শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

সাহিত্য চিন্তা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : (গত সংখ্যার পর) নৈরাজ্যের মধ্যে জীবন বিকাশ সম্ভব মনে করা বুদ্ধি বিকৃতিরই পরিচায়ক। সেটা যদি সম্ভব হয়ও তাহলে তা নিশ্চয়ই মানুষের জীবন নয়, সেরা সৃষ্টির জীবন নয়, নিতান্তই বন্য ও পাশবিক জীবন। কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষই তার কামনা করতে পারেনা, সে রূপ জীবনের কারণ হতেও প্রস্তুত হতে পারেনা-তার আহবায়ক বা উদ্ভাবক হওয়া তো দূরের কথা। 

জীবনের জন্যে কোন আদর্শ ও নীতির প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। এমন একটা আদর্শ জীবনের জন্যে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, যা বিশ্বালোকে এই অগণিত সৃষ্টির মধ্যে মানুষের প্রকৃত অবস্থানকে সুনির্ধারিত করবে। মানুষ তো বৃক্ষ গুল্ম-লতা বা ঝর্ণা-নদী-সমুদ্র নয় যে তা স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। মানুষ পশু নয়; তাই পাশব-বৃত্তিই তার চালিকা শক্তি হতে পারে না। মানুষ বিবেক বুদ্ধি ও ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যবোধসম্পন্ন সত্তা। তাই তার জীবন এসবের সুস্পষ্ট নির্ধারণকারী এক পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনগ্রাহ্য আদর্শ ছাড়া চলতেই পারে না। সে আদর্শই বলে দেবে, এই জীবনে মানুষের দায়িত্বের পরিসীমা কতদূর। তাই নির্ধারণ করবে প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্য। পারস্পরিক বিরোধ-বিসম্বাদ ও মত-বৈষম্যের মীমাংসা করা সেই সর্বজনীন আদর্শের ভিত্তিতেই সম্ভব। আমাদের আলোচ্য সাহিত্যের দর্শন ও রূপরেখাও তারই আলোকে নির্ধারণ করতে হবে অবশ্যম্ভাবীরূপে। 

তওহীদী ধর্ম (দ্বীন) ইসলামকে সম্মিলিত জীবনের একক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হলে সমগ্র জীবন তথা ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক জীবন দিয়ে তার মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করতে হবে-তার ব্যাপকতা ও পূর্ণাঙ্গতাকে অক্ষুন্ন রাখতে হবে। তওহীদ বিশ্বাসের ঐকান্তিক দাবি হচ্ছে নিজের সমগ্র জীবন দিয়ে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি বিধান। তার সেই সন্তুষ্টি বিধানে যেমন নিয়োজিত করতে হবে ব্যক্তি-সত্তার অন্তর্নিহিত তাবৎ শক্তি ও প্রতিভাকে, তেমনি এই বিশ্বলোকের সমস্ত দ্রব্য ও সামগ্রীকে। এর কোন একটিকেও তার অসন্তোষ ও ক্রোধ উদ্রেককারী কাজে ও নিয়মে ব্যবহার করা যেতে পারে না তার অধিকারও কারোর নেই। 

ক্রোধ, লোভ ইত্যাকার প্রবৃত্তি মানব সত্তায় নিহিত বিভিন্ন গুণ। এই গুণসমূহের শক্তি অদম্য। তাই ইসলামের নিদের্শ হচ্ছে এই গুণ ও তার শক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সংযত রাখা তাকে কোনক্রমেই বলগাহীন না করা বল্গাহীন হতে না দেয়া বরং নির্দেশিত পথে ও নিয়মে তাকে চরিতার্থ করা। 

ক্রোধকে সংযত করা এবং অপরাধীকে ক্ষমা করা কুরআনের শিক্ষা। মানুষের জন্যে তা এক অতীব উচ্চ মানের নৈতিকতা। যারা ক্রোধকে সংযত রাখে এবং অপরাধীকে ক্ষমা করে, তারা মহান স্রষ্টার প্রিয়জন। সাহিত্যের (গদ্য বা কবিতার) সাহায্যে মানুষে মানুষে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে হিংসার আগুন জ্বালানো মানব সমাজের জন্যে ক্ষতিকর এবং এই গুণটিরও চরম অপব্যবহার। জাহিলী যুগে কবি সাহিত্যিকরা তাদের কাব্য ও সাহিত্য দ্বারা গোত্রসমূহের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার আগুন উৎক্ষিপ্ত করে তুলতো; প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করতো। অপরাধকে যে ক্ষমা করা যায় তা ছিল তখনকার মানুষের কল্পনারও অতীত। ইসলাম কাব্য ও সাহিত্যের এই অপব্যবহার বন্ধ করে দেয় এবং মানুষে মানুষে বন্ধুতা-ভালোবাসা ও সদ্ভাব-সম্প্রীতি সৃষ্টির কাজে তার ব্যাপক ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। মানুষের জীবনকে তা সম্মানিত ও সম্মানার্হ করে তোলে। এহেন মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা, অপমান এবং তার ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালানোর প্রতি সমর্থন জানানো হয় যে সাহিত্যে কিংবা যে সাহিত্য মানুষকে এই কাজে প্রলুব্ধ করে, সে সাহিত্য মানুষের জন্যে কিছুমাত্র কল্যাণকর নয়। ইসলামে এরূপ সাহিত্যের কোন স্থান নেই।

লোভ মানুষকে অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণে প্রবৃত্ত করে। পরাস্বাপহরণ, শোষণ ও বঞ্চনার মূলে সর্বাধিক কাজ করে এই লোভ। তাই মানুষকে লোভাতুর, শোষক ও বঞ্চনাকারী বানানো সাহিত্যের কাজ হতে পারে না। সাহিত্যকে এ কাজে ব্যবহার করা হলে তা যে মানবতার জন্যে চরম দুঃখের কারণ হবে তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। ইসলামে লোভকে সংযম ও বৈধতার বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ রাখার শিক্ষা অবিস্মরণীয়। 

প্রবৃত্তি মানুষের প্রধান চালিকা শক্তি। তাকে অবশ্যই আদর্শের নিগড়ে বন্দী করতে হবে। অন্যথায় তা মানব সমাজে সেই কঠিন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে, যা একটি ক্ষুধার্ত ও ক্রুদ্ধ শার্দুলকে পিঞ্জরমুক্ত করে দেয়া হলে অনিবার্যরূপে সংঘটিত হতে পারে। এই কারণে ইসলামে শুধু ব্যভিচারই নিষিদ্ধ নয়, ব্যভিচার ঘটাতে পারে এমন পরিবেশ সৃষ্টির আয়োজনও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তার সহায়ক বা সমর্থক কোন পথই উন্মুক্ত থাকতে পারে না ইসলামের দৃষ্টিতে। তাই যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সাহিত্যও ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীল এবং সর্বপ্রযতেœ পরিত্যাজ্য। জাহিলী যুগের আরবী কাব্য ইসলামের কোন স্থান পায়নি। তার পরিবর্তে এমন উন্নতমানের কাব্য রচিত হয়েছে যা মানুষকে উচ্ছৃঙ্খল ও চরিত্রহীন  হতে দেয় না; বরং মানুষকে বানায় উন্নত ও পবিত্র চরিত্রে ভূষিত। তখনকার সাহিত্য কাব্য ও গদ্য রচনা উভয়ই ব্যবহৃত হয়েছে এই লক্ষ্যে। প্রধানত গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মানুষকে ইসলামী আদর্শের আহবানের সঙ্গে সুপরিচিত ও একাত্ম করার কাজে। অনেক বড় মাপের কবিও তাদের কাব্য প্রতিভাকে এই কাজে ব্যবহার করেছেন। ‘এই প্রসঙ্গে মহাকবি রুমী, জামী, সা’দী ও ইকবালের অসামান্য খেদমতের কথা স্মরণ করা যেতে পারে।’ কেননা ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পালনই একজন তওহীদ-বিশ্বাসীর কাজ নয়, দুনিয়ার অন্যান্য মানুষের নিকট তার দাওয়াত পৌছানোও তার অন্যতম মানুষের নিকট তার দাওয়াত পৌছানোও তার অন্যতম প্রধান কর্তব্য। ‘ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ’ এ সাহিত্যের অন্তর্নিহিত ভাবধারা। তাই ভালো মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং শ্লীল-অশ্লীলের মানদন্ড কুরআন কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত। 

মানুষ ও মানুষের মধ্যে বংশধারা, গোত্র-বর্ণ, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদির ভিত্তিতে পার্থক্য ও বিভেদ সৃষ্টি মানবতার চরমতম অপমান। ইসলাম তা বরদাশত করতে প্রস্তুত নয়। ইসলামের ঘোষণা হচ্ছে, দুনিয়ার সব মানুষ একই পিতা ও মাতার সন্তান। সকল মানুষের দেহে এক ও অভিন্ন শোনিতধারা প্রবাহমান। সুতরাং মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে যদি কোথাও কোনরূপ পার্থক্য করা হয় তবে তা নিঃসন্দেহে মানবতার শত্রুদের সৃষ্টি-মহান স্রষ্টার নয়। কেউই অন্য কারোর তুলনায় অভিজাত, শ্রেষ্ঠ বা উচ্চ মর্যাদা লাভের কিম্বা অন্যদের থেকে ভিন্নতর হওয়ার অধিকারী নয়। এ ধরনের চিন্তা, বিশ্বাস বা মতাদর্শ মৌলিকভাবেই মানবাতা-বিরোধী। তাই যে সাহিত্য মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বিভক্তির প্রেরণা যোগায়, সে সাহিত্য মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রশ্ন ওঠতে পরে, তবে কি কোনরূপ পার্থক্যই করা যাবে না মানুষে মানুষে? করা যাবে, তবে কুরআনের দৃষ্টিতে সে পার্থক্য হবে শুধু নৈতিকতার। আল্লাহমুখিতার মাত্রা ও মানগত অবস্থার ভিত্তিতে পার্থক্য করা যেতে পারে, করা হবেও। এ পার্থক্য কোন মানুসের নিকটই চিরস্থায়ী বা অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর নয়। আজ যে মন্দ, কাল সে সবার তুলনায় ভালো হতে পারে। আজ যে অসৎ, কাল সে হতে পারে সততায় শীর্ষস্থানীয়। আবার এর বিপরীতটাও সম্ভবপর। এসবই মানুষের আয়ত্তাধীন ইচ্ছাধীন। এ পার্থক্যকরণ ব্যক্তির উন্নতি বিধানের সহায়ক; উন্নত মানের সমাজ গঠনের জন্যে এটি অপরিহার্যও বটে। 

যে সমাজ সমষ্টি ও তার ব্যক্তিগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবে, সে সমাজ সার্বিক কল্যাণ্যে ধন্য হবে ইহকালেও, পরকালেও। কিন্তু কোন জাতি যদি দুষ্কৃতি, চরিত্রহীনতা ও উচ্ছৃঙ্খলতায় নিমগ্ন হয়, বিশ্বস্রষ্টার আদেশ লংঘনে মেতে উঠে, বৈধ-অবৈধ বা ন্যায় অন্যায়ের সব বন্ধন ছিন্ন করে অতিক্রম করে যায় নীতি-নৈতিকতার সব সীমা তখন সে জাতি দুনিয়ার বুকে টিকতে পারে না, তার পতন ও ধ্বংস অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। কেননা এই বিশ্বলোক একটি নিরেট ভারসাম্যের ওপর স্থিত। সে ভারসাম্য বিনষ্ট হলে বিপর্যয় অত্যন্ত স্বাভাবিক। একটি জাতি যতই উন্নতির উচ্চাসনে, ক্ষমতার শীর্ষে বা নেতৃত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হোক না কেন, তার ক্ষেত্রেও এ শাশ্বত নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে না। তাই ইসলামে আদর্শ ব্যক্তি গঠনের সাথে সাথে উন্নত মানের চরিত্র ও ন্যায় নীতির ধারক সমাজ গঠনের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপতি হয়েছে। কুরআন মজীদে এই পর্যায়ের কোন কথাই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি, বলা হয়েছে সমাজ-সমষ্টিকে সম্বোধন করে বহু বচনে। তাই সাহিত্যকে অবশ্যই এই কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করতে এবং রাখতে হবে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ