বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০
Online Edition

করোনায় জাগ্রত হোক নৈতিকতাবোধ

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : প্রতিনিয়ত গুজবে ভাসছে হাজারো কথা। কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা তা যাচাই করাও কঠিন। গুজবে নিত্যপণ্যের দাম ও ওষুধের দাম করোনার চেয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তবে দুঃখের মাঝেও সরকার কারাবন্দী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাঁকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ বিষয়টি সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। পাশাপাশি দেশবরেণ্য আলেম ওলামা যারা কারাবন্দি আছেন  তাদেরকেও ৬ মাসের  জন্য মুক্তি দিলে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। করোনা বিষয়ে লিখতে গিয়ে সুরা আল আরাফের কয়েকটি আয়াত পড়লাম। নিম্নে তার বাংলা অনুবাদ তুলে ধরছি।
‘‘অতপর (এ ধৃষ্টতার জন্যে) আমি তাদের ওপর ঝড়-তুফান (দিলাম),পংগপাল (পাঠাইলাম), উকুন (ছড়ালাম), ব্যাঙ (ছেড়ে দিলাম) ও রক্ত (পাতজনিত বিপর্যয়) পাঠাইলাম,এর সবকয়টিই (এসেছিলো আমার কতিপয়) সুস্পষ্ট নিদর্শন (হিসেবে,কিন্তু এ সত্ত্বেও)তারা অহংকার বড়াই করতেই থাকলো,আসলেই তারা ছিলো অপরাধী জাতি। (১৩৩)
তাদের ওপর যখন কোনো বিপর্যয় আসতো, তখন তারা বলতো হে মুসা! তোমার কাছে দেয়া তোমার মালিকের ওয়াদা অনুযায়ী তুমি আমাদের জন্যে তোমার মালিকের কাছে দোয়া করো,যদি (এবারের মতো) আমাদের ওপর থেকে এ বিপদ দূর করে দাও,তাহলে অবশ্যই আমরা তোমার ওপর ঈমান আনবো এবং অবশ্যই আমরা বনী ইসরাঈলদের তোমার সাথে যেতে দেবো। (১৩৪)
অতপর যখন তাদের ওপর থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের  জন্যে- যে সময়টুকু সে জন্যে নির্ধারিত ছিলো- সে বালা-মসিবত আমি অপসারণ করে নিতাম,তখন সাথে সাথেই তারা ওয়াদা ভংগ করে ফেলতো।(১৩৫)
অতপর আমি তাদের কাছ থেকে (ওয়াদা ভংগের) প্রতিশোধ নিলাম, তাদের আমি সাগরে ডুবিয়ে দিলাম, কেননা,তারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলো এবং তারা ছিলো এসব (নিদর্শন) থেকে উদাসীন। (১৩৬)’’
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় বড় মহামারি হয়েছে। যা আমরা অনেকে জানি না। ওই সব মহামারির কিছু ঘটনা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরেছি ঃ
‘‘কলেরা ঃ ১৮১৭ সালে কলেরা রোগের প্রথম মহামারি দেখা দেয় রাশিয়ায়। দূষিত পানির মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। এ রোগে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
তৃতীয় প্লেগ মহামারি ঃ ১৮৫৫ সালে চীনে এর সূত্রপাত হয়েছিল। পরে হংকং ও ভারতে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ মহামারির শিকার হয়েছিল।
রাশিয়ান ফ্লু ঃ ১৮৮৯ সালে প্রথম ফ্লুর সূত্রপাত হয় সাইবেরিয়াও কাজাখস্তানে। পরে তা মস্কো, ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ইউরোপে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। ১৮৯০ সালের শেষ দিকে এই রোগে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
স্প্যানিশ ফ্লু (flu) ঃ ১৯১৮ সালের শুরুর দিকে স্প্যানিশ ফ্লু উত্তর আমেরিকায় দেখা দেয়। স্পেনের মাদ্রিদে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর এর নামকরণ করা হয় স্প্যানিশ ফলু। স্পেনের মোট ৮০ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। আর বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ কোটি। তবে এই মহামারিতে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।
এশিয়ান ফ্লুঃ ১৯৫৭ সালে হংকং থেকে চীনে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এর ৬ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে এশিয়ান ফলু দ্বিতীয়বারের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় এশিয়ান ফ্লুতে সারা বিশ্বে প্রায় ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। তবে আশার করা হচ্ছে ভ্যাকসিন দিয়ে ওই মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।
এইচআইভি বা এইডস ঃ  নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ক্যালিফোনিয়ার সমকামী পুরুষদের মধ্যে এক বিরল ধরনের ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব প্রকাশ করার ১৯৮১ সালের দিকে এইডস প্রথমবারের মতো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এ রোগে এ পর্যন্ত সারাবিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে। ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৬.৯ মিলিয়ন মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছিল।
গুটির প্রাদুর্ভাব ঃ ১৯০০ সালের দিকে গুটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এই গুটি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা মতে এ রোগ উত্তর আমেরিকায় এটির প্রার্দুভাব দেখা দেয়। এ রোগে আক্রান্তের মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।
সোয়াইন ফ্লুঃ ২০০৯ সালের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেখান থেকে এটি বিশ্বের সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ ভাইরাসটি শূকর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। তবে ২০০৯ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায় যে শূকরের সঙ্গে না মিশলেও এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ রোগে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১০ সালে এ রোগ প্রতিরোধে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল।
ইবোলা ঃ ২০১৪ সালে ইবোলা পশ্চিম আফ্রিকাতে ভাইরাসটি দেখা দেয়। তারপর আফ্রিকার বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ ও বিশ্বের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।”
মানুষ মানুষের জন্য,জীবন জীবনের জন্য,একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’ভূপেন হাজারিকার গানের কথাগুলো আজ বার বার মনে পড়ছে। কারণ কিছু মানুষ শুধ নিজেকে নিয়ে ভাবেন। কিন্তু অন্যকে নিয়ে ভাবনার সময় নেই। তাইতো করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে ঠান্ডা,জ্বর-সর্দিও কাশির সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া মানুষগুলো পড়ছেন বিপাকে। ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা-সহকারী রোগীদেরকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। অসুস্থ মানুষগুলো এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ছুটছেন কিন্তু চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না।
এ অবস্থার উত্তরণ দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। একটি দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে যখন নৈতিকতা হারিয়ে যায় তখন সেখানে প্রকৃতির প্রতিশোধ কিংবা গজবের আর্বিভাব ঘটে। সমাজের একশ্রেণির মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয় দিন দিন বেড়েই চলছে। আমরা যদি ওইসব মানুষের কর্মকান্ডগুলো বিশ্লেষণ করি তাহলে সেখানে যা দেখব তা সবাই আল্লাহর বিধানের বিরোধী। সমাজের কিছু মানুষ সে অপরাধগুলো দিব্যি করে যাচ্ছে যা নিম্নরূপ ঃ নকল করে পাশ করেও গর্ববোধ করছে, ঘুষ দিয়ে চাকরি নিয়ে বড় বড় দালান বানানোর হীন প্রতিযোগীতা করছে,বাবা তাঁর সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতি করাতে ঘুষ দিচ্ছে,ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় খাদ্যে ভেজাল মেশাচ্ছে, ডাক্তার বিনা প্রয়োজনে অহেতুক টেস্ট দিচ্ছে, শিক্ষক ক্লাসে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছে, উকিল সাহেব অহেতুক মামলা বিলম্ব করে মক্কেল থেকে টাকা নিচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার রড়ের বদলে বাঁশ দিয়ে বিল্ডিং বানাচ্ছে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনী গ্রেপ্তার বাণিজ্য করছে, কোনো কোনো আলেম-ওলামা হক কথা জেনেও ভোগের জন্য নিশ্চুপ থাকছে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হলেও বির্তকের জন্ম দিচ্ছে। হলুদ সাংবাদিকতার প্রসার বাড়ছে, দিনের ভোট রাত্রে নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো পরিহার করলে আমরা আল্লাহতায়াল প্রিয় বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারব। সত্যিকার অর্থে আল্লাহমুখী হলে আল্লাহতায়ালা করোনার গজব থেকে আমাদেরকে মুক্তি দিতে পারেন। তাই আসুন করোনাকে ভয় না করে আল্লাহতায়ালাকে ভয় করে নৈতিকমান জাগ্রত করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ