু করে এবং যে ভাষাটির প্রকাশ তাদের সামনে বেশি করা হয় সেটির প্রতি সে যথাসম্ভব অনুরক্ত হতে শুরু করে। ঠিক এ কারণেই ছয় থেকে এক বছর বয়সী শিশুরা তাদের সামনে উচ্চারিত ভাষাগুলোর সুনির্দিষ্ট শব্দসমূহ সঠিকভাবে শুনতে ও বুঝতে পারে এবং এটি তাদেরকে নন নেটিভ ভাষার শব্দসমূহের পার্থক্য বড়দের তুলনায় ভাল বুঝতে পারে। অবশ্য ১২ মাস বয়সের পর থেকে তাদের এই সক্ষমতা আবার লোপ পেতে শুরু করে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা ক্রমানুসারী বা ধারাবাহিক শিক্ষার্থীদের তালিকায় ফেলেছেন সেসব শিক্ষার্থীদেরকে যারা ইতোমধ্যে একটি বিশেষ ভাষার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছে অতঃপর একটি দ্বিতীয় ভাষা শিখতে শুরু করেছে। ভাষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই শ্রেণিটিই সবচেয়ে কমন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা যে কোন বয়সী হতে পারে। তবে তাদের শৈশবকালীন চরিত্র অথবা মোটিভেশন ভাষা শিক্ষার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে হালগুনসেথ মনে করেন।

গোলমেলে অবস্থা :এক নবীন শিক্ষার্থীর জন্য এটি খুবই স্বাভাবিক যে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণজনিত ব্যবহার তাকে কিছুটা দিশেহারা বা দ্বিধান্বিত করতে পারে। তবে সাময়িক এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে খুব একটা সময় লাগে না। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই প্রাথমিক দ্বিধা কেটে যায় এবং সচরাচর দুই থেকে তিন বছরের বয়সের মধ্যেই সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় এবং শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই একাধিক ভাষা শেখার কাজে এগিয়ে যায়। সাধারণত সাত বছর বয়সেই শিশুরা যে কোন নতুন ভাষা নিয়মিত চর্চা করলে সে ভাষাটিতে অনায়াসেই কথা বলতে পারে।

কোন কোন পিতা-মাতা হয়তো চিন্তিত হতে পারেন যে, দ্বিতীয় ভাষা হয়তো শিশুর প্রথম ভাষায় কথা বলার সক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ERIC Clearing House এর গবেষক ক্যাথলিন মার্কোসের মতে, ভিন্ন ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর প্রথম ভাষার উপর দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পায়। ভিন্ন ভাষার অবকাঠামো ও শব্দ ভাণ্ডার রপ্ত করার যোগ্যতা শিশুকে তার মাতৃভাষাকে আরো ভালোভাবে জানতে সাহায্য করে। ভিন্ন ভাষা জানার কারণে বরং শিশুরা নিজেদের সমাজে আরো বেশি অগ্রগতি ও সাফল্য লাভের সুযোগ পায়। #

ডিএস/এএইচ

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ