বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনায় বিশ্ব ক্রিকেটে কালো ছায়া

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : করোনাভাইরাস আতঙ্কে লন্ডভন্ড পুরো বিশ্ব। পৃথিবীর সব জায়গাতেই এখন একটাই আতংক। সেটা হচ্ছে করোনাভাইরাস। ক্রিকেটেও পড়েছে তার কালো ছায়া। ইতোমধ্যে বাতিল অথবা স্থগিত হয়ে গেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সিরিজ ও ঘরোয়া লিগসহ বিভিন্ন আয়োজন। ভারত সফরে প্রথম ওয়ানডে বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়ার পর সিরিজের বাকি দুই ম্যাচ না খেলে দেশে ফিরে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আর অস্ট্রেলিয়ায় দর্শকশূন্য গ্যালারিতে প্রথম ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হলেও তড়িঘড়ি দেশে ফিরেছে নিউজিল্যান্ড। বাতিল হয়ে গেছে অসিদের আসন্ন কিউই সফরও। দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে শ্রীলঙ্কায় উড়ে এসেছিল ইংল্যান্ড। একটি প্রস্তুতি ম্যাচও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচ শেষ হতে পারেনি। মধ্যপথে দেশে ফিরে গেছে জো রুটের দল। বাতিল হয়ে গেছে দুই টেস্টের সিরিজ। দেশে দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটও বন্ধ। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), যেটি এ মাসের ২৯ তারিখ থেকে অন্তত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত পেছানো হয়েছিল। সেটি এখন আদৌ শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশের সকল ঘরোয়া ক্রিকেট।
করোনায় বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফর স্থগিত হয়ছে। শেষ পর্বের সফরে একটি ওয়ানডে এবং দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলতে ২৯ মার্চ পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সিরিজটি আপাতত স্থগিত করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পিসিবি। স্বাগতিক বোর্ডের ঘোষণার পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজ স্থগিতের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পহেলা এপ্রিল করাচিতে একটি ওয়ানডে খেলার কথা ছিল দুই দলের। তিনদিনের বিরতির পর ৫ এপ্রিল থেকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে দুই দল মুখোমুখি হতো করাচিতে। কিন্তু করোনার প্রভাবে ঝুঁকি এড়াতেই পাকিস্তান সফরের বাকি দুটি ম্যাচ খেলতে আপাতত নারাজ। বিসিবি ও পিসিবি জানায়, ‘আলোচনার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে সফরের সূচী চূড়ান্ত করবে দুই বোর্ড।’ খুব শিগগিরই পাকিস্তানে যাওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের। মে মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য সফরে খেলবে আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। জুন-জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনটি টেস্ট। সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপ টি২০। আর অক্টোবর-নবেম্বর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার আগে বাংলাদেশ যাবে নিউজিল্যান্ডে। সেখানে খেলবে তিনটি টি-টোয়েন্টি। এই ফাঁকে অবশ্য ১০ দিন সময় পাবে, ওই সময়ে দুটি ম্যাচ আয়োজন করলেও করতে পারে দুই বোর্ড। নিরাপত্তা শঙ্কায় তিন দফায় পাকিস্তান সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ। এরই মধ্যে পাকিস্তানে দুই দফা গিয়েছিল তারা। প্রথম দফায় দুটি টি২০ এবং দ্বিতীয় দফায় সিরিজের প্রথম টেস্ট এসেছে টাইগাররাা। তৃতীয় দফায় একটি ওয়ানডে এবং টেস্ট খেলার কথা ছিল।
বাতিল হলো ভারত-দ.আফ্রিকা সিরিজও। ধর্মশালায় প্রথম ওয়ানডে বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়। বাকি দুই ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল লক্ষেèৗ ও কলকাতায়। ম্যাচ দুটি দর্শকশূন্য মাঠে গড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল বিসিসিআই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিরিজ বাতিল করা হয়। আইপিএল স্থগিত করা হয়েছে অন্তত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। রঞ্জি ট্রফির শেষ দিনে কোন দর্শক মাঠে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। করোনাভাইরাস আতঙ্কে ইন্ডিয়ান বোর্ড (বিসিসিআই) সব ধরনের ঘরোয়া প্রতিযোগিতা স্থগিত করে। এই তালিকায় আছে পেটাইম ইরানি কাপ, সিনিয়র উইমেন ওয়ানডে নকআউট, ভিজি ট্রফি, সিনিয়র উইমেন ওয়ানডে চ্যালেঞ্জার, উইমেন অনুর্ধ-১৯ ওয়ানডে নকআউট, উইমেন অনুর্ধ-১৯ টি২০ লিগ (সুপার লিগ ও নকআউট), উইমেন অনুর্ধ্ব-১৯ টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জার ট্রফি, উইমেন অনুর্ধ-২৩ নকআউট ও উইমেন অনুর্ধ-২৩ ওয়ানডে চ্যালেঞ্জার। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এগুলো স্থগিত থাকবে। মহামারী করোনাভাইরাস ভারতের ক্রিকেটাঙ্গনকে স্থবির করে দিয়েছে।
করোনার প্রভাবে আইপিএলের আকাশে শঙ্কার কালো মেঘ তীব্র হচ্ছে। সিরিজের মধ্যপথে ভারত ছেড়ে দেশে ফিরে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্তত ১৫ দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। যেটি এ মাসের ২৯ তারিখ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি যা তাতে ১৫ কিংবা ২০ এপ্রিলের মধ্যে আইপিএল শুরু করা যাবে কি না, সেটি নিয়েও সংশয় রয়েছে। অনুষ্ঠিত হলেও সময়ের স্বল্পতায় টুর্নামেন্টের আকার অনেকটাই ছোট হয়ে যাবে। এপ্রিলের ১৫, ২১, ২৫, ১ মে এবং ৫ মে- এই পাঁচ দিনের মধ্যে যে কোন একটা দিনে আইপিএল শুরু হতে পারে।
 তবে ইন্ডিয়ান বোর্ড (বিসিসিআই) পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজর রাখছে। টুর্নামেন্ট যেহেতু দেরিতে শুরু হচ্ছে, তাই ম্যাচের সংখ্যা কমানো হতে পারে। এখনও পর্যন্ত দর্শকহীন গ্যালারিতে খেলা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়েছে এসব নিয়ে। একই দিনে দুটি ম্যাচ বেশি করে দিয়ে ঘাটতি মেটানোর ভাবনাও রয়েছে সৌরভদের। তবে সবার আগে সবুজ সংকেত পেতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে, করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ কেটেছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যেতে পারে। সেই সবুজ সংকেত আগামী এক মাসের মধ্যে এসে যাবে, এমন নিশ্চয়তা এই মুহূর্তে কেউ দিতে পারছেন না। তাই আইপিএলের ভবিষ্যত আপাতত মেঘাচ্ছন্নই।
ইংল্যান্ড বাতিল করেছে শ্রীলঙ্কা সফর । ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কা সফরে প্রস্তুতি ম্যাচও খেলে ফেলেছিল। আজ বৃহস্পতিাবার থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল দুই টেস্টের সিরিজ। সেটি আপাতত বাতিল হয়ে গেছে। এক বিবৃতিতে ইসিবি জানিয়েছে, ‘করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যেহেতু বিশ্বজুড়ে খারাপ হচ্ছে, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডের (এসএলসি) সঙ্গে কথা বলে আমরা আমাদের ক্রিকেটারদের দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ফলে শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের আসন্ন টেস্ট সিরিজ স্থগিত থাকবে।’ ইংল্যান্ড বোর্ডের বক্তব্য, ‘এই মুহূর্তে আমাদের ক্রিকেটার ও সাপোর্ট-স্টাফের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাদের এখন তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিতে চাই। এটি অভূতপূর্ব এক অবস্থা এবং এসব সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের নাগালের বাইরে। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে আমাদের সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এই পরিস্থিতিতে তাদের অসাধারণ সমর্থনের জন্য। পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে শীঘ্রই হয়ত এই গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের জন্য শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসতে চাই।’ ইতোমধ্যে দেশে ফিরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন টেস্ট অধিনায় জো রুট।
অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড সিরিজও বন্ধ। সিডনিতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রথম ম্যাচটা হয়েছিল দর্শকশূন্য গ্যালারিতে। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সরকার জানিয়ে দেয় ১৪ মার্চের পর অস্ট্রেলিয়া থেকে কাউকে দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট (এনজেডসি) তাই যৌথভাবে সিরিজের বাকি দুই ওয়ানডে বাতিলের বিষয়ে একমত হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে সিডনিতে শূন্য গ্যালারিতে প্রথম ওয়ানডে খেলেছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। দাপুটে জয়ে ১-০তে এগিয়ে গিয়েছিল স্বাগতিকরা। হাত না মিলিয়ে ম্যাচ খেলার সে আয়োজন অবশ্য খুব একটা সাড়া ফেলেনি। বাকি দুই ম্যাচ না খেলে দেশে ফিরছে নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ড সরকার তার প্রতিরক্ষা নীতি জোরদার করে বেশ কয়েকটি দেশের তালিকা দেয় যেখান থেকে কেউ এলে তাদের অন্তত ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। দেশটির ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটারদের ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি এ মাসেই দু’দলের যে টি২০ সিরিজ কথার কথা ছিল সেটিও স্থগিত করা হয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজেও বন্ধ ক্রিকেট। করোনাভাইরাসের কারণে ভারতের পর সব ধরনের ক্রিকেট বন্ধ থাকবে ওয়েস্ট ইন্ডিজেও। দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া এডভাইজরি কমিটির (এমএসি) পরামর্শে অন্তত ৩০ দিনের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্থগিত হওয়া টুর্নামেন্ট ও ম্যাচগুলো- ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ দুই রাউন্ড, নারী সুপার ৫০ ওভার কাপ, আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব-১৫ বালক চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। ‘খেলোয়াড়, অফিসিয়ালস এবং স্টাফদের স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা ক্রিকেট বোর্ডের কাছে সবকিছুর উর্ধ্বে। আমরা বোর্ড পরিচালকদের পরামর্শ দিয়েছি, তারা যেনো ক্রমবর্ধমান করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।’ বলেন উইন্ডিজ বোর্ডের এক কর্মকর্তা। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা চিকিৎসাগতভাবে সেরাটা দিয়েই চিন্তা করছি। একইসঙ্গে পরিস্থিতি মোতাবেক সচেতনতাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। দর্শক, ক্রিকেটার এবং ম্যাচ অফিসিয়ালদের ছোট্ট সমাগমও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এখনও মহামারীটা শক্তি সঞ্চার করে যাচ্ছে। আমরা পুরো ক্যারিবিয়ান জুড়েই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাব।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ