রবিবার ৩১ মে ২০২০
Online Edition

দেশে ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু নেই আক্রান্ত আরও ৫ সহ মোট ৪৪

 

* খুলনা মেডিকেলে রোগীর মৃত্যু, সন্দেহে করোনা 

* ঢামেকের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান হোম কোয়ারেন্টাইনে

* শরীরে জ্বর, দেশে নেমেই হাসপাতালে লন্ডন ফেরত দম্পতি 

স্টাফ রিপোর্টার: প্রানঘাতী মহামারি করোনা ভাইরাসে দেশে নতুন করে আরও পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে। সুস্থ হয়ে উঠেছেন আরও চারজন। সবমিলিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১১ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা করোনাভাইরাস সংক্রান্ত অনলাইন লাইভ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

ডা. ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সবমিলিয়ে ৯২০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নতুন করে যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন পাঁচজন। ফলে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪-এ। নতুন আক্রান্তদের একজন বিদেশ থেকে এসেছেন, তিনজন আগে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে থেকে সংক্রমিত হয়েছেন, অন্যজনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। নতুন আক্রান্তের সবাই পুরুষ। এর মধ্যে ৩০-৪০ বছর বয়সী দুজন, ৪১-৫০ বছর বয়সী দুজন এবং ষাটোর্ধ্ব একজন। এ ভাইরাসে নতুন করে কারও প্রাণহানি হয়নি। আক্রান্ত ৪৪ জনের মধ্যে নতুন করে আরও চারজন সুস্থ হয়েছেন, অর্থাৎ মোট ১১ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আইইডিসিআরের হটলাইনে কল এসেছে ৩৩২১টি। এর সব ক’টিই করোনাভাইরাস সংক্রান্ত। ব্রিফিংয়ে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে নাগরিকদের করণীয়ও তুলে ধরেন তিনি।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারি। বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাসটি। এখন পর্যন্ত এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পৌনে ৫ লাখ এবং মারা গেছেন ২১ হাজার ৩৩৬ জন মানুষ। অপরদিকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক লাখ ১৪ হাজার ৭৭৯ জন। বাংলাদেশে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে গত ৮ মার্চ। এরপর দিন দিন এ ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেশে এখন পর্যন্ত ৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন পাঁচজন। করোনার বিস্তাররোধে দেশের সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েতের ওপর। চীন ও যুক্তরাজ্য ছাড়া সব দেশ থেকেই যাত্রী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দেশের সব বিপণিবিতান। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আদালতও। এমনকি একাধিক এলাকাকে লকডাউনও ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ সব ধরনের গণপরিবহন। এ কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার জন্য দেশের সব জেলায় মোতায়েন রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।

করোনায় মৃত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা খুলনায় একজনের মৃত্যু: ঢাকায় করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে একই হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে চিকিৎসাধীন ছিলেন খুলনার মোস্তাহিদুর রহমান (৪৫)। পরে তাকে খুলনায় আনা হয়। ভর্তি করা হয় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তিনি খুলনা মহানগরীর হেলাতলা এলাকার মৃত সাঈদুর রহমানের ছেলে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, মোস্তাহিদুর রহমান থাইরয়েড সার্জারির জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ঢাকায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একজন। এরপর ওই হাসপাতাল থেকে সব রোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং নিজ নিজ বাসায় কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু মোস্তাহিদুর রহমান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে বুধবার দিনগত রাত আড়াইটার দিকে ভর্তির সময় এ সব তথ্য গোপন করেন।

ডা. এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ আরও জানান,  থাইরয়েড সার্জারিতে ইনফেকশন হওয়ার কারণে এখানে আসেন তিনি। তাই তাকে স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালের সার্জারি ইউনিট-২ এ ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন এসব তথ্য প্রকাশ পায়। এরপর ওই রোগীকে ফাঁকা ওয়ার্ডের এক কোনে রেখে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু দুপুর দেড়টার দিকে তিনি মারা যান। তার লাশ হাসপাতালেই রয়েছে। ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ  বলেন, ‘হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে মৃত ব্যক্তির চিকিৎসা সেবায় থাকা ১৬ জনকে এ ঘটনার পরই কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের পেছনে থাকা ডরমেটরিতে তাদের পৃথক পৃথক রুমে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২ জন ডাক্তার, ১০ জন নার্স ও ২ কর্মচারী রয়েছেন।’ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট ইনচার্জ ডা. শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, মৃত ব্যক্তি তথ্য গোপন না করলে তাকে করোনা ইউনিটেই নেওয়া হতো। তথ্য গোপন করার কারণে তাকে সার্জারিতে নেওয়া হয়। তার মৃত্যুর পর এখানে থাকা ৩০ ভাগ রোগীও হাসপাতাল ত্যাগ করতে শুরু করেছেন।

এদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের একটি টিম খুলনা এসেছে। গতকাল সন্ধ্যায় যশোর থেকে তারা খুলনায় এসে পৌঁছেছেন। খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের ঢাকার টিমটি আগে থেকে যশোর অবস্থান করছিল। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের খবর পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মোস্তাহিদুর রহমানের লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পলিথিন মুড়িয়ে রাখা হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢামেকের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান হোম কোয়ারেন্টাইনে: ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধানকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। তিনি গত ১০ দিন ধরে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ। অধ্যক্ষ বলেন, গত ১৬ মার্চ তিনি বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রাইভেট চেম্বারে এক বয়স্ক রোগীকে দেখেন। রোগীটি নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন। পরে জানতে পারি, ওই রোগীর কোভিড-১৯ পজেটিভ এবং সে ভেন্টিলেটরে আছেন। আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ঘটনার দুই দিন পর সামান্য জ্বর অনুভব করেন ওই চিকিৎসক। তারপর থেকে তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে কেউ যদি বিদেশ থেকে এসে তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিতে আসেন, আর তার ভোগান্তি পোহাতে হয় চিকিৎসক-নার্সদের। ফলে চিকিৎসক ও নার্সরা যদি হোম কোয়ারেনটাইনে যায়, তাহলে রোগীদের চিকিৎসা দেবে কে? জানা যায়, গত ১৬ মার্চ বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রাইভেট চেস্বারে এক বয়স্ক রোগী দেখেন এই ডাক্তার। রোগী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত থাকায় ওই ডাক্তার পরামর্শ দেন তাকে দ্রুত আইইডিসিআরে যোগাযোগ করার জন্য। এরপর ১৮ মার্চ সকালে ওই ডাক্তার সামান্য জ্বর অনুভব করলে নিজ থেকেই হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যান। পরে ১৯ মার্চ পরীক্ষায় সেই রোগীর কভিড-১৯ পজেটিভ হলে তাকে ভেন্টিলেটরে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২০ মার্চ সেই রোগীটি মারা যায়।

শরীরে জ্বর থাকায় দেশে নেমেই হাসপাতালে লন্ডন ফেরত দম্পতি:  শরীরে জ্বর থাকায় বিমানবন্দরে অবতরণের পর পরই হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে লন্ডন ফেরত এক দম্পতিকে। এ ঘটনা ঘটেছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে অবতরণের পর ওই দম্পতিকে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল সকাল ১১টায় বিমানের একটি ফ্লাইটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন লন্ডন ফেরত ওই দম্পতি। থার্মাল স্ক্যানারে পরীক্ষার সময় তাদের শরীরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ধরা পড়ে। এসময় বিমানবন্দরের মেডিকেল টিম তাদের বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের কোয়ারেনটাইন ইউনিটে নিয়ে যায়।

জানতে চাইল সিলেটের সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মন্ডল বলেন, শরীরে জ্বর থাকায় তাদের দু’জনকে হাসপাতাল কোয়ারেনটাইনে রাখা হয়েছে। আগামীকাল তাদের দু’জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফল যাই আসুক না কেন, নিয়ম অনুযায়ী বিদেশ ফেরত এই দম্পতিকে ১৪ দিন কোয়ারেনটাইনে থাকতে হবে বলে জানান সিভিল সার্জন।  

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ