শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

জীবনের ঋতু বৈচিত্র্য

মোহাম্মদ আবদুর রহমান :  পৃথিবীতে ঋতু বৈচিত্র্য ঘটে। আপন মনে এক এক সময় এক এক ঋতু এসে উপস্থিত হয়। সকলের সব ঋতু পছন্দ নয়। তবুও কিছু করার থাকেনা। মেনে নিতে হয় মাথা পেতে। এক এক ঋতুর সময় এক এক সংগ্রাম করতে হয় বেঁচে থাকার জন্য। তেমনিই মানুষের জীবনেও ঋতু বৈচিত্র্য দেখা যায় ষ

    আশরাফুল কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। যেন তার গ্রীষ্মকাল চলছে। দুঃখের তাপে ফেটে গেছে হৃদয়ের উর্বর জমি। সুখের গাছগুলি আসতে আসতে শুকিয়ে গেছে। একটু ভালোবাসার জলের অভাবে পাতাগুলি ঝরতে শুরু করেছে 

  সে প্রতিদিন ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে পাশের বাজারে পানের দোকান করে। সেই দোকানের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল। সব সময় তার কিছু না কিছুর অভাব লেগেই থাকে। তাই স্ত্রীর কাছে শুনতে হয় অনেক কথা। ছেলে মেয়েরা বারবার অভিযোগ করে স্কুলের টিউশন ফী অনেক বাকি হয়ে গেছে। স্কুলের প্রধানশিক্ষক নাকি বলেছেন কয়েক দিনের মধ্যে টাকা না দিলে তাদের স্কুল থেকে বের করে দেবে। ছোট মেয়েটা একটি নতুন জামার জন্য কয়েক দিন ধরে রাগ করে আছে। তাই বাড়ির ভেতর ঢুকতে তার ভয় করে অবশ্যই কোন না কোন অভিযোগের তীর তার দিকে ছুঁড়ে আসবে। আর ছিন্নভিন্ন করবে তার হৃদয়কে। 

   জীবনের সব কিছু যেন ঘন অন্ধকার হয়ে গেছে। ব্যর্থতার চাপে যেন তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। সে যেন দুঃখের মরুভূমিতে আটকে গেছে। একটু সফলতার জলের জন্য ছটফট করছে। প্রকৃতি তাকে নিয়ে যেন খেলা করছে। তার জীবনে যেন মরীচিকা লেগেছে। প্রতিদিনের মতো আজও খুব সকাল সকাল ঠেলা নিয়ে বাজারে যায়। পানের জন্য মসলা তৈরী করছে ঠিক তখন একজন ভদ্রলোক ট্যাক্সি থেকে নেমে  তার কাছে যায় আর বলে -আমাকে একটি পান দেন দাদা।

আশরাফুল মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে - কি দিয়ে পান খাবেন স্যার। লোকটি কি দিয়ে পান খাবে তার নির্দেশ দিল। আশরাফুল পান তৈরী করে তাকে দিল। লোকটা পান চিবাতে চিবাতে বলল - আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। দাদা আপনার নাম কি ?

- আশরাফুল। 

- আপনার কি কোন ডাক নাম আছে ? 

-হ্যাঁ। আছে।

- সেটাকি বাবলু।

আশরাফুল আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকালো। আর বলল- আপনি কিভাবে জানলেন একথা ?

- আমি আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনি। আসলে আপনার চেহারার এত অবনতি হয়েছে যে খুব কষ্ট করে চিনতে হল।

- আপনার নাম কি স্যার।

- আর আমাকে আপনি ও স্যার বলবেন না। আমি করিম। আপনার প্রতিবেশী শরীফুদ্দিনের ভাগ্নে। 

-ওহ। চিনতে পেরেছি। আসলে তোমার চেহেরার অনেক উন্নতি হয়েছে তাই প্রথমে চিনতে পারিনি। তুমি এখন কি করছ?

-ফুটবল কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছি রাজধানীতে। তবে আপনার কাছে পাওয়া মৌলিক শিক্ষাগুলি না পেলে হয়ত এত দূর পৌঁছাতে পারতাম না।

- ও সব কথা বাদ দাও করিম। 

-কেন দাদা ? আপনাকে ভুলে গেলে আমার মহাপাপ হবে।

- পৃথিবীতে সব চেয়ে বড় স্বার্থপর জীব হল মানুষ। যতক্ষণ পাই ততক্ষণ মনে রাখে। বলে সে কাঁদতে শুরু করে নিঃশব্দে। চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ে মাটিতে। যেন দুঃখের বন্যার বাঁধ কেটেছে। যা তাড়াতাড়ি মেরামত করা সম্ভব নয়। 

করিম আশরাফুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে- দাদা আপনার এরকম অবস্থা হলো কিভাবে ? প্রথমে কিছুই বলতে চায়নি। সেভাবে কথা শুনার কে আছে। এতকাল ধরে বলতে চেয়েছি অনেককে। কিন্তু কেউ শুনেনি। তাই সে আজ আর কাউকে বলতে চাইনা সে কথা। কিন্তু করিম নাছোড়বান্দা। সে জানতে চায় সবকিছু। অনেক চেষ্টার পর আশরাফুল বলতে শুরু করে তার কিভাবে বসন্তকাল গ্রীষ্মকালে পরিণত হলো।

   আশরাফুলের ডাকনাম বাবলু। সে ছিল তার শহরের সব চেয়ে বড় মাপের ফুটবলার। সে কোন ফুটবল ম্যাচে খেলতে নামলে দর্শকরা একটি শব্দে মাঠ ভরিয়ে দিত। বাবলুদা...,বাবলুদা...বলে। আর সে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য গোলের বন্যা বইয়ে দিত। অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের আদর্শ ছিল সে। করিমও ছিল তাদের মধ্যে একজন। সে তেমন খেলতে পারত না। তাকে হাতে ধরে খেলা শিখিয়ে ছিল বাবলু। তার ছোঁয়ায় অনেক জুনিয়ার খেলোয়াড় অনেক নাম করেছে ।

  তার একটি স্বপ্ন তাকে সব সময় তাড়া করত। কখন যে তার ক্লাবকে দেশের সেরা করবে। ক্লাবের জন্য সে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। তার ফল স্বরূপ অনেক বড় বড় ট্রফি এনে দিতে পেরেছে। নিজেও ছিনিয়ে নিয়েছে অনেক ম্যাচের সেরা ও টুর্নামেন্টের সেরা পুরস্কার। উৎসবমুখর ছিল তার জীবন। তার প্রতিভা দেখে অনেক ক্লাব কিনতে চাই তো। কিন্তু সে একবারও নিজের কথা ভাবেনিষ তাই সে তাদের প্রলোভনে পা দেয়নি। তাল গাছের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখত আকাশ ছোঁয়ার। 

 

 জেলার হয়েও অনেক বার খেলেছে। বাবলুদা বললে সবাই তাকে এক বাক্যে চিনতে পারে। সে অনেক সরকারি অনুষ্ঠানে যেত অতিথি হিসেবে। জেলার এমন কোন বড় স্কুল নেই যে সে স্কুলে অতিথি হিসাবে যায়নি। তার সহকারী অনুষ্ঠান ও খেলার তারিখ মনে রাখতে হিমশিম খেত।

 

  একদিন তার ক্লাবের হয়ে খেলতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বাইকে যাচ্ছিলো এমন সময় তার দুর্ঘটনায় বাম পা ভেঙে যায়। সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকে। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা করার পর জানিয়ে দেয় তাকে উন্নত কোন শহরে নিয়ে যেতে হবে না হলে সে পা পাবে কিন্তু ফুটবল খেলতে পারবে না। তৎক্ষণাৎ ক্লাব কর্তৃপক্ষ বারবার দুঃখ প্রকাশ করে এই ঘটনার জন্য। পরবর্তী সময়ে কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। পরে তার পরিবারের লোকজন ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা যেন চিনতে পারে না বাবলুকে। এক কালবৈশাখী ঝড়ে এলোমেলো হয়ে যায় তার জীবনের সবকিছু। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যায় তার জীবনের সকল সুখের রাজপ্রাসাদ। তাকে ঘিরে ধরেছে হতাশার কালো মেঘ। যা অবিরত চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে ।

   সে কোন রকম নিজের সব কৃষি জমি বিক্রি করে পা পেয়েছে কিন্তু ফুটবল খেলতে পারবেনা। কারণ ডাক্তার বারণ করেছে। আসতে আসতে বাবলু বিলীন হয়ে গেছে মানুষের মন থেকে। আর পরিণত হয় আশরাফুলে।

সবাই ভুলে গেছে তাকে। ভুলে গেছে ক্লাবের কর্তৃপক্ষ। যে ক্লাবের জন্য নিজের কথা ভাবেনি কোনদিন। সেই ক্লাব থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দান করে অনেক দুস্থ মানুষের মাঝে। অথচ কেউ একবারও কোনদিন তাকে সাহায্য করার কথা ভাবেনি। আর কেউ ডাকে না কোন অনুষ্ঠানে।

করিম তার কাহিনী শুনে চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেনি। তার মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, যে লোকটির সাথে দেখা করার জন্য লাইন দিত অনেক মানুষ সে আজ পথের ধারে পানের দোকান করছে। করিম মনে মনে ভাবে বাবলুদা এই রকম পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন জীবনের ঋতু বৈচিত্র্যের জন্য। তাই সে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাই আলোর দিকে। দেখাতে চাই সফলতার পথ। সে তাকে একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে বলল আপনি কালকেই চলে আসেন এই ঠিকানায়। আপনাকে আমার কোচিং সেন্টারের প্রধান প্রশিক্ষক হিসাবে চাইছি। ফিরিয়ে দেব অপনার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন। বলে সে চলে যায়।

আশরাফুল অনেক ভাবে কি করবে। সে কি যাবে না যেমন ছিল তেমনি থাকবে। তৎক্ষণাৎ বুকের ভেতর জ্বলে উঠে প্রতিহিংসার আগুন। যাদের জন্য সে নিজে ফুটবলে পরিণত হয়েছে। যে যেমন পেরেছে খেলেছে তাকে নিয়ে। আর নয় ফুটবল খেলতে না পারলেও খেলাতে তো পারব। আবার সূর্য হয়ে উঠব খেলার জগতে। সেই বাবলু সূর্য। যার আলো গায়ে মেখে আলোকিত হবে ঘন অন্ধকারে ডুবে থাকা খেলোয়াড়েরা ।

 পরের দিন আশরাফুল চলে যায় করিমের ফুটবল কোচিং সেন্টারে। নিযুক্ত হয় প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে। কয়েক দিনের মধ্যে সকল খেলোয়াড়ের মন জয় করে নেয়। যেন বাবলু নামক সূর্যটা আবার ডানা মেলেছে ফুটবলের আকাশে। আর কিছুদিন পর সে আসতে আসতে বড় ক্লাব প্রশিক্ষকের অফার আসতে থাকে। আর সে আগের মতো একটি জায়গায় স্থির থাকে না। গ্রহণ করে সে বড় জায়গাগুলি। তার স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপের উপর আবার গড়ে উঠেছে সাফল্যের ইমারত। আর কোন অভিযোগের তির আসে না তার দিকে। ভালোবাসার আলোয় ভরে গেছে তার হৃদয় ভুবন। তার বড় ছেলে আজ এক নামকরা ক্লাবের অধিনায়ক। আর সেই ক্লাবের সে প্রধান প্রশিক্ষক ।

  কিছুদিন পর দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলা হয়। অর্থাৎ দেশের চ্যাম্পিয়ন শিপ খেলা। খেলা শুরু হলে আসতে আসতে পৌঁছে যায় তার দল সফলতার উচ্চ শিখরে। তার দল ফাইনালে উঠেছে। আর প্রতিপক্ষ তার খেলোয়াড় জীবনের ক্লাবের বিরুদ্ধে। আজ প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। সঠিক সময় খেলা শুরু হয়েছে। বাবলুর আজ স্বপ্ন পূরণের দিন। তার ছেলে তার স্বপ্ন পূরণ করবে এ তার দৃঢ় বিশ্বাস। এক পাশে স্ত্রী আর অন্য পাশে বসে আছে ছোট মেয়েটা অনেক দামি পোশাক পরে। তারা বলছে তোমার স্বপ্ন আজ পূরণ হবেই। কিছুক্ষণ যেতেই গোল দেয় তার ছেলে। আজ খুশীতে তার মরে যাওয়ার ইচ্ছা করছে। সময় যত বাড়ছে ততই যেন গোলের ব্যবধান বাড়ছে। আর তার স্বপ্ন যেন নেচে নেচে বিজয় জয়গান গাইছে। ঠিক সময় তার ক্লাব দেশের সেরা দলে পরিণত হয়। 

তার পুরনো দলের কর্তৃপক্ষ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে বাবলুর দিকে। বাবলুর আগের কথা মনে পড়ছে তাদের। সে বলত যে ভাবেই হোক তার দলকে দেশের সেরা করবেই। সে আজ তা করে দেখিয়ে দিল। আজ তার বিজয় পথ রুখবে কে? জীবনের ঋতু বৈচিত্র্যের ফলে আবার এসে গেছে বসন্ত। তাই শুধু ফুল ফুটে বিজয়ের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ