শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

‘নবীর হাতের শিরনী। তার হাতে আবে কাওসারের পানি’

শফি চাকলাদার : নজরুল কোন পুরস্কারের প্রতি লালায়িত ছিলেন না। তিনি বলতেন একটি পুরস্কারের প্রতিই আমি সকল সময়ে মনে প্রাণে প্রত্যাশী আর সেটি হল “নবীর হাতের শিরনী। তার হাতে আবে কাওসারের পানি।” নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি সমগ্র মুসলমানের যেমন শ্রদ্ধা ভালোবাসা নজরুলেরও তার কমতি ছিল না বরং বেশিই ছিল। এবং তার প্রমাণও তিনি রেখে গেছেন তার অসাধারণ অসংখ্য ইসলামি সঙ্গীতের মধ্যে প্রবন্ধে গল্পে উপন্যাসে অনবরত। তুলনাহীন যে সব অবদান যা একজন মুসলমানকে উদ্বুদ্ধ করে সকল সময়ে। নজরুলের অসংখ্য এমন নবী-প্রিয়তা এবং আল্লাহ-প্রিয়তার স্বাক্ষর নিয়ে সামান্য কটা নজরুল উদ্ধৃতি এ লেখায় তুলে ধরছি কেন নজরুলের কাছে কোন পুরস্কারই মূল্যবান নয় শুধু মূল্যবান ‘নবীর হাতের শিরণী। তার হাতে আবে কাওসারের পানি।” নজরুলের বিখ্যাত প্রবন্ধ “আমার লীগ কংগ্রেস” এ নজরুল বলেন, “ইসলাম ধর্ম এসেছে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে কোরান মজিদে এই মহাবাণীই উত্থিত হয়েছে।... এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভু নাই। তার আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আমি যদি আমার অতীত জীবনে কোনো ‘কফুর’ বা ‘গুণাহ’ করে থাকি তার শাস্তি আমি আমার প্রভু আল্লার কাছ থেকে নেবো। তার শাস্তি কোনো মানুষের দেওয়ার অধিকার নাই আল্লাহ লা-শরিক, এক মেবা দ্বিতীয়ম। কে সেখানে ‘দ্বিতীয়’ আছে যে আমার বিচার করবে? কাজেই কারো নিন্দাবাদ বা বিচারকে আমি ভয় করি না।

আল্লাহ আমার প্রভু, রসুলের আমি উম্মত, আল-কোরান আমার পথ-প্রদর্শক।”

আল্লাহ তা’লার প্রতি নজরুলের কতটা দৃঢ় বিশ^াস, ভক্তি, আনুগত্য ছিল তা এই “আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধেই অন্যত্র পাইÑ “আমার কবিতা আমার শক্তি নয়, আল্লার দেওয়া শক্তিÑ আমি উপলক্ষ মাত্র। বীণার বেণুতে সুর বাজে কিন্তু বাজান যে গুণী, সমস্ত প্রশংসা তারই। আমার কবিতা যাঁরা পড়ছেন, তারাই সাক্ষী; আমি মুসলিমকে সংঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমুখতা, ক্লৈব্য, অবিশ^াস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি। বাংলার মুসলমানকে শির উঁচু করে দাঁড়াবার জন্যÑ যে শির এক আল্লাহ ছাড়া কোনো স¤্রাটের কাছেও নত হয়নিÑ আল্লাহ যতটুকু শক্তি দিয়েছেন তাই দিয়ে বলেছি লিখেছি ও নিজের জীবন দিয়েও তার সাধনা করেছি। আমার কাব্য শক্তিকে তথাকথিত ‘খাটো’ করেও গ্রামোফোন রেকর্ডে শত শত ইসলামি গান রেকর্ড করে নিরক্ষর তিনকোটি মুসলমানের ইমান অটুট রাখারই চেষ্টা করেছি। আমি এর প্রতিদানে সমাজের কাছে জাতির কাছে কিছু চাইনি। এ আমার আল্লার হুকুম, আমি তার হুকুম পালন করেছি মাত্র। আজো আমি একমাত্র তাঁরই হুকুমবরদাররূপে কর্মক্ষেত্রে অবতরণ করেছিÑ আমার দীর্ঘদিনের গোপন তীর্থযাত্রার পর।”

“আল্লাহর পথে আত্মসমর্পণ” প্রবন্ধে নজরুল বলেন, “ইন্না সালাতি ও নুসকি ওয়া মাহয়্যায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন” আমার সব প্রার্থনা, নামাজ রোজা তপস্যা জীবন মরণ সবকিছু বিশে^র একমাত্র পরম প্রভু আল্লাহর পবিত্র নামে নিবেদিত।”

‘নিত্য প্রবল হও’ কবিতায় নজরুলের আল্লাহ ভক্তির চরম নির্দশন লক্ষ্য করা যায়Ñ

যে মাথা নোয়ায়ে সিজদা করেছ এক প্রভু আল্লারে

নত করিও না সে মাথা কখনো কোনো ভয় কোনো মারে।

নজরুল প্রথম ইসলামি গান রচেন ১৯২৫ সালে। মুসলিম জাতিকে। এ অঞ্চলের উদ্বুদ্ধ করতেÑ যাদের ছিলনা নিজেদের উদ্বুদ্ধ করার এমন শক্তিশালী মাধ্যম। উল্লেখ করছি কটি গানে কথাÑ

১। ‘নব জীবনের নব উত্থান আজান ফুকারি এসো নকীব’ শিরোনাম ‘নকীব’। রচনাকাল ১৩৩২ সালের ১৩ অগ্রহায়ণ ২৯ নভে: ১৯২৫ সাল। পরবর্তীতে বরিশালে ‘নকীব’ ১৩৩২ এর মাঘ মাসে প্রকাশ পায়। 

২। ‘আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশাণ সোনালী’ শিরোনাম ‘খোশ আমদেদ’। ভৈরবী রাগে নির্মিত কাহারবা তালের এই গানটি রচিত হয় ১৯২৭ এর ২৭ ফেব্রুয়ারি ফালগুন ১৫/১৩৩২ পরবর্তীতে ১৩৩৩ এর চৈত্র সংখ্যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র প্রজন্ম বার্ষিক ‘শিখা’তে প্রকাশ পায়।

৩। ‘বাজল কিরে ভোরের সানাই নিঁদ মহলার আঁধারপুরে’ শিরোনামে ‘ভোরের সানাই’। রচনাকাল ১৩৩৫ এর অগ্রহায়ণ ১৯২৮ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর। গানটি ছিল নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত। শ্রীহটে। এই তিনটি গান নজরুল স্বয়ং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছেন।

৪। ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ রচনার পরবর্তী দিনে রচেন ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’ ১৯৩২ এর ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ডে গৃহীত হয়। বঙ্গাব্দ ১৩৩৮ এর ফালগুনে। প্রথম তিনটি ইসলামি গান আগে রচিত হলেও রেকর্ড হয়নি। ৪ নং ৫ নং গান দুটি বাংলা সঙ্গীত ভা-ারে প্রথম রেকর্ড হিসেবে যুক্ত হয়। ১,২ এবং ৫ নং সঙ্গীত নাত-এ রাসূল। ৩ এবং ৪ ইসলামি চেতনার গান।

‘সমগ্র নজরুল’ যদি আমাদের জানার মধ্যে দিয়ে আসি তবে নরজুলের লেটো দলের বিশাল অবদানকেও সাহিত্য সঙ্গীতে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই তো হয়ে উঠবে ‘নজরুল সমগ্র’র সঠিকতা। এবং ওই লেটো দলের সময়তেও নজরুল ইসলামি গান রচেছেন এবং অসংখ্য। এখানে কয়েকটি গানের মুখরাটুকু তুলে ধরছিÑ (নজরুল তখন ১০-১৩ বছর)।

১। আসর বন্দি আগে নামতে তোমার

২। নেগাবান হও রহমান আজি আমার আসরে 

৩। মরুর বালু ভিজালো আজ নবীর জল

৪। পড়েছ কাঁদায় হে, এই বারে, সভার মাঝে

৫। নামাজী, তোর নামাজ হলো রে ভুল

৬। আল্লা আমার মাথার মুকুট, রসুল গলার হার

৭। দাও দখিনা, দাও গো বিদায়, কারবালাতে যায়।

৮। মরুর তরু তলে সখিনা ঘুমায়

৯। ইসলামের বাণী লয়ে, কে এলো ধরাতে

১০। কবে সে মদিনার পথে, গিয়াছে সুজন

১১। সদা মন চাহে মদিনা যাব

১২। মেষ চারণে যায় রে, হাসিন আমিনা দুলাল

নজরুল-গবেষকদের গবেষণায় নজরুলের কেবল ‘ও মন রমজানের ওই’তে সীমাবদ্ধ থাকলে নজরুলের বিশাল অবদান না-জানাই থেকে যাবে এবং যাচ্ছে। নজরুলের ইসলামি গান রচনার মানসিকতা সেই লেটো দলের সময়তে ছিল এবং হিন্দু ধর্মীয় সঙ্গীতের প্রতিও ছিল। নজরুলর আলোচনায় এসবের গুরুত্ব বিবেচনায় আনতে হবে তবেই নজরুল-গবেষণা সার্থক হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে নজরুলের লেটো দলের রচনা সমূহ কিন্তু প্রচুর রয়েছে। অর্থাৎ লেটো দল, সাহিত্য সঙ্গীত জীবন এবং অসুস্থ জীবনÑ এই তিনটি ভাগে নজরুল গবেষণা হতে হবে। তবেই সাংস্কৃতিক অঙ্গন সম্পূর্ণ নজরুলকে উপস্থাপন করতে পারবে। পুনরায় এই লেখার ‘শিরোনাম’ এ যাচ্ছি। নজরুল কখনো পুরস্কারের জন্য বিশেষণের জন্য লালায়িত ছিলেন না। তিনি এসব ঘৃণা করতেন। নজরুল নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিঃস্ব^দের নি¤œশ্রেণিদের জীবনধারণ কি করে সাহিত্য সঙ্গীতের মাধ্যমে তুলে ধরবেন সেদিকেই সকল সময় নিবিষ্ট রইতেন। তাদের প্রতি লিখতে পারাটাই এক বিশাল আনন্দ এক বিশাল পুরস্কার স্বরূপ। তিনি আবাল-বৃদ্ধ বণিতাকে উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করাতে তাঁর ছিল প্রবল আনন্দ এবং তাক্ েতিনি মনে করতেন জীবনে কিছু করতে পারলামÑ নজরুল তাই বলেন,

‘দরিদ্র মোর নামাজ ও রোজা, আমার হজ জাকাত;

উহাদেরি বুক কাবা-ঘর; মহা মিলনের আরফাত।’

ফাতেহা দোয়াজ দাহম আবির্ভাব এবং তিরোভাব কবিতা এবং ‘মরু-ভাস্কর’ গ্রন্থে নবী (সা.) জীবনকে যে অসাধারণ পংক্তিমালায় তুলে ধরেছেন তা কখনো মলিন হবার নয়। নবী (সা.) জীবনের প্রতি এমন ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে আর কেউ কখনো ছাড়েিয় যেতে পারবে এমনটা কখনোই আশা করা বৃথা। তাই তো নজরুল এমন বাণীতে (সা.) কে একের পর এক এমন মণিমুক্ত সজ্জিত শব্দালঙ্কারে উপস্থিত করতে পারেনÑ

আমার মোহাম্মদের নামের ধেয়ান হৃদয়ে যার রয়

ওগো হৃদয়ে যার রয়

খোদার সাথে হয়েছে তার গোপন পরিচয়।

ঐ নামে যে ডুবে আছে/ নাই দুখ-শোক তাহার কাছে

ঐ নামের গুণে দুনিয়াকে সে দেখে প্রেম ময়।

যে খোশ্ নসীব গিয়াছে ঐ নামের ¯্রােতে ভেসে’

জেনেছে কে কোরআন-হাদিস ফেকা এক নিমেষে।

 মোর নবীজীর বর মালা/ করেছে যার হৃদয় আলা

বেহেশতের সে আশ্ রাখে না, তার নাই দোজখে ভয়।

নবী করিম (সা.) কে নিয়ে তাঁর অসংখ্য গান রয়েছেÑ যেমন এ গানটিতে তার (সা.) প্রতি সঁপে দিয়ে লাইন সাজানÑ

আমার ধ্যানের ছবি আমার হজরত

ও নাম প্রাণে মিটায় পিয়সা/ আমার তামান্না আমারি আশা

আমার গৌরব আমারি ভরসা/ এ দীন গোনাহগার তাহারি উম্মত।

এ নামে রওশন জমীন আসমান/ ও নামে মাখা তামাম জাহান

ও নামই দরিয়ায় বহায় উজান/ ও নাম ধেয়ায় মরু ও পর্বত।

আমার নবীর নাম জপে নিশিদিন/ ফেরেশতা আর পুর পরী জিন্

ও নাম জপি আমার ভোমরায়/ পাব কিয়ামতে তাঁহার শাফায়াৎ॥

‘পাব কিয়ামতে তাঁহার শাফায়াৎ’ হয়তো বা নজরুল ‘নবীর হাতের শিরণী। তার হাতে আবে কাওসারের পানি’ পুরস্কারের আশায় নিজেকে সকল সময় ব্যাপৃত রেখেছেন। ‘সাহারাতে ফুটলোরে রঙ্গীন গুলে লালা’ তে নজরুল সকল সময় তাহার ধ্যানে মশগুল থাকতেন। রচেছেন নানান উপমা। এমন উপমা তো নজরুলই করতে পারেন। পেরেছেনও ওই আমাদের প্রিয় নজরুল। “সৈয়দে মক্কী মদনী আমার নবী মোহাম্মদ/ করুণা-সিন্ধু খোদার বন্ধু নিখিল মানব-প্রেমাম্পাদ’ গানে নজরুল তার প্রিয় নবী (সা.) কে যে শব্দালঙ্কারে তুলে ধরেছেন তা কি প্রতিটি মুসলমানের কাম্য কাব্য খুষমা নয়? আর তাইতো নজরুলের আশাÑ “আমি চলে যাবার পর কিছু পুরস্কার আমার ভাগ্যে জুটবে। নোবেল বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার আমার জন্যে নয়। শাহরিয়ার, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এবং মৃত্যুর পরেও আমি একটি পুরস্কারের প্রত্যাশী কী সে পুরস্কার, কাজী দা? নবীর হাতের শিরণী। তার হাতে আবে কাওসারের পানি।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ