শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অর্ধেকে নেমে এসেছে কনটেইনার ডেলিভারি আমদানি পণ্য ছাড়সহ চট্টগ্রাম চেম্বারের ১০ প্রস্তাব

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। বন্দর থেকে দৈনিক ১৮শ’ থেকে ১৯শ’ কনটেইনার ডেলিভারি হচ্ছে। এর মধ্যে কনটেইনার ডিপোতে যাচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২শ’ কনটেইনার। করোনা পরিস্থিতির আগে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বন্দরের বার্থিংয়ে জাহাজ আছে ১৬টি। এর মধ্যে কনটেইনার ভর্তি রয়েছে ১১টি জাহাজ। জেনারেল কার্গো জাহাজ রয়েছে ৫টি। চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণ ক্ষমতা ৬০ হাজার কনটেইনার। বর্তমানে বন্দরে ৪৫ হাজার কনটেইনার রয়েছে।
জাহাজ থেকে কি পরিমাণ কনটেইনার নামানো যাবে, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ। জেটিতে ভেড়ার পর জাহাজ থেকে চাইলেও সব পণ্য নামানো যাচ্ছে না। যে পরিমাণ কনটেইনার ডেলিভারি হচ্ছে। ওই পরিমাণ কনটেইনার জাহাজ থেকে নামানোর অনুমতি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। আমদানিকৃত কাঁচামাল ঔষুধ ও ফ্রোজেনদ্রব্য বন্দর থেকে ডেলিভারি নিতে হলে রেডিয়েশন পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব পরীক্ষা চালু না থাকায় বন্দরে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে শিগগির চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে। এতে বন্দরে সৃষ্টি হবে অলাবস্থা। বন্দর থেকে কনটেইনার ছাড়িয়ে নিতে প্রাইভেট ডিপোগুলো চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোনোভাবেই স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বন্দরের অভ্যন্তরে ডিপোগামী কনটেইনার মজুদ হয়ে আছে। বন্দরের অপারেশনাল কাজে গতিশীলতা আনার জন্য এ কনটেইনারগুলো জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। একই বি/এলের (বিল অব লেডিং) অন্তর্ভুক্ত সব কনটেইনার যাতে একসঙ্গে বন্দর থেকে বের করা যায়, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ভেসেল অপারেশনস, ইয়ার্ড অপারেশনসহ আমদানি কনটেইনার অপারেশন পরিচালনা ধরে রাখতে ডিপোগুলোর উদ্দেশ্যে পড়ে থাকা কনটেইনার বন্দর থেকে দ্রুত স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি বাড়াতে না পারায় জেটিতে অপারেশনাল কার্যক্রমে ধাক্কা লেগেছে। এটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা এরই মধ্যে অপারেশনে পরিবর্তন এনেছি। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের চিঠি দিয়েছে। বন্দর যে সমস্যার মুখোমুখি, আমরাও তো একই সমস্যায় আছি। বর্তমানে অফডকগুলোয় থাকা কনটেইনার আমদানিকারক বা রফতানিকারকরা নিয়ে না গেলে নতুন করে কীভাবে কনটেইনার রাখা যাবে? এর মধ্যে জনবল সংকট প্রকট হয়েছে।
বন্দর থেকে আমদানি পণ্য ছাড়সহ ১০টি প্রস্তাব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’র  সভাপতি মাহবুবুল আলম। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার সম্মুখীন। এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারকসহ ব্যবসায়ীদের সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অস্থিত্ব রক্ষায় সহায়তা করা এবং আমদানি পণ্য সামগ্রী বন্দর থেকে দ্রুত ছাড়করণ, ওষুধ ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে রাখা জরুরি। বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে ১০টি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন তিনি।
প্রস্তাবনাগুলো হচ্ছে, কাস্টম ক্লিয়ারিং চালু থাকলেও আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য, বিভিন্ন ফল-মূল ইত্যাদি বন্দর থেকে ছাড় করতে হলে এসব পণ্যের মধ্যে কোন  প্রকার জীবাণু আছে কি-না তা পরীক্ষা করার জন্য কোয়ারেন্টাইন এবং রেডিয়েশন পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব পরীক্ষা চালু না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। এসব পণ্য ছাড়করণের লক্ষ্যে কোয়ারেন্টাইন ও রেডিয়েশন পরীক্ষা করার জন্য অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তার লক্ষ্যে উল্লেখিত পরীক্ষা সম্পন্ন করে বন্দর থেকে ছাড় করণে সহায়তা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অফিস যাতে কার্যক্রম চালু রাখে তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমদানিকারকদের সহায়তা করার লক্ষ্যে মার্চ-মে পর্যন্ত বন্দরের সমুদয় চার্জ মওকুফ করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন অফডক ও শিপিং এজেন্ট এর ওয়্যার ফেয়ার চার্জ মওকুফ করতে হবে। কেননা, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক আমদানিকারক তাদের আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করতে পারছেন না। বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। সারাদেশে পণ্য পরিবহন অনেকাংশে বন্ধ থাকায় পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এসব বিষয় বিবেচনাপূর্বক আমদানিকারকদের জন্য বর্ণিত সময়ে সমুদয় পোর্ট চার্জ, অফডক ও শিপিং এজেন্ট এর ওয়্যার ফেয়ার চার্জ মওকুফ করার জন্য বিশেষভাবে আবেদন জানান তিনি।
এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি ইউটিলিটি বিল সারচার্জবিহীনভাবে পরিশোধের জন্য জুন পর্যন্ত সুযোগ দেয়া, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাই, এসব প্রতিষ্ঠানের দায়ভার কিছুটা লাঘবে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত আমদানি পর্যায়ে সব ধরণের ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান, সব সব টার্ম লোনের ইনস্টলমেন্ট এখন থেকে ৯০ দিনের জন্য রিশিডিউল  করা, স্বল্প মেয়াদী মুলধনের সুদ ৯০ দিনের জন্য মওকুফ করা, ১ মাসের গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল মওকুফ, সরকার নির্দেশিত বন্ধের সমপরিমান শ্রমিক মুজুরি প্রদান, জরুরি ঔষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং বর্তমানে কোন ক্যাশ ফ্লো না থাকলেও ব্যাংক ঋনের সুদ চলমান রয়েছে যা বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করেন চেম্বার সভাপতি।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম উত্থাপিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রলালয়ের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ