ঢাকা, মঙ্গলবার 29 September 2020, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ১১ সফর ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

স্থবির পরিবহন খাতের র্কমহীন শ্রমিকরা দিশেহারা

স্টাফ রিপোর্টার: সারাদেশ লকডাউনে পরিবহন খাত স্থবির। গাড়ির চাকা ঘুরের না। সড়কে নেই মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু তাতে কি হবে মৃত্যুও মিছিল তো আর খেমে নেই। পরিবহন খাতে এই স্থবিরতায় এই খাতের শ্রমিকরা র্কমহীন হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের  দেখার কেউ নেই। যে শ্রমিক নেতারা  তাদের  নিয়ে বানিজ্য করতো তারাও আজ পাশে নেই। নজিরবিহীন এই পরিবহন সংকটে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

বাণিজ্যিক যানবাহন আছে ৮ লাখের বেশি। প্রতিটি পরিবহনকে দিনে দিতে হয় ৭০ টাকা করে চাদা । সে হিসাবে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। এর বাইরে অঘোষিত চাঁদার তো কোনো হিসাবই নেই। মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণের কথা বলে এসব চাঁদা আদায় হলেও এখন করোনাভাইরাসের দুর্দিনে তাঁদের পাশে নেই কেউ।

শুধু শ্রমিক পরিবহন মালিকেরাও আয়বঞ্চিত হয়ে কঠিন সময় পার করছেন। কারণ, তাঁদের ব্যাংকের বা গাড়ি সরবরাহকারী ডিলার কোম্পানিকে মাস শেষে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। সরকার বিভিন্ন খাতের জন্য  প্রণোদনার কথা ঘোষণা করলেও পরিবহন খাতের জন্য আলাদা কিছু উল্লেখ করেনি। ফলে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের এখন ত্রাহি অবস্থা। সাধারণ মালিকেরাও আছেন বেকায়দায়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, দেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে প্রায় ৪৪ লাখ। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব যান চালনার সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক। ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে পরিবহন চলাচল বন্ধ। পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মোট পরিবহন ব্যবস্থার ২-৩ শতাংশ হয়তো চলাচল করছে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু পণ্যবাহী যান, অল্প কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও কিছু মোটরসাইকেল। পরিবহন মালিক সমিতিগুলো বলছে, নজিরবিহীন এই পরিবহন সংকটে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক। আর তাঁদের বেতনও হওয়ার কথা মাসিক। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাস-ট্রাকের চালকদের প্রায় সবাই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চলেন। অল্প কিছু বড় কোম্পানি বাসচালকদের মাসিক বেতন দিয়ে থাকে। তবে তাদের মূল আয় হয় ‘ট্রিপের’ (যাত্রা) ওপর। অন্য বাণিজ্যিক যানের শ্রমিকদেরও একই অবস্থা। অর্থাৎ কাজ থাকলে আয়, না থাকলে নেই অবস্থা।

পোস্তখোলা থেকে ডিয়াবাড়ি এই রুটে বাস চালান নান্টু। তিনি বলেন, বেশির ভাগ চালক-শ্রমিক গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। তাঁর মতো যারা শেষ মুহূর্তে যেতে পারেননি তাদের কষ্টের শেষ নেই। দুই কক্ষের একটি বাসা। ভাড়া ১২ হাজার টাকা। এক কক্ষে ছোট দুই ভাই থাকেন। তাঁরাও পরিবহন খাতে কাজ করতেন। সবারই আয় বন্ধ। আরেক কক্ষে তিনি, স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, দুই মেয়ে ছলমাইদে একটা স্কুলে পড়ে। খুব একটা খারাপ ছিল না সংসার। কিন্তু গত কদিনে ঘরে বাজারসদাই নেই। কয়েক দিন ধরে পূর্বাচলের কাছে রাখা কতগুলো বাস-মিনিবাস রাতে পাহারা দেওয়ার কাজ নিয়েছেন। দিনে ৪০০ টাকা পান, তাও নিয়মিত না।

সারা দেশে বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো থেকে প্রতিদিন ৭০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। তা থেকে ৪০ টাকা পায় মালিক সমিতি। আর ৩০ টাকা শ্রমিক ইউনিয়নের ভাগে। মালিক সমিতিগুলো নানাভাবে বিভক্ত। তবে মূল সংগঠনটির নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান ওরফে রাঙা এবং আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর এক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য এবং সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এসব চাঁদার বাইরে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে গেটপাস (জিপি) নামে বিপুল চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া দূরপল্লার পথে কেউ বাস নামাতে চাইলে জেলা মালিক-শ্রমিক সমিতিকে মোটা অঙ্কের অনুদান বা চাঁদা দিতে হয়।

তাঁর সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, পরিবহন শ্রমিকেরা বস্তিবাসীর চেয়েও খারাপ অবস্থায়। একটানা পাঁচ দিন কাজ না থাকলে তাদের পক্ষে খাবার জোগাড় করা সম্ভব নয়। সমিতি কি করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে শ্রমিকেরা যাতে ত্রাণ বা ১০ টাকা কেজি চাল ঠিকভাবে পান, সে জন্য সমিতির পক্ষ থেকে ইউএনওদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশানুরূপ না হলেও কিছু কিছু সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ পরিবহনমালিকদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। প্রায় সবাই ব্যাংক ঋণ নিয়ে অথবা বিদেশি কোম্পানির ডিলার বা এজেন্টদের কাছ থেকে কিস্তিতে সুদাসলে যানবাহন ক্রয় করেন। তাদের মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। আয় বন্ধ থাকায় চালক সংসার চালাতে পারছেন না। আর সাধারণ পরিবহন মালিকেরা কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।

জানতে চাইলে খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কোম্পানি এনা পরিবহন থেকে শ্রমিকদের ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। সামনেও এই সহায়তা অব্যাহত রাখবেন। তিনি বলেন, সমিতির চাঁদার টাকা যৎসামান্য। এটা দিয়ে এই দুর্যোগ কাটানো যাবে না। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি প্রণোদনায় সেবা খাত বলা হয়েছে। তবে সেটা কবে, কীভাবে পাওয়া যাবে, সেটা একটা বিষয়। পোশাক খাত যেমন সবার আগে পেয়ে যাবে। তিনি জানান, অনেক পরিবহনমালিকের একটা বাস আছে। সেটা দিয়েই সংসার চালান। তাঁরা লজ্জায় চাইতেও পারছেন না। তাদের সহায়তার জন্য তারা তালিকা করছেন।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পরিবহন খাতে এমন অচলাবস্থার কথা মনে করতে পারছেন না পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। ২০১৩ ও ২০১৫ সালে দেশে হরতাল-অবরোধে ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও পরিবহনমালিকেদের করা তখনকার এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সেই কঠিন পরিস্থিততেও দেশের ৬০ শতাংশ গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যান চালু ছিল। বিশেষ করে সরকার ও সরকার সমর্থক পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় যান চালু রেখেছেন। আর এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সড়কে সড়কে যান বন্ধে পাহারা বসিয়ে কাজ করছে। এর বাইরে নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ স্থানীয় যানবাহন আছে ১০ লাখের বেশি। গ্রামে-গঞ্জে লকডাউনের কারণে এসব যানের চলাচলও প্রায় বন্ধ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশের সড়ক খাতে সঠিক বেতন কাঠামো কার্যকর না থাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক দৈনিক মজুরি বা ট্রিপ ভিত্তিক চাকরি করে থাকেন। অর্থাৎ দিনে আনে দিনে খায় অবস্থা। এখন তাঁরা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি বলেন, দেশে সড়ক ও নৌ যোগাযোগ খাতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি বৈধ-অবৈধ চাঁদা আদায় হয়। এই খাতের মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অনেকে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। এই ভয়াবহ দুর্দিনে কাউকে অসহায় পরিবহন শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ