শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

প্রসঙ্গ করোনা এবং হাসপাতাল

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস নিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই এর চিকিৎসা সঙ্কট মারাত্মক হয়ে উঠেছে। এই সঙ্কটের মধ্যে এখনো প্রাধান্যে রয়েছে শনাক্তকরণের বিষয়টি। মাত্র তিন-চারদিন আগে পর্যন্তও রাজধানীর মহাখালিতে অবস্থিত রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর-এই শুধু শনাক্তকরণের কার্যক্রম চালানো হয়েছে। কিন্তু অতি সীমিত লোকবল ও সরঞ্জাম নিয়ে চলতে হয়েছে বলে আইইডিসিআর-এর পক্ষে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভূমিকা রাখা এবং রোগাক্রান্ত জনগণের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। যেমন প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত ৫৫ দিনে সন্দেহজনক মাত্র ৩২৬ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পেরেছে আইইডিসিআর।
এমন অবস্থার অর্থ, কোনোভাবে কাজ চালিয়েছে আইইডিসিআর। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ যেমন অত্যন্ত ধীর গতিতে চলেছে, তেমনি প্রতিদিন শত শত মানুষ সারাদিন অপেক্ষা করে পরীক্ষা ছাড়াই নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সর্বশেষ খবরে অবশ্য জানা গেছে, বিএসএমএমইউ ও আইসিডিডিআরবি তথা কলেরা হাসপাতালসহ আরো চার-পাঁচটি হাসপাতালে সীমিত আকারে পরীক্ষা ও চিকিৎসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আরো কিছু হাসপাতালে পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হতে চলেছে।
পরীক্ষার পাশাপাশি সমস্যার দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হিসাবে প্রাধান্যে এসেছে পিপিই বা পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্টের অভাব। এটা দরকার চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এ ব্যাপারে সরকারের মনোভাব সম্পর্কে জানা গেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যে। গত ২৩ মার্চ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছেন, পিপিইর নাকি ‘এখনো তেমন প্রয়োজন নেই’! স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে চিকিৎসকদের পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় সরকার অবশ্য পিপিই আমদানির দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিবর্তে সেগুলো গায়ে চাপিয়ে ফটোসেশন করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আমলারা। এরই পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের কিছু অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের পিপিই পরে সাধারণ মানুষের কাছে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিতে দেখা গেছে।
এর ফলেও প্রতিক্রিয়া ঘটেছে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে। নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তাদের একটি বড় অঙ্ক হাসপাতালে আসা-যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। সে কারণে বিশেষ করে রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতালেই চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। গণমাধ্যমের খবরে শিরোনাম হয়েছে, ‘হাসপাতালে ডাক্তার নেই’। গতকাল, পহেলা এপ্রিল পর্যন্তও পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে বলে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পিপিই কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ এমন পর্যায়েও পৌঁছেছে যখন অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ডাক্তারদের না দিয়ে আমলাসহ যারাই পিপিই গায়ে দেবেন তাদেরকেই হাসপাতালে পাঠানো হবে রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য! বলার অপেক্ষা রাখে না, মূলত আত্মপ্রচারে বেশি আগ্রহী এক শ্রেণির আমলার বাড়াবাড়ির কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এতটা কঠোর বক্তব্য রাখতে হয়েছে।
এভাবে সব মিলিয়েই এমন এক সময়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে পড়েছে যখন সংক্রমণের পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক বেড়ে চলায় হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা দরকার ছিল। একই কারণে জনগণের সচেতন অংশের পক্ষ থেকে ডাক্তারদের পাশাপাশি চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং হাসপাতালে বেশি সংখ্যায় করোনা রোগী ভর্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা গেছে, তথ্যাভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজধানীর হাসপাতালগুলো যেহেতু রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে, সে কারণে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে এসব হাসপাতালকেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এক পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে প্রায় এক লক্ষ বেডের মধ্যে ৭০ শতাংশ তথা প্রায় ৭০ হাজার রোগীকে ভর্তি করা এবং তাদের চিকিৎসা দেয়ার কার্যক্রম চালানো সম্ভব।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত জাতীয় স্টেডিয়ামের মতো বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির নামে অর্থ ও সময় নষ্ট না করে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোতেই এমন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া, যাতে বিশেষ করে করোনা রোগীদের সহজে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। সরকারকে একই সঙ্গে করোনা সম্পর্কিত অযৌক্তিক ভীতি-আতঙ্ক দূর করার এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পিপিই পৌঁছে দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে, তারা যাতে নির্ভয়ে চিকিৎসা দেয়ার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন। আমাদের বিশ্বাস, এভাবেই করোনা চিকিৎসার চলমান সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ