শনিবার ০৬ জুন ২০২০
Online Edition

করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি ও আইন

অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ : করোনা বর্তমান বিশ্বে এক আতঙ্কের নাম। করোনার কালো ছায়ায় মানুষ যেন অসহায়। করোনা ভাইরাস গত নভেম্বর মাসে মানুষে সংক্রমিত হয়। সার্স ভাইরাস পরিবর্তিত হয়ে নভেল করোনা কোভিড-১৯ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা এ রোগকে কোভিড-১৯ নামকরণ করে এবং ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এ রোগকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেয়। “করোনাভাইরাস” নামটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ করোনা থেকে যার বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘মুকুট’। বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রনিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এই ভাইরাসকে অনেকটা ক্রাউন আকৃতির মতো দেখেন। এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৬০ সালে। এই ভাইরাসটির দুই শতাধিক প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ছয়টি প্রজাতি শুধু মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। অতীতে সার্স এবং মার্স নামে যে দুটি ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল সেগুলোও ছিল করোনা প্রজাতির ভাইরাস। চীনে সর্বপ্রথম ধরা পড়লেও বিশ্বের প্রায়ই দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এ ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় ২ থেকে ১৪ দিন লাগে। সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা এবং জ্বর, যখন কেউ অসুস্থ বোধ করেন তখন এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আর শুরুতেই এসব উপসর্গ দেখে অনেক সময় বুঝা কঠিন যে এটি ভাইরাস নাকি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আত্মসচেতনতা খুবই জরুরি। স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। হাঁচি বা কাশির পরে হাত ধুয়ে ভালভাবে পরিস্কার করে নিতে হবে। কাশি বা হাঁচির আগে মুখ ঢেকে নিতে হবে। মাংস ও ডিম ভাল করে সিদ্ধ করতে হবে। সংক্রামিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতে হবে। নাক-মুখে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জনসমাগম এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং পশু-পাখি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সাবান বা সেনিটাইজার দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুয়ে নিতে হবে। ব্যবহৃত টিস্যু বা রুমাল যেখানে সেখানে ফেলা যাবেনা। মাস্ক পরে বের হওয়া দরকার, হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি থেকে বিরত থাকা দরকার। প্রচার-প্রচারণা করে জনসচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হয়ে নাক-মুখের সাবধানতার জন্য সচেতন করাতে হবে। রোগ বিস্তার যেন বন্ধ হয় তার জন্য সতর্ক করাতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলতে হবে। কোয়ারেন্টাইন মানে যে রোগের সংক্রমণ এড়াতে নিজেকে সবার থেকে একটি ঘরে আলাদা করে রাখা এবং অন্যদের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা। পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে আইন মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ২৬৯, ২৭০ ও ২৭১ ধারায় সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে। তাছাড়া সংক্রামক রোগ মোকাবেলা বিষয়ে আমাদের দেশে বিশেষ একটি আইন রয়েছে। জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে ‘‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮" প্রণয়ন করা হয়েছে। উক্ত আইনে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার নিকট গোপন করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তির উক্ত কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আবার যদি কোনো ব্যক্তি-মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাহার উপর অর্পিত কোনো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কোনো নির্দেশ পালনে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন সেক্ষেত্রে  অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আবার যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন সেক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ২ (দুই) মাস কারাদণ্ড, বা অনূর্ধ্ব ২৫ (পঁচিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোন অস্থায়ী বাসস্থানের বা আবাসিক হোটেল ও বোর্ডিং এর মালিক যদি জানতে পারেন যে তার ওই স্থানে থাকা কেউ এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তবে অবশ্যই সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসককে জানাতে হবে। ডাক্তারদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম মানতে হবে, অর্থাৎ তার অধীনে কোন সংক্রামক রোগী চিকিৎসা হলে, সিভিল সার্জনকে রোগী সর্ম্পকে সব ধরনের তথ্য দিতে হবে। এই আইনের অধীনে সংঘটিত কোন অপরাধের অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপীল নিস্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে। পরিশেষে বলব- করোনা থেকে মুক্তি পেতে মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট করুণা চাইতে হবে। পাশাপাশি আত্নসচেতনতা ও আইন মেনে চলতে হবে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ