শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

মূল্যবোধবিবর্জিত নীতির চিকিৎসা প্রয়োজন

২৯ মার্চ হোয়াইট হাউসে সান্ধ্যকালীন সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে তাঁর দেশে এক লাখ কিংবা তার বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তবে যদি মৃতের সংখ্যা দুই লাখের কম রাখা যায় তাহলে সেটাই হবে বড় সফলতা। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে অনেকেই অবাক হয়েছেন। বলে কী! দুই লাখের মতো মানুষ মারা গেলেও সফলতা? জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে সর্বোন্নত দেশটির প্রেসিডেন্টকে করোনার কাছে এভাবে আত্মসমর্পণ করতে হলো কেন? কোথায় ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের? যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় গত ২০ জানুয়ারি। এরপর ৫০ দিনে রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর পরের এক সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধির মাত্রা। পরের মাত্র ১২ দিনে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার। সঙ্গে বেড়েছে মৃতের সংখ্যাও। আর ৩০ মার্চ সোমবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৯ জন মানুষ। মারা গেছেন ২ হাজার ৫৯৯ জন। প্রশ্ন জাগে, প্রস্তুতির জন্য এত দীর্ঘ সময় পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের এমন হাল হলো কী কারণে? যুক্তরাষ্ট্রের তো সম্পদের অভাব নেই। আছে পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। তারপরও দেশটিতে করোনা পরিস্থিতি এমন কেন? ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ জানুয়ারি প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ২২ জানুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’ ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আজ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়লো কেমন করে? ফলে চারদিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রশাসন মুখে মুখে আশ্বস্তের বুলি প্রচার করলেও রোগ পরীক্ষা, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ঠিকমতো পরীক্ষা না হওয়ায় ভুলবার্তা পেয়েছে দেশের মানুষ। তারা জানতে পারেনি আসলে কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে করোনায়। ফলে মার্কিন নাগরিকরা বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। চলাফেরা-মেলামেশায় তেমন সতর্ক হয়নি। যার পরিণতি আজ ভোগ করতে হচ্ছে দেশটিকে। এমন উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে পারে অন্যান্য দেশের সরকার ও জনগণ।
করোনা মহামারি মোকাবিলায় উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্র কেন এতটা পিছিয়ে আছে, এটি বর্তমান সময়ের একটি বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে কথা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার আর হিল। এক কথায় জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে এমন একজন লোক বসে আছেন, যিনি বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা বিচক্ষণতা, কোনো দিক দিয়েই এ পদের যোগ্য নন। হিল আরো বলেন, ট্রাম্প দেশকে একটি বিকৃত আদর্শিক গোষ্ঠীবাদের ভাইরাসে আক্রান্ত করে ফেলেছেন। ট্রাম্প সেই ভাইরাসবাহী লোক। নেতিবাচক দলাদলি দিয়ে দেশকে কার্যত বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। প্রধান দু’টি দলই জনগণকে নিজের পক্ষে টানতে গিয়ে নিজেদের কাজ বা আইডিয়ার কথা প্রচার না করে প্রতিপক্ষের দুর্নাম-বদনাম গাওয়াকেই প্রধান অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে। তবে এদের মধ্যে ট্রাম্প যা করছেন, তা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নিজের স্বার্থের বাইরে তিনি চিন্তা করারই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। করোনা ভাইরাস মোকাবিলা নিয়ে ১৩ মার্চ সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন অফিসে এবং ১৪ মার্চ নিজের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যা বলেছেন, তাতে স্পষ্টভাবে মনে হয়েছে, এই মহামারিতে জনস্বাস্থ্য কতটা হুমকিতে পড়বে, তা নিয়ে তাঁর যতটা উদ্বেগ, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ শেয়ারমার্কেট নিয়ে। তিনি করোনাকে কখনো বলছেন ‘চায়নিজ ভাইরাস’। আবার এই মহামারিকে তিনি তাঁর অভিবাসন বিরোধী নীতি প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে হিল বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকাকে মূল্যবোধ বিবর্জিত নীতিকে ব্যাধি হিসাবে স্বীকার করে এর চিকিৎসা করতে হবে।
আমেরিকায় করোনার প্রসারে নেতৃত্বের দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। করোনা ভাইরাস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার শেষ নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিকসহ সাধারণ মানুষ- সবার মন-মস্তিষ্ক এখন করোনাময়। করোনা থেকে যেন কারো মুক্তি নেই। অনেকে ভাবছেন, করোনা কি শুধু একটি ভাইরাস, নাকি বহুমাত্রিক অন্যকিছু? করোনার সংক্রমণ রোধে এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকরা, গবেষকরা তৎপর হবেন; এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখন লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, করোনার প্রভাব নিয়ে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, এমনকি দার্শনিকরা পর্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাঁদের আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে উপলব্দি করা যায়, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা তথা বর্তমান সভ্যতায় একটা পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। আসলেই কি করোনা নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিতে যাচ্ছে?
করোনা-পূর্ব বিশ্বব্যবস্থায় চীন ও আমেরিকার বৈরী সম্পর্কের কথা আমরা জানি। কিন্তু এখন করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। গত ২৭ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোন করে এ সহায়তার প্রস্তাব দেন। বৈশ্বিক মহামারি করোনার পরবর্তী কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে দেশটিকে সহায়তার প্রস্তাব দিল তার বৈরী প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে (২৭ মার্চ) করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি ঘটনা দেখে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে এ পর্যন্ত (২৯ মার্চ) ১লাখ ২২ হাজার ৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৪৭। যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের ঘটনা এতটাই বাড়ছে যে, নিউইয়র্ক ও নিউ অরালন্সের হাসপাতালগুলো রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাসহ নানা বিষয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বাকযুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প তো করোনা ভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন। এ সবের মধ্যেই চীন সহায়তার প্রস্তাব দিল আমেরিকাকে। এদিকে সি চিন পিং-এর সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে টুইটে ট্রাম্প বলেছেন, করোনা ছড়িয়ে পড়া চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি। ট্রাম্প আরো বলেন, আমরা একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। আমাদের মধ্যে যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে বেশ ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। আমরা তো ক্ষমতাবান রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে গালাগালির ঘটনাও লক্ষ্য করেছি। আর হুমকি-ধামকির বিষয়টি যেন কারো কারো অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এখন বাতাবরণে ট্রাম্প যখন বলেন, আমরা পরস্পরের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল, তখন আশাবাদ জাগে। তাহলে কি করোনা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে? মানুষ তো বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়, বর্তমান সভ্যতায় সন্তুষ্ট নয়। তারা পরিবর্তন চায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনটা কেমন হবে? বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আমরা ট্রাম্পের একলা চলো নীতি দেখেছি, দেখেছি মোদির উগ্র জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি দেখেছি চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা, রাশিয়াকে দেখেছি বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কৌশলী পদক্ষেপ নিতে। বিশ্বনেতাদের এসব পদক্ষেপে সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তায় শক্তির প্রদর্শন ছিল; কিন্তু কোথাও আলো ছিল না, মানবজাতির মুক্তির বার্তা ছিল না। করোনা বড় বড় নেতাদের বুঝিয়ে দিল, তোমরা আসলে শক্তিশালী নও, বেশ দুর্বল। করোনা কোয়ারেন্টাইনে রেখে বিশ্বনেতাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ এনে দিয়েছে। স্রষ্টা হয়তো দেখতে চান, দাম্ভিক নেতাদের মধ্যে বোধোদয় ঘটে কি-না। নতুন মানবিক সভ্যতার পথে ওরা চলে কি-না। এর ব্যত্যয় ঘটলে সামনে হয়তো অপেক্ষা করবে বড় বিপর্যয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ