রবিবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

অয়েজুল হকের উপন্যাস - আজ আকাশে চাঁদ নেই

মারুফ রায়হান : একটি উপন্যাস বলতে আমরা সাধারণত বৃহৎ পরিসরে চিত্রিত জীবনের শেকড় থেকে তুলে আনা কাহিনীকে বুঝি। উপন্যাসের সার্থকতা অনেকাংশে নির্ভর করে চরিত্র চিত্রায়ণে লেখক কতটা নিখুঁত তার ওপর। এছাড়া চরিত্রগুলোর পারস্পরিক মিথক্রিয়া, কথোপকথন, গতিবিধি ও পরিণতি। সবগুলো যায়গা ঠিক থাকলে সেটা পাঠকের হৃদয়ে গেথে যায়। স্থান করে নেয়। আজ আকাশে চাঁদ নেই - উপন্যাসের প্রথমেই বলতে হয় উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কাবুলের কথা। নিন্মবিত্ত পরিবারের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ। সল্প আয়ের পরিবারের বড় ছেলের ঘাড়ে যে কঠিন দায়িত্ব বর্তায় সেটা নিয়েই তার শুরু। কয়েকটা টিউশনি আর পত্রিকায় লিখে সামান্য কিছু রোজগার দিয়ে তার পকেট খরচ চলে কিন্তু বৃদ্ধ বাবার কষ্টে সাহায্য করতে না পারার এক বড় আক্ষেপ লালন করে তার বুকের ভেতর। এ কারণে নারীর প্রতি জন্মগত এক দুর্বলতাকে দূরে ঠেলে তার পথচলা। 

উপন্যাসের মধ্যমনি মেঘলা। বিত্তশালী পরিবারের একমাত্র মেয়ে। পত্রিকায় কাবুলের লেখা গল্প পড়ে তার প্রেমে পড়ে যায়। মেয়েটার অদ্ভুত বায়না, কাবুলকে সে বিয়ে করতে চায়। সত্যিকারের একজন মানুষ কী পারে সদ্যস্নাত প্রস্ফুটিত গোলাপ ছুড়ে ফেলে দিতে? কাবুল ও পারেনি। কাবুল কে বিয়ে করে যেদিন মেঘলা তার শ্বশুরবাড়ি ওঠে  সে দিনই নেমে আসে ঝড়। ধনী গরিবের ভেদাভেদ, হিংসার রোষানলে এলোমেলো হয়ে যায় সব। প্রভাব প্রতিপত্তির দাপট খাটিয়ে কাবুলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়  অপহরণের অভিযোগ। মেঘলা চুপচাপ মেনে নেয় সবকিছু। কিন্তু কেন? যে মেয়েটা তার জন্য সব বিসর্জন দিতে পারে, মানবিক কাবুল বুঝে উঠতে পারে না তার অদ্ভুত আচরণ। ধনী মানুষ সবাই কী এমন স্বার্থপর?

সেখান থেকে কাবুলের জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। জীবনের ছন্দপতন ঘটে। পথেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। নদী আর সাগরে খোঁজে। বিষয়গুলো আমাদের সামাজ ও বাস্তবতার নিরিখে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। উঠে এসেছে একজন বিত্তবান চরিত্রহীন মানুষ ঠিক কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার চিত্র। 

পিতা মারুফ চৌধুরীর কূটকৌশলে ধরাশায়ী মেঘলা যে কাবুলকে ভুলতে পেরেছে তা নয়। নিখাদ ভালোবাসা যে ভোলার নয়। আর কাবুল তো তার স্বামী। একটি মুহুর্ত মেঘলাও ভুলতে পারেনি তার বুকে আঁকা স্বপ্ন। মারুফ চৌধুরী মেয়েকে চার দেয়ালে বন্দী রেখে আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করেন। আনোয়ার হোসেন তার ছেলের জন্য মেঘলাকে পছন্দ করেন। বিয়ে ঠিক হয় মেঘলার। মেঘলার বুকের ভেতর সাজানো স্বপ্নগুলো চুরমার হতে থাকে প্রতিমুহূর্তে। হবু বরের সাথে কথা বলার জন্য মেঘলার হাতে দীর্ঘদিন পর একটা মোবাইল জোটে। মোবাইল পেয়েই মেঘলা তার বিয়ের কথা কাবুলকে জানায়। কাবুল পিতা মাতার কষ্ট বোঝে। একবার তার বুড়ো বাপের উপর ধকল গেছে। মেঘলার বাবা-মার স্বপ্নই বা সে কিভাবে ভেঙে চুরমার করে? মেঘলা কে প্রত্যাখ্যান করে কাবুল। তবু মেঘলা থমকে যায়নি। সে আপন পিতার অপকীর্তি, জোর করে বিয়ে দেয়ার কথা তার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়া ফাহিমকে জানায়। অনুরোধ করে বিয়ের দিন না আসার জন্য। রহস্যময় ঘোলাটে হয়ে ওঠে ঘটনার পর ঘটনা। অন্যদিকে ফাহিমের বাবা আনোয়ার হোসেনকে বহুকাল আগে লুটেরাদের হাত থেকে নিজের জীবন বাজি রেখে  বাচিয়েছিল কাবুল। সেই থেকে আনোয়ার হোসেন কাবুলকে ছেলের মতোই স্নেহ করেন। অথচ কাবুলের চরম অসহায় মুহূর্তেও এসব ঘটনা আনোয়ার হোসেনকে বলেনি। সাহায্য চায়নি। আনোয়ার হোসেনও জানতে পারেননি মেঘলার সাথে কাবুলের বিয়ের কথা। 

মারুফ চৌধুরীর বাড়িতে বিয়ের সানাই বাজে। মেঘলা যেন এক মৃত লাশ। নির্জীব। ঘটনা পরিক্রমা ও চরিত্র চিত্রায়ণে যখন পাঠকের বড় বড় চোখে, কপালে চিন্তার ভাজ। অনেকগুলো লুকানো প্রশ্ন।  মেঘলার বিয়ে হবে ? কাবুল কী করবে! তখনই সকালের কুয়াশা ভেদ করা সূর্যের মিষ্টি আলোর মতো এক চিলতে মিষ্টি আলো নিয়ে ভিন্নভাবে আসে ফাহিম। বিয়েটা হয় না। অহংকারী মারুফ চৌধুরী শেষ পর্যন্ত কাবুল নামের ছেলেটাকেই মেনে নিতে চায়। ঘটনা যখন এমন সে সময় কাবুলকে আর পাওয়া যায় না। রহস্যের জাল বিস্তৃত হয়। কাবুল কোথায়! মেঘলার দিন রাত অন্ধকারে ছেয়ে যায়। হারিয়ে যায়, ডুবে যায় বুকের আকাশে উদিত চাঁদ। সে কী পাবে তার ভালোবাসার কাবুলকে? কোনদিন...। 

কাবুল প্রেমিক পুরুষ হলেও ব্যক্তি হিসেবে অসাধারণ মানবিক গুণের অধিকারী। নৈতিক দায়িত্বে চরম নিষ্ঠাবান। অসহায় এক নারী যখন কিছু হায়েনার স্বীকার, ব্যস্ত নগরীর অসংখ্য মানুষ সে ঘটনার নিরব সাক্ষী হয়ে মজা দেখলেও কাবুল পারে না। কাবুল যেমন সকল মানুষের প্রতি দরদী তেমনই ইভটিজার, অসহায় নারীর পক্ষে গুন্ডাদের বিপক্ষে প্রতিবাদী। মেয়েটির নাম সাদিয়া।

এয়ারপোর্ট এলাকায় তাকে বাচাতে গিয়ে বখাটে গুন্ডাদের হাত থেকে বাচাবার লড়াইয়ে তাদের পর্যদুস্ত করলেও পালাবার সময় এক ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক যখম হয় কাবুল। সাদিয়া রক্তাক্ত কাবুলকে বুকে জড়িয়ে নেয়। সাদিয়া সেও ধনাঢ্য পরিবারের এক মেয়ে। কাবুলকে ঢাকা মেডিকেল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে রেফার করা হলে সাদিয়া তার বাবাকে সাথে করে কাবুলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিংগাপুর নিয়ে যায়। দিনে দিনে সাদিয়া মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ কাবুলকে ভালোবেসে ফেলে। 

একদিকে মেঘলা খুঁজে বেড়ায় কাবুলকে। অন্যদিকে কাবুল ভাবে এতদিনে মেঘলা সব ভুলে ঘর করছে অন্য কারো। সাদিয়ার প্রতিনিয়ত সেবা ও ভালোবাসার হাতছানি। 

শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটুকু আপাতত অজানা থাক। তবে উপন্যাস অনেক দূর গড়ালেও কাবুল, মেঘলা ও সাদিয়ার পরিনতি লেখক সূক্ষভাবে পাঠকের ভাবনার খোরাক হিসাবে রেখে দিয়েছেন। 

উপন্যাসের সবটুকু জুড়ে আছে, স্বার্থপর মানুষের স্বার্থপরতার বাস্তব চিত্র, তেমনই আছে নিঃস্বার্থ ভালো মানুষের ত্যাগের কথা। আধুনিক সমাজ জীবন খুব কাছ থেকে  সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে খন্ড খন্ডভাবে লেখক সেটা চিত্রায়ণ করেছেন। একজন রম্য লেখক হিসাবে অয়েজুল হকের পরিচিতি আছে। উপন্যাসের চরিত্র, কথোপকথনে হাস্যরসের সেই ধারায় লেখক ফিরে গেছেন বারবার। কষ্টের কথা, ঘটনাগুলো পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে রসাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আজ আকাশে চাঁদ নেই- ঝরঝরে, সুখপাঠ্য উপন্যাসটি পাঠকমহলে সমাদৃত হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ