শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জিএসপি ইস্যুতে ইইউ’র সুখবর পেলো বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের এ মহামারির সময় সুখবর পেল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যিক সুবিধা) সুবিধা প্রত্যাহারের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ন্যায়পাল কার্যালয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে জোর প্রচেষ্টা চালানোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১৬ সালে ইইউ ন্যায়পাল অফিসে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা চারটি সংগঠন বাংলাদেশের শ্রমমান নিয়ে প্রশ্ন তুলে জিএসপি সুবিধা বাতিলের আবেদন করে। গত ২৪ মার্চ জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের আবেদন নাকচ করে দিয়ে ন্যায়পাল কার্যালয় বলে, শ্রম পরিবেশ ইস্যুতে ন্যায়পাল কার্যালয়ের তদন্তে বাংলাদেশের তেমন কোনো ক্রটি পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের শ্রমমান উন্নয়নে ইউরোপীয় কমিশন যেসব পদেক্ষপ নিয়েছে এবং যেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছে, তা ঠিক আছে। আগামীতে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে ইউরোপীয় কমিশন নেবে।
এদিকে নানামুখী সংকটের মধ্যে তৈরি পোশাকের জন্য এ সুখবরকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা।
এ বিষয়ে দেশের পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ন্যায়পাল কার্যালয়ের আদেশটি আমাদের জন্য অত্যন্ত একটি সুসংবাদ। কারণ শ্রমিক ইস্যুতে সবসময় আমাদের সমালোচনা করে থাকেন।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চারটি শ্রমিক সংগঠন বলেছিল যে, বাংলাদেশ তাদের শ্রমিকদের ন্যায় প্রদান করেন না। এরপর ইইউ ন্যায়পাল অফিস বিষয়টি তদন্ত করে। তদন্তে তাদের অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। সব বিবেচনা করে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আমাদের দুর্নাম মোচন হলো। সত্যের জয় হলো।
তবে এখনো জিএসপি স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। তৈরি পোশাক কারখানার কাজের পরিবেশ ও শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের অবাধ বাজারসুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে ওবামা প্রশাসন। বলা হয়, পোশাক খাতে কাজের পরিবেশের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়েছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এক আদেশে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা স্থগিত করা হলো। এর আগে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে একের পর এক দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়ের কারণে কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারবার তাগিদ দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন।
মাইকেল ফ্রোম্যান বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনায় ফুটে উঠেছে যে, বাংলাদেশের পোশাক
কারখানাগুলোতে কাজের নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়ে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে।
জিএসপি সুবিধা স্থগিত প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ওবামার ওই আদেশে বলা হয়, আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে...উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পাওয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করাই শ্রেয়। কারণ, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিক অধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কিংবা নিচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। যেহেতু ইইউ আমাদের জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিয়েছে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং যুক্তি দেখিয়ে মার্কিন প্রশাসনকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করতে হবে। অন্যথায় আমরা আগামীতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো না।
কেননা যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় তার প্রভাব তাৎক্ষণিক না পড়লেও আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে সে ধাক্কা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গার্মেন্ট পণ্য রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি টালমাতাল। দেশের তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানি ও চূড়ান্ত পণ্য রফতানিতে তার প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি অনুধাবনপূর্বক আমাদের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।
দেশের শিল্পের চাহিদা, শ্রমিকের অবস্থা, বাজার পরিস্থিতি, সামাজিক পরিবেশ সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাছাড়া বাংলাদেশে শ্রম অধিকার চর্চার মান নিশ্চিতে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নও করেছে বাংলাদেশ সরকার।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিদেশী ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনার ক্ষেত্রে গার্মেন্ট শিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা জোরদার, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ, শিল্প-কারখানা পরিদর্শন ও মনিটরিং জোরদারসহ যে শর্ত জুড়ে দিয়েছিল, তা পূরণের পরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের জন্য জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করা হয়নি। অথচ ভারত ও তুরস্কের মতো উন্নয়নশীল দেশও পুনর্বিবেচনার আওতায় জিএসপি সুবিধা ফিরে পেয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীলদের যথাযথ যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতির যৌক্তিকতা দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। বিভিন্ন শর্ত পূরণের পরও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি সুবিধা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অতিরিক্ত চাপ বৃদ্ধির নেপথ্যে অন্য প্রতিযোগীদের কৌশলগত প্রচারণা ও কারসাজি আছে কিনা, তা বিবেচনায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা ও ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণে আমাদের কৌশলী হতে হবে। জোর দিতে হবে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে। একই সঙ্গে দুর্বলতা বা প্রয়োজনীয় যোগাযোগের ঘাটতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। 
এছাড়া ২০২১ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বছর তিনেক পর রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলোয় বিদ্যমান জিএসপি সুবিধা কার্যকর থাকবে না; বরং ইউরোপে রফতানি নীতিমালার শর্ত পরিপালনসাপেক্ষে জিএসপি প্লাসের আওতায় শুল্কমুক্ত কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে স্বল্প শুল্ক পরিশোধে বাংলাদেশী পণ্য রফতানির সুযোগ থাকবে। সেখানেও শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করার মতো শর্ত রয়েছে। সেক্ষেত্রে পণ্য রফতানিতে অন্যান্য দেশের মতো স্বাভাবিক হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। ফলে এ অঞ্চলের বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হবে। পণ্যে বৈচিত্র্যকরণ, নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি পোশাক খাতের উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা দরকার বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে হলেও বাংলাদেশের সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে যেসব শর্ত পরিপালন করতে হবে, তা নিয়েও এখন থেকে কার্যক্রম শুরু করা দরকার। ইউরোপে বাংলাদেশের রফতানির মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই গার্মেন্ট পণ্য। পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন না করে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। শ্রম আইন, পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশের উন্নতি, শ্রমিকদের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হবে। সর্বোপরি রফতানির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে তৈরি পোশাক মালিক, বিজিএমইএ, দেশী-বিদেশী উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ