বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশের ক্রিকেটে তামিমের যত অর্জন

অরণ্য আলভী তন্ময় : বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক অর্জনের সাথেই তামিম ইকবারের নামটি জড়িয়ে আছে। ১৩ বছর আগে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে দুরন্ত ব্যাটিং দিয়ে নিজেরে আগমনী বার্তা জানান দিয়েছিলেন। এরপর থেকে এখনো সেই ধারা অব্যহত রয়েছে। সম্প্রতি একত্রিশ বছরে পা রাখলেন বাংলাদেশের এ ড্যাশিং ওপেনার। ২০০৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম খেলেছিলেন বাংলাদেশের হয়ে। তেরো বছর পর তামিম ইকবাল এখনো স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সম্প্রতি ওয়ানডে দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের ব্যাটিং অর্ডারের অন্যতম স্থম্ভ এই বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান ক্যারিয়ারজুড়ে জন্ম দিয়েছেন অসংখ্য অসাধারণ মুহূর্তের। যা তার অবসর সময়ে মনে পড়ে। জন্মদিনের আগে পাঠকদের এমনই কিছু মুহুর্তের কথা শুনিয়েছেন।
বিশ্বকাপে শুরুর সেই হুংকার
বয়সিভত্তিক বিভিন্ন দলে খেলে তবেই জাতীয় দলের জন্য নিজেকে তৈরি করেছেন তামিম ইকবাল। বনেদি পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে তার খেলার হাতটি আগে থেকেই পাকা ছিল। ভারত তো বটেই, আজ থেকে ১৩ বছর আগে ক্রিকেট দুনিয়ারই অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার ছিলেন জহির খান। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে জহিরের সঙ্গেই একটা অসাধারণ মুহূর্ত আছে তামিম ইকবালের। বিশ্বকাপে পোর্ট অব স্পেনে ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি। আগের বলেই নাকানিচুবানি খাইয়েছেন মাত্র তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা অনভিজ্ঞ বাংলাদেশি ওপেনারকে। সে সময়ে অন্য যেকোনো ব্যাটসম্যান এমন মুহূর্তে বোলারকে সমীহ করে খেলার কথা চিন্তা করতেন। জহির খানও নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, তাঁকে মারার সাহস করবেন না তামিম। কিন্তু কিসের কী! পরের বলেই ডাউন দ্য উইকেটে দুই পা এগিয়ে এসে সপাটে ব্যাট চালালেন, বল সোজা গ্যালারিতে গিয়ে পড়ল। মাঠের বিশাল বড় স্ক্রিনে ধরা পড়ল হতবুদ্ধি বোলার জহির খান এবং অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়ের মুখ। তামিমের আগমনী বিজ্ঞাপনই বলা যেতে পারে সে শটটি। এই শটের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্ব জেনেছিল একজন ‘তামিম ইকবাল’-এর কথা, যে একটিমাত্র শটে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছিল। বিশেষ করে দুদিন আগে ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা ও সাজ্জাদুল হাসান সেতুর মৃত্যু শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভারতের মতো পরাশক্তি দলকে নাকানি চুবানি খাইয়ে দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা এই ম্যাচ হারের কারণে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল পরাক্রমশালী দলটিকে।
নাম উঠল লর্ডসের ‘অনার্স’ বোর্ডে
ক্রিকেটারদের স্বপ্নের ভেন্যু বলা হয়ে থাকে লর্ডসকে। এখানে খেলা যেমন অনেক বেশি অর্জনের ঠিক তেমনি বড় কিছু করতে পারাটা আরো বড় অর্জনের মধ্যে পড়ে। সেখানে আমাদের তামিম ইকবাল খানের নামও রয়েছে। বয়স মাত্র ২১, ইংল্যান্ডে প্রথম সফর, তার ওপর সেটি ইংলিশ মৌসুমের শুরু। দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম ইকবাল করলেন ১০৩। লর্ডসে কোনো বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরি। সেটিও কী দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি! ১৫ চার আর ২ ছয়ে মাঠ আলো করে মাত্র ৯৪ বলে। ১৯৯০ সালে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ৮৮ বলে সেঞ্চুরির পর লর্ডসে দ্রুততম। স্ট্রোক-ঝলমল সেই সেঞ্চুরির চেয়ে তামিমের উদযাপনটাও কম দর্শনীয় ছিল না। টিম ব্রেসনানের পরপর চার বলে ৪, ৪, ২, ৪ রান নিয়ে ৮৭ থেকে চোখের পলকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যাওয়ার পর ড্রেসিংরুমের দিকে স্প্রিন্ট দিয়ে লাফিয়ে উঠলেন শূন্যে। দৌড়ে গিয়ে একটা লাফ দিলেন। এরপর কয়েকবার জার্সির পেছন দিকে হাত দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে দেখালেন। বোঝাতে চাইলেন, লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম তোলার পরীক্ষায় পাস তো করলাম! এবার তবে লিখে ফেলো! লর্ডসে সেঞ্চুরির পর তামিম ইকবালের রাজকীয় উদযাপন আজও ক্রিকেট রোমান্টিকদের চোখে ভাসে। যা তাকে অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
একে একে ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর...
বিষয়টিকে রোমাঞ্চকর না বলে উপায় নেই। ২০১২ এশিয়া কাপে তামিমের সেই চার আঙুল দেখানো বিখ্যাত উদযাপন। যেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় গল্পগাথায় চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছে। টানা চার ম্যাচে চার ফিফটি করার পর আঙুল গুনে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা ছিল ‘জবাব দেওয়া’র এক উদযাপন। এশিয়া কাপের আগে তামিমকে দলে রাখা হয়নি সেবার। পরে সমালোচনার মুখে শেষ মুহূর্তে দলে জায়গা পান তিনি। আর জায়গা পেয়েই দেখিয়ে দেন নিজের গুরুত্ব। আর তামিমের আগুনে পুড়ে একে একে ছারখার হয়েছিল পাকিস্তান (৮৯ বলে ৬৪ ও ৬৮ বলে ৬০), ভারত (৯৯ বলে ৭০) ও শ্রীলঙ্কা (৫৭ বলে ৫৯)। লঙ্কানদের বিপক্ষে চতুর্থ ফিফটিটি করেই গুনে গুনে গ্যালারিকে দেখিয়ে দেন চার আঙুল। যদিও তার ওয়ান, টু, থ্রি আর ফোরের উৎযাপনের ভঙ্গিটা দেখিয়েছিলেন ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নির্বাচকদের।
অটুট মনোবলের প্রমাণ হাত ভাঙা নিয়ে খেলা
সারা দুনিয়াতে সাহসী মানুষদের সাথে বিধাতাও নাকি থাকেন। সে কারণে তামিমও সেই দলের একজন হিসেবে ক্রিকেটবিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কে বলে সাহসী সুন্দর ব্যাটিং সব সময় চার ছক্কার ফুলঝুরিতে হয়? কখনো কখনো সাহসের সৌন্দর্য শুধু একটা বল ঠেকিয়েও হতে পারে। ২০১৮ এশিয়া কাপে ভাঙা হাত নিয়েও এক বল খেলে সাহসের দারুণ উদাহরণ গড়েছিলেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাহসী ব্যাটিংয়ের কথা বললে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তামিম ইকবালের ওই এক বল খেলার ছবিটিই স্মৃতিতে আসে সবার আগে। সেদিন মুশফিকুর রহিম নিজেও খেলেছিলেন ১৫০ বলে ১৪৪ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস। কিন্তু সব ছাপিয়ে আলোচনায় চলে আসে তামিমের সাহসের সেই অনুপম প্রদর্শনী। প্রথমে হাতে চোট পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে করেছিলেন ৩ বলে ২ রান। ইনিংসের শেষ দিকে আবার নামার পর একটি বলই খেলেছিলেন। ওই একটা বলেই তামিম ইকবাল উদ্ভাসিত হয়েছিলেন অন্য রকম এক আলোয়। সাহসের আলো। দলের জন্য আত্মনিবেদনের আলো। সেই আলো নিজের ব্যক্তিগত দুঃখ ভুলে গিয়ে বাকিদের জন্য প্রেরণা হয়ে ওঠার। তামিমের কারণেই যোগ হয়েছিল আরও ৩২ রান। যা শ্রীলঙ্কা-বধে রেখেছিল অনন্য ভূমিকা। যেখানে তামিম ইকবাল অনন্য এক অবস্থানে নিজেকে নিয়ে গেছেন।
তামিম যখন হিলারি-তেনজিং
এখানে বিষয়টিকে পুরোপুরি বুঝিয়ে না বললে সহজে বোঝার কোন উপায় নেই। প্রথমবারের মতো এভারেস্ট জয় করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন এডমুন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের ‘এভারেস্ট’ এ তামিম চড়েছেন দুবার। দুবারই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ২০০৯ সালে হারারেতে যখন ১৫৪ করলেন, তখন সেটাই ছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। ১১ বছর পর আবারও জিম্বাবুয়ে, আবারও উদ্ভাসিত তামিম। চার রান বাড়িয়ে সর্বোচ্চ স্কোরটাকে এবার নিয়ে গেলেন ১৫৮-তে। যদিও সে রেকর্ড দুদিনও টেকেনি। তবু ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের স্বাদ দুবার পাওয়া একমাত্র ক্রিকেটার তো তামিমই! তবে তামিম যে একজনই সেটা প্রমাণ করতেও খুব বেশি সময় নেননি।
তামিম ইকবালের কিছু প্রিয় বিষয়
১। চট্টগ্রামে মধ্যাহ্নভোজের প্রিয় জায়গা?
দম ফুক (তামিম ইকবালের বড় ভাই নাফিস ইকবালের রেস্তোরাঁ)।
২। সব ড্রেসিংরুমে বিনোদনের কোন উপকরণ যোগ করতে চান?
সঙ্গীত।
৩। আপনি বানাতে পারেন এমন সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার কোনটি?
স্মুদি।
৪। অনুশীলনে কোন বিষয়টা সবচেয়ে অপছন্দ?
আমি ওয়ার্ম-আপ পছন্দ করি না।
৫। বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটার সবসময় মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন?
সবাই।
৬। বাংলাদেশের রাস্তার ক্রিকেটের একটি নিয়মের কথা বলুন।
শুধু বোলারের মাথা ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকাও।
৭। এমন কোনো বিখ্যাত মানুষ আছেন, যে কোনোকিছুর বিনিময়ে যার সঙ্গে দেখা করতে চান?
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও রজার ফেদেরার।
৮। টেস্ট ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় দুই বলের ফাঁকে কী করতে পছন্দ করেন?
সৌম্যর সঙ্গে কথা বলতে।
৯। আপনাকে নিয়ে যদি সিনেমা বানানো হয়, নিজের চরিত্রে কাকে দেখতে চাইবেন?
সালমান খান।
১০। ক্রিকেট সম্পর্কে ধারণা নেই এমন কাউকে কীভাবে ক্রিকেট বোঝাবেন?
যদি যুক্তরাষ্ট্রে থাকি, বেসবলের সঙ্গে এর তুলনা করব এবং তাদের বোঝার জন্য বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলব।
১১। আউট হওয়ার সবচেয়ে বাজে উপায় কোনটি?
রানআউট।
১২। যদি একটি অলৌকিক ক্ষমতা পান, সেটি কী হবে?
প্রতি বলেই ছক্কা হাঁকাব।
১৩। ছক্কা হাঁকানোর সেরা উপায় কী?
শতভাগ নিশ্চিত হয়ে শট খেলা।
১৪। আপনার ক্যারিয়ারের সেরা ছক্কা কোনটি?
২০০৭ বিশ্বকাপে জহির খানকে যে ছয়টি মেরেছিলাম।
১৫। ছুটি কাটানোর প্রিয় জায়গা?
লন্ডন।
১৬। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত কোন রেকর্ড নিজের দখলে রাখতে চান?
বাংলাদেশের হয়ে সব ফরম্যাটে সর্বোচ্চ রান।
১৭। বাংলাদেশের পর কোন দেশের বিরিয়ানি সেরা?
ভারতের।
১৮। মোবাইল ফোনের কোন অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন?
হোয়াটসঅ্যাপ।
১৯। ভিড় তৈরি না করে কখনও জনসমাগমে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন?
হ্যাঁ, পরিচয় গোপন করে।
২০। নদীতে সাঁতার প্রতিযোগিতায় মাশরাফিকে হারাতে পারবেন?
কোনো সুযোগই নেই।
২১। ব্যাটিংয়ে নামার সময় কোন গান শুনতে ভালো লাগে?
সঙ্গীতের খুব একটা ভক্ত নই আমি।
২২। বোলারদের চেয়ে ব্যাটসম্যানরা কী বেশি শান্ত?
তারা বেশি দায়িত্বশীল।
২৩। টিভিতে খেলা দেখার সময় স্টাম্প মাইক্রোফোনে কার কথা শুনতে ভালো লাগে?
মহেন্দ্র সিং ধোনি।
২৪। কঠোর ডায়েট মেনে চলার সময় কোন খাবারটা বেশি খেতে ইচ্ছা করে?
মুরগির রোস্ট।
২৫। ক্যাচ মিসের পর বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রতিক্রিয়া অনুকরণ করে দেখাতে পারবেন?
তাসকিনের হাতে ভাঁজ করে ফেলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ