শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রম : করোনা প্রতিরোধে কতটা সহায়ক

শাহাদাত আনসারী : প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) থেকে দেশকে বাঁচাতে বর্তমানে স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য অফিস বন্ধ থাকলেও ব্যাংক সীমিত আকারে খুলে রাখার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সার্কুলারের মাধ্যমে। ফলে অন্যান্য অফিসের মতো ব্যাংক কর্মকর্তারা বাড়িতে থাকার সুযোগ পাবেন না। সকাল ১০.০০ মি.-১২.০০ মি. পর্যন্ত লেনদেন শেষে দুপুর ১.৩০ মি. এ ব্যাংকের সকল কার্যক্রম বন্ধের কথা বলা হয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিজ বাড়িতে থেকে কর্মস্থলে নিয়োজিত। অফিস শেষে তাঁরা নিজ বাড়িতে বা বাসায় ফিরে পরিবারের সাথে অবস্থান করেন। নিজ কর্মস্থলে তাঁরা অনেকের সাথে মিশেছেন যারা নিশ্চিত না তারা করোনা রোগী কিনা বা করোনা আক্রান্তের সংস্পর্শে ছিলেন কিনা। ব্যাংক কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কতটুকু সচেতন? আবার অনেকে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শত কষ্টে অফিস করেন। তাঁরা সিএনজি বা অটোরিকশার মাধ্যমে যাতায়াত করেন। এ যাত্রা কতটুকু নিরাপদ এবং তাঁরা এক্ষেত্রে কতটুকু সচেতন থাকেন?
দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে আনসার, পুলিশ ও নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত। যাদের অনেকেই একসাথে অবস্থান করেন। আবার বিভিন্ন ব্যাংক তাদের নিজস্ব লেনদেন এবং অন্যান্য ব্যাংকের সাথে বড় অঙ্কের লেনদেন করেন। ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব লেনদেন বা রেমিটেন্সের সময় তাদের নিয়োজিত আনসার ও কর্মকর্তাদের কতটুকু সচেতন রাখতে পারবেন তা সত্যিই প্রশ্নের জন্ম দেয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এক ব্যাংকের কর্মকর্তা কোনো এক বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াতে গিয়েছেন যেখানে আমেরিকা থেকে ফিরে আসা প্রবাসীর সংস্পর্শে এসেছেন। তিনি নিয়মিত কয়েকদিন অফিস করেছেন। সেই ব্যাংক কর্মকর্তার সংস্পর্শে এসেছেন কয়েকজন ব্যাংকার ও সেবা নিতে আসা শত শত কাস্টমার। অর্থাৎ করোনা ভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম কেন্দ্র এখন ব্যাংক এটা বললে বড় ধরনের ভুল হবে না। কারণ কোনো কারণে একজন করোনা রোগী বা রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি ব্যাংকে আসলে তিনি যতক্ষণ ব্যাংকে থকবেন তার দ্বারা মোটামুটি ১৫-২০ জনকে সংক্রমণ ঘটানো সম্ভব।
সীমিত আকারে ব্যাংকিং সেবার কথা বলা থাকলেও অধিকাংশ সেবাগ্রহীতার কাছে তেমন স্পষ্ট হয়নি। নগদ অর্থ লেনদেন ছাড়া অন্য কাজ করা যাবে না এমন তথ্য অনেকের অজানা। অধিকাংশ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় তেমন স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া নাই। ব্যাংক খোলা থাকায় অনেকেই বকেয়া কাজ যেমন- নমিনি পরিবর্তন, স্বাক্ষর কার্ড পরিবর্তন, নতুন হিসাব খোলা, নতুন চেক বহি উত্তোলন ইত্যাদি করতে যাচ্ছেন। এতে অনেক শাখায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত লেনদেন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানবিকতার ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যাংক কর্মকর্তারা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন সেবাও দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও ব্যাংকে জনসমাগম এড়ানো যাচ্ছে না। ফলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি ক্রমে বেড়েই চলেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করার জন্য। কিন্তু অনেক শিক্ষক তাদের বকেয়া পূর্বের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যাংকে  চলে আসছেন। প্রতিষ্ঠানের হিসাব চালু, বিভিন্ন বিল পরিশোধ ইত্যাদি কাজে তাঁরা প্রয়োজনে অন্য শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে আসছেন। নিজেদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের জন্য একজনের প্রয়োজনে ছুটিতে থাকা অন্যজনও তার সাথী হচ্ছেন ব্যাংকের কাজ করতে। আবার অনেক শিক্ষক নিজের বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে যাচ্ছেন স্কুল বন্ধ থাকা সন্তানকে নিয়েও। শিক্ষিত ও সম্মানিত অনেক শিক্ষক নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রেখে ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করছেন। যখন শিক্ষিত এবং শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিগণ সচেতন হচ্ছেন না তখন ব্যাংকে সেবা নিতে আসা অন্য সেবাগ্রহীতাদের অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমান করা যায়। আসলে ব্যাংক খোলা রেখে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নয়।
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ২ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ। তবে দেশের অধিকাংশ শাখা খোলা রয়েছে। অনেক শাখা তাদের ব্যাংকের প্রবেশ পথে তেমন কোন জীবাণুনাশক উপকরণের ব্যবস্থা করেনি এবং নিজেরাও তেমন সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তবে অধিকাংশ ব্যাংকে কর্তৃপক্ষ নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে স্যানিটাইজার, মাস্ক এবং হ্যান্ডওয়াসের ব্যবস্থা করেছেন। অনেক শাখা প্রবেশপথে জীবাণুমুক্ত করে সেবা গ্রহণের সুযোগ দিলেও অনেকেই এতে বিরক্তিবোধ করছেন। কে আগে সেবা নিবে আর কে পরে নিবে এমন ঘটনা নিয়ে জনসমাগম এখনও ব্যাংকগুলোতে অতীতের মতোই ঘটছে। আবার অনেক সময় নিজেদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে যা সত্যি আমাদের জন্য লজ্জাজনক। ব্যাংক কর্মকর্তার সামনে সেবা নেয়ার সময় সেবাগ্রহীতা তথা কাস্টমারদের নিজেদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে থাকার কথা। কিন্তু একজনের ঘাড়ের উপর দিয়ে আরেকজন চেক দিয়ে নিজের টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। আবার অনেক সময় নিজেরা গয়ের সাথে গা লাগিয়ে সেবা নিচ্ছেন। কিন্তু কথা ছিলো আমাদের সচেতন হয়ে খুব প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে বের না হওয়ার। আবার বের হলেও নিরাপদ ও সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা। আমরা যদি সচেতন হয়ে সরকারের নির্দেশনা মানতে না পরি তবে করোনা ভাইরাস ক্ষমা করবে না।
এপ্রিলের শুরু থেকেই সরকারি ব্যাংগুলোতে বিভিন্ন অফিসের বেতন-ভাতা ও বিল পরিশোধ করা হবে। আবার অনেক শাখায় বিভিন্ন ভাতা, আর্মি ও সিভিল পেনশন দেয়া হবে। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর প্রত্যেক শাখায় কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৩০০০ জন পেনশন গ্রহীতা আছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০-৫০০ জন পেনশন গ্রহীতা তাদের প্রয়োজনেই ব্যাংকে আসবেন। কিন্তু দিনে ২০০-৫০০ জন পেনশন গ্রহীতা এবং অন্যান্য সেবা গ্রহীতার উপস্থিতি নিশ্চয় এক জনসমাগমে রুপ নিবে। আর এ জনসমাগম সরকার সর্বদা এড়িয়ে চলতে বলেছেন। তাহলে পেনশোনারদের ব্যাংকে না এসে কীভাবে পেনশন দেয়া যাবে তার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার ছিলো। কিন্তু খুব সম্ভবত এখন পর্যন্ত এ ধরণের কোন পরিকল্পনা বা নির্দেশনা ব্যাংক ও কর্তৃপক্ষ দেননি। পেনশনই যাদের শেষ ভরসা তাঁরা অবশ্যই পেনশন নিতে প্রতিযোগিতা করে এপ্রিলের ১ তারিখ ভীড় করবেন। কিন্তু যাদের অন্য সুযোগ আছে তাঁদেরকে কে বুঝাবেন এক-দুই মাস পরে পেনশন নিলেও হবে? তাই উপজেলা-জেলা প্রশাসন এবং ব্যাংক থেকে যথাসম্ভব সুনির্দিষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত ঘোষণা দেয়া দরকার যেন পেনশনারদের অসুবিধা না হয় আবার জনসমাগমও না হয়।
সরকারি অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা নিজের প্রয়োজনমতো বেতন উত্তোলন করেন। এক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের অফিসের কর্মচারীদের সহায়তা নেন। তাই অনেকসময় একই অফিসের একজন কর্মচারী তার বিভিন্ন অফিসারের বেতন উত্তোলন করতে কয়েকবার ব্যাংকে আসেন। অথচ তাদের উচিৎ ছিলো সর্বোচ্চ একবার ব্যাংকে আসা। সেবাগ্রহণ করতে আসা অনেকের অতীতের অভ্যাস কাউন্টারে না গিয়ে কীভাবে অল্প সময়ে সেবা নেয়া যায়। এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। সেবাগ্রহীতাদের নির্দিষ্ট কাউন্টারে সেবা নিতে বললে এবং স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রাখতে বললে তারা মন খারাপ করেন। তারা এটুকু বুঝেন না যে- ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকেও তাদের শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে যেতে পারে। আর সত্যি ব্যাংকারদের বিভিন্ন জনের সংস্পর্শে আসতে হয় বলে তাঁরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
সরকার তার জনগণকে বাঁচাতে এবং করোনা ভাইরোস প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। এগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তখনই যখন আমরা সচেতনভাবে এগুলো পালন করবো। সাধারণ মানুষ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। যাদের সুযোগ আছে তাদের সবচেয়ে বড় কাজ হবে নিজ গৃহে অবস্থান করা। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে জনসমাগম এড়িয়ে চলা উচিৎ। প্রয়োজনে বাড়ির বাহির হলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। হাঁচি-কাশি আসলে অবশ্যই টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। ঠাণ্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। সুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় রাস্তা চলাচলে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে হবে। খাওয়ার পূর্বে-পরে এবং বিভিন্ন সময়ে অবশ্যই সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। এমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রত্যেকটি ব্যাংক থেকে করলে সেবাগ্রহীতারা প্রকৃত অর্থে সচেতন হবেন এবং করোনা প্রতিরোধী সাহসী হবেন।
একটি পরিবারের কোন সদস্যই চান না তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা কোন আত্মীয় করোনা নামক মহামারীতে আক্রান্ত হন। পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে সে পরিবারটি ধ্বংস হতে বেশিদিন লাগবে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকে কর্মরত সদস্য এবং তাদের পরিবার হুমকির মুখে। কারণ দীর্ঘ সময় জনসমাগমে ব্যাংকে অবস্থান করে নিজেকে কতটুকু করোনামুক্ত পরিবেশে রাখতে পারছেন তা জানতে পারছেন না। দিনের কাজ শেষে যখন পরিবারে ফিরছেন তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে এক অজানা আশঙ্কা বিরাজ করছে।  অধিকাংশ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ব্যাংকারদের সুরক্ষার জন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোন সুবিধা দেয়া হয়নি। যতটুকু করা হয়েছে তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তা সামগ্রীর ব্যবস্থা না করে ব্যাংক খোলা রাখা যেন অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে অংশগ্রহণের মতো। যেখানে পরাজয় ও মৃত্যু নিশ্চিত। তাই এ দুর্যোগে যারা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আতঙ্ক নিয়ে ব্যাংকে কর্মরত তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অতি প্রয়োজন ছাড়া সেবাগ্রহীতারা যেন ব্যাংকে প্রবেশ না করে তারও ব্যবস্থা নিতে হবে। সকলে নিজে দায়িত্বশীল হয়ে এবং অন্যকে সচেতন করে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এগিয়ে আসবো এটাই প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ