শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ঝলমলে সভ্যতায় নেই কোনো বাতিঘর

মানুষ বাঁচতে চায়, জীবন মানুষের প্রিয় বিষয়। বেঁচে থাকার জায়গা তো পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহটি। সুন্দর জীবনের জন্য তাই প্রয়োজন সুন্দর পৃথিবী। সুন্দর ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন মানুষের চিরন্তন স্বপ্ন। ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সব মানুষের স্বপ্ন একটাই-সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পৃথিবী নামক গ্রহটি খুব কম সময়ই সুন্দর থাকতে পেরেছে। তাই প্রশ্ন জাগে, মহান স্রষ্টা কি পৃথিবীটাকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেননি, মানব-বান্ধব করে সৃষ্টি করেননি? দার্শনিকের বর্ণনায় এবং বিজ্ঞানীর বিশ্লেষণে তো পৃথিবী শুধু অনিন্দ্য সুন্দরই নয়, বসবাসের শ্রেষ্ঠ জায়গাও বটে। তারপরও আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীটা কাক্সিক্ষত রূপে নেই কেন?  সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, সমাজ ও পৃথিবীর রূপকার কারা? বর্তমান সভ্যতার শাসক-প্রশাসক কারা? তারা কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন? বর্তমান পৃথিবীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজি, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনা কেমন? মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ক্ষতির মাত্রা কেমন? পারমাণবিক শক্তিধর ও শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের দায় স্বীকার করে মানবিক বিশ্ব গড়ার রোডম্যাপে চলতে প্রস্তুত আছে কী? এইসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। ফলে কাক্সিক্ষত সুন্দর পৃথিবী থেকে বঞ্ছিত মানব জাতি। বর্তমান পৃথিবীতে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, জাতিসংঘ আছে, কিন্তু নেই কোনো বাতিঘর।
নানা কারণেই মানবজীবনে লক্ষ্য করা যায় বিপর্যয়। বিপর্যয়ের মূল কারণ মানুষের ভুল কর্মকাণ্ড। তাই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে প্রয়োজন হয় পর্যালোচনা, আত্মসমালোচনা এবং যথার্থ উদ্যোগ। মানব ইতিহাসে বিপর্যয়ের নানা ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। বিজ্ঞানে যেমন বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা আছে, তেমনি অভ্রান্ত ব্যাখ্যা আছে পবিত্র কুরআনে। এখন প্রয়োজন কর্তব্য নির্ধারণ। দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ অনেক সময় কর্তব্য নির্ধারণে সক্ষম হয় না। আবার কর্তব্য উপলব্ধি করলেও নানা দুর্বলতায় লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয় না। এ কারণেই হয়তো বিপর্যয় থেকে মানবজাতি মুক্তি পাচ্ছে না।
করোনা বিপর্যয়ে মানব জাতি এখন দুঃখ ভারাক্রান্ত। এই ভাইরাসে প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল চীন। এ কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল দেশটি। এ মহামারী নিয়ন্ত্রণে এনে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে চীন। তবে ধীরে ধীরে, সতর্কতার  সাথে। এএফপি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে করোনা ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয়। বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয়া এই ভাইরাসে চীনে মারা গেছে তিন হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ। আর আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটিতে সব কার্যক্রম কয়েক সপ্তাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। লকডাউন করে দেয়া হয়েছিল বড় বড় শহর। এসব নজিরবিহীন পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে করোনা ভাইরাসের অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এরই প্রেক্ষিতে আবার খুলতে শুরু করেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রাস্তাঘাটে ধীরে ধীরে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। পার্ক-চত্বরে আসতে শুরু করেছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তবে জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া এখনো অনেক দূরের পথ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে অনেক খাবারের দোকানে মুখোমুখি বসে খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা বিশে^র সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে মেনে চলা বেশ কঠিন।
শৃঙ্খলা মেনে চীনের জনগণ সতর্কতার সাথে যেভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে ধীরে ধীরে, তা বিশ্ববাসীর জন্য ভালো উদাহরণ হতে পারে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমে আসায় চীনারা আবার পার্কে আসতে শুরু করেছেন, কেউ কেউ নাচেরও চর্চা করছেন। তবে তিন মিটারের দূরত্ব রেখে এখন তাদের নাচতে হচ্ছে, করোনার একটা ভয়তো আছেই। নাচ সম্পর্কে সবার ধারণা এক রকম নয়। অনেকেই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এর কারণও আছে। কারণ বর্তমান সভ্যতায় অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো উদ্দাম নৃত্য। অবশ্য সব নৃত্য এক রকম নয়, এখানেও তারতম্য আছে। বিশ্ববাসী তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে কোনদিকে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে নৃত্যের চাইতে চীনাদের কাছে এখন গুরুতর বিষয় হলো, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। করোনা ভাইরাসের আঁচড় অনেক গভীরে। বেকারত্ব ও দেউলিয়া সমস্যা মোকাবিলা একটি দীর্ঘস্থায়ী বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই সমস্যা শুধু চীনের নয়, পুরো বিশ্ববাসীর। তাই জীবন যাপনে অযাচার ও অনাচার মুক্ত হয়ে সময়কে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সবার জন্য নতুন এক সভ্যতা বিনির্মাণের অভিযাত্রী হতে হবে এখন মানব জাতিকে।
আস্থার সংকটে ভুগছে বর্তমান সভ্যতা। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। কূটনীতির শোভন ভাষায় বিশ্বনেতারা কথা বলছেন, উষ্ণ করমর্দন করছেন, উচ্চকণ্ঠে বন্ধুত্বের ঘোষণা দিচ্ছেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওইসব উচ্চারণের সাথে তাদের কাজের তেমন মিল নেই। তাইতো করোনাভাইরাসের এই দুঃসময়েও উচ্চারিত হচ্ছে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’। এ নিয়ে বিবিসি বাংলা প্রকাশ করেছে একটি প্রতিবেদন।
কে ছড়ালো করোনাভাইরাস-যুক্তরাষ্ট্র, চীন না বৃটেন? আসলেই কি এটি জীবজন্তুর দেহ থেকে মানুষের দেহে ঢুকেছে, নাকি জীবাণু-অস্ত্রের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে? সংক্রমণ যত ছড়িয়ে পড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব। শুধু যে সোশ্যাল মিডিয়াই এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সয়লাব তা নয়, কিছু দেশের মূল ধারার মিডিয়াও এসব তত্ত্ব প্রচার করছে। ষড়যন্ত্রের এসব তত্ত্বগুলো আসছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইরান থেকে। এসব দেশের সরকারগুলো সরাসরি এসবের পেছনে না থাকলেও, সরকারের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তির কথায় এবং মিডিয়ায় তত্ত্বগুলো স্থান পাচ্ছে। চীন এবং ইরানের পক্ষ থেকে সন্দেহের তীর যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। চীনের ভেতর সোশ্যাল মিডিয়ায় হরদম বলা হচ্ছে, চীনকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসেবে চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, একজন চীনা কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। এছাড়া চীনের ভেতর থেকে একাধিক বিজ্ঞানী বলেই চলেছেন, করোনাভাইরাসের মহামারী চীনে শুরু হলেও, এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে হয়নি। চীনের পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, এই জীবাণু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভুল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল হুসেইন সালামি সরাসরি বলেছেন, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনে এবং পরে ইরানের বিরুদ্ধে ‘জীবাণু অস্ত্রের সন্ত্রাসী হামলা’ চালিয়েছে। এদিকে রাশিয়ার ভেতর থেকেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং সরকারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন মিডিয়ায় চীন এবং ইরানের ওইসব অভিযোগ তত্ত্ব জোরেসোরে প্রচার করা হচ্ছে।
এদিকে আমেরিকার ভেতরেও করোনাভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বয়ং ঘুরেফিরে বলেই চলেছেন, করোনাভাইরাস চীনের কাজ, তারাই দায়ী। ট্রাম্পের সমর্থক অনেকেই বলছেন, করোনা চীনের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র। রিপাবলিকান রাজনীতিক জোয়ান রাইট টুইট করেছেন, ‘উহান ল্যাবরেটরিতে এই করোনাভাইরাস তৈরি করা হয়েছে এবং ঐ গবেষণায় চীনাদের সহায়তা করেছে বিল গেটস।’ সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি অবশ্য ঐ টুইট পরে ডিলিট করে দেন। তবে আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে করোনাভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কোনো শেষ নেই। এমন অবস্থা বিশে^র বিবেকবান মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। করোনা বিপর্যয়ের এই সংকটকালেও সভ্যতার শাসকরা আস্থার সংকটে ভুগছেন! বিগত দিনের অনৈতিক ও কুৎসিত রাজনীতির চর্চাকারীরা পৃথিবীকে কোনো আলো দেখাতে পারেননি, এখন তারা আলো দেখাবেন কেমন করে? এমন অন্ধকারে উদ্বিগ্ন একদল বিজ্ঞানী মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘জীবজন্তুর শরীর থেকেই এই করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধুই ভয়, গুজব এবং ঘৃণা ছড়াবে, যাতে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত হবে।’ এখানে বার্তা খুবই স্পষ্ট। কিন্তু সভ্যতার শাসকরা তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন কী? মহান প্রভুর কাছে আমাদের প্রার্থনা, সভ্যতার শাসকরা যেন নৈতিক ও মানবিকবোধে উজ্জীবিত হয়। এই বোধের অভাবেই তো বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমাদের প্রিয় এই পৃথিবী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ