বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

বাংলা সাহিত্যে মুসলমান নারী

উম্মে আইরিন : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
আসমা অব্বাসী
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নীরব সাধক আসমা অব্বাসী। সাহিত্য সাধনার অনুকুল পরিবেশে তাঁর জন্ম। সিলেটের প্রথম মহিলা কবি সৈয়দা হাবিবুন্নেসা ও বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা অলীর ভাগ্নী আসমা অব্বাসী। বাংলা গানের নন্দিত সেবক ও সুলেখক মোস্তফা জামান আব্বাসীর তিনি সহধর্মিনী। আসমা অতি শৈশবে লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম রম্য গল্প ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে। আসমা অব্বাসীর ভাষায় “সেই যে আমি ইত্তেফাকে লিখলাম, তারই প্রেরণায় সংবাদের খেলাঘর, আজাদের মুকুলের মাহফিল, মিলাতের ছোটদের আসর, করাচি থেকে প্রকাশিত দিগন্তের ছুটির ঘন্টা, ফওজিয়া সামাদের মিনার আরো অনেক কিশোর বিভাগে প্রতি সপ্তাহে লিখেছি। এ যেন ম্যারাথন রেস, থামার প্রশ্ন নেই।..তার পর শুধু লিখে যাওয়া। সে লেখা থেমে যায়নি, আজো। এ ভাবে আমৃত্যু লিখে যেতে চাই।”
আসমা আব্বাসীর লেখা কবিতায় রয়েছে নৈতিকতার নান্দনিক পরশ। যেমন তিনি তাঁর ‘মা’ কবিতায় লিখেছেন :
‘মা যেন এক আশ্চার্য মরূদ্যান
 যার শ্যামল ছায় বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে
 করে রাখে সজীব সতেজ হাস্য।
 মা যেন এক বহমান নদী
 যার পানিতে জীবন আসে যোজন ব্যাপী শস্যক্ষেত্র।...’
বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যকে বিভাগোত্তর কাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত যে সমস্ত মুসলিম নারী উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেনÑতারা হলেন :
দৌলতুন্নেছা বেগম : ‘বধূর লাগিয়া’ (১৯৬২) নগর জীবনের পটভূমিকায় রচিত উপন্যাস। ‘ইস্পাত প্রত্যয়’ (১৯৭৯)।
রাজিয়া খান : ‘বটতলার উপন্যাস’ (১৯৫৮), ‘অনুকল্প’ (১৯৫৯), ‘প্রতিচিত্র’ (১৯৭৬), ‘হে মহাজীবন’( ১৯৮৩), ‘দ্রৌপদী’ (১৯৮৯) নগর জীবনের পটভূমিকায় রচিত উপন্যাস।
রাজিয়া মজিদ : ‘তমসা বলয়’(১৯৬৬), ‘দিনান্তের স্বপ্ন’ (১৯৬৭), ‘নক্ষত্রের পতন’(১৯৮২), ‘অশঙ্কিনী সুদর্শনা’ (১৯৮৪), ‘দিনের আলো রাতের আঁধার’(১৯৮৪), ‘মেঘ জল তরঙ্গ’ (১৯৮৫), ‘দাঁড়িয়ে আছি একা’ (১৯৮৭) নগর ও গ্রামের পটভূমিকায় রচিত। ‘সুন্দরতম’ (১৯৮৮), ‘জোৎস্নায় শূন্য মাঠ’ (১৯৮৯০)।
দিলারা হাশেম : ‘ঘর মন জানালা’ (১৯৬৫) নগর জীবনের পটভূমিকায় রচিত। ‘স্তব্ধতার কানে কানে’ (১৯৭৭), ‘একদা এবং অনন্তÍ’ (১৯৭৬), ‘আমলকির মৌ’ (১৯৭৮), মিউর‌্যাল।
বদরুন্নেসা আবদুলাহ : ‘প্রত্যাবর্তন’ (১৯৬০), ‘কাজল দিঘির উপকথা’ (১৯৬২), ‘নূপুর নিক্কন’ (১৯৬৯), ‘সমুদ্রের ঢেউ’ (১৯৭৩), ‘নিরুত্তর’ ( ১৯৭৪), ‘মাথুরের পরে’ (১৯৮৪)।
হাজেরা নজরুল : ‘উপক্রমণিকা’ (১৯৮৬), ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ (১৯৯০), ‘শরবিদ্ধ শিশির’ (১৯৯০), ‘নির্বাসিত নির্ঝর’ (১৯৯১), ‘বরফের মূল্য’ (১৯৯১)।
গল্পকারদের মধ্যে রয়েছেন : মাফরুহা চৌধুরী (১৯৩৪), লায়লা সামাদ (১৯২৮-৮৯), রাজিয়া মাহবুব (১৯২৮), রাজিয়া খান (১৯৩৫), জাহানারা হাকিম, মকবুলা মনজুর (১৯৩৮), খালেদা এদিব চেীধুরী (১৯৩৯), দিলারা জামান (১৯৪৩), নয়ন রহমান প্রমুখ। মুক্তি যুদ্ধ বিষয়ক গল্প রচনায় রিজিয়া রহমানের নাম বিশেষ ভাবে উলেখ যোগ্য।
আশির দশকের কয়েক জন মুসলিম মহিলা গল্পকার :
দিলারা মেসবাহ, (দিলারা মেসবাহ তাঁর লেখার জন্য ১৯১১ সালে কিশোর কন্ঠ সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন)। নাসরিন জাহান, নাসরিন সুলতানা, নাসরিন নঈম, মনিরা কয়েস, মুনিরা চৌধুরী, শামসুন নাহার জামান, বেগম রাজিয়া হোসাইন প্রমুখ।
ইসলামী সাহিত্য রচনায় মুসলিম নারী
ইসলামী সাহিত্য নামে সাহিত্যের বিভাজন ঈমানের দাবী। “আমার নামায, আমার ইবাদত বন্দেগী, আমার জীবন ও মরণ সবই নিবেদিত সেই আলাহর জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টি লোকের রবÑএই বিন্দুকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য রচিত হয় তা ই ইসলামী সাহিত্য। এ সাহিত্যই বয়ে আনতে পারে মানব জীবনে অফুরন্ত কল্যাণ। ইসলামী সাহিত্য সাহিত্য সাধনায় পুরুষ সমাজ এগিয়ে গেলেও মহিলা সমাজ অনেক পিছে। বাংলা সাহিত্যে শক্তিধর বেশ কিছু মহিলা কথা সাহিত্যিকের আবির্ভাব হলেও ইসলামী সাহিত্য রচনায় তাঁদের মতো শিল্প প্রতিভার পরিচয় প্রদানোর মতো প্রতিভা এখনো মেলেনি। কারণ প্রতিভা কোন প্রয়োজনের তাগিদে জন্মায় না। ‘অপূর্ব বন্তু নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞা’র আবির্ভাবে কোনো বৈজ্ঞানিক কার্যকারণের অমোঘ সূত্র নেই। এ কারণে এখনো কোন শ্রেষ্ঠ ইসলামী কথা সাহিত্যিকের দেখা মেলেনি।’ “প্রয়োজনের তাড়নায় গবেষণা কর্ম চলতে পারে, কিন্তু লেখকের স্বতোস্ফুর্ত সমীক্ষা শীক্ত না থাকলে গল্প উপন্যাস লেখা যায় না।” তাই ইসলামী প্রবন্ধ সাহিত্যের ময়দানে মুসলিম নারীদের যতটুকু স্বলজ্জ পদচারণা আছে কথা সাহিত্যে তা প্রায় অবর্তমান বলা চলে।
ইসলামের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাতন্ত্র্যধর্মী সাহিত্যিক সম্প্রদায় অনুবাদ, জীবনী গ্রন্থ, দর্শন, আলোচনা কোরআন- হাদীসের বঙ্গানুবাদ দান করতে সক্ষম হলেও কোন সাহিত্য দান করতে সক্ষম হননি। স্বাতন্ত্র্যধর্মী ধারার লেককদের সৃষ্ট সাহিত্যকে ‘ইসলামী সাহিত্য’ নামে অভিহিত করা হলেও সাহিত্যের গৌরব কিছু মাত্র বৃদ্ধি পায় না। একই কথা বর্তমান মুসলিম নারী সমাজের যারা ইসলামী সাহিত্যের ক্ষেত্রে সামান্য পদচারণা করছেন তাদের ব্যাপারেও সত্য। তবুও তাদেও অবদান খাট করে দেখার সুযোগ নেঈ। ইসলামী সাহিত্য সাধনায় যে সব মুসলমান নারী কিছু অবদান রখেছেন তাঁদের আলোচনায় শুরুতেই স্মরণ করতে হয় সারা তৈফুরকে। সারা তৈফুরের ‘স্বর্গের জ্যোতি’ সীরাৎ গ্রন্থ। তাঁর পরে কেউ কেউ বিচ্ছিন্ন ভাবে ইসলামী ঐতিহ্য চেতনা নির্ভর কিছু লেখা জাতিকে উপহার দিয়েছেন। যেমন বেগম রোকেয়া ‘হজ্বের ময়দানে’, ‘ঈদ-সম্মিলন’, ‘মহরম, ‘বোরকা’ কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
বেগম সুফিয়া কামাল রচনা করেছেন ‘আমি গাহি তাঁর গান’ আলামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা ৯৪, ‘স্মরণে’ অধিকার’ ইকবালের ১১০তম জন্ম বার্ষিকী নভেম্বর ’৮৭ প্রকাশিত সংকলন। এ ছাড়াও আরো অনেকে দু একটি ইসলামী ঐতিহ্য নির্ভর লেখা লিখেছেন, তবে সারা তৈফুরের ‘স্বর্গের জ্যোতি’ ব্যতিত অন্য লেখাগুলোকে সম্পূর্ণ ইসলামী সাহিত্যের মজলিশে স্থান দেয়া চলেনা।
বাংলা সাহিত্যে ইসলামী সাহিত্য রচনাকাল অতি সংক্ষিপ্ত। নারী জগতে ইসলামী আন্দোলন শুরুর পর থেকেই ইসলামী সাহিত্য রচনার যাত্রা শুরু। যে কারণে সাহিত্যের বিস্তৃত জগতে এখনও মহিলা লেখিকাদের দীপ্ত পদচারণা লক্ষ্য করা যায় না। তবুও যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা আশা ব্যঞ্জক। ইসলামী সাহিত্য রচনার তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে যারা এগিয়ে এসেছেন তাঁদের কয়েক জন :
খাদিজা আখতার রেজাই
ইসলামী সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র খাদিজা আখতার রেজাই। তিনি ছিলেন ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর প্রথম মহিলা সম্পাদিকা। আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি খুলনার ‘দৈনিক জনবার্তা’ র সাহিত্য ও মহিলা সম্পাদিকা হিসাবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার লিখিত গ্রন্থের মধ্যে ‘মুসলিম নারীর দায়িত্বও কর্তব্য’, ‘নির্বাচিতার কলাম’, ‘বুবু’, ‘নূরী’, ‘নারী এলিজাবেথের দেশে’, ‘তিন তলার শিড়ি’ উল্লেখযোগ্য। দেশের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকাসমূহে গত দুই দশক ধরে তার শত শত গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কর্মের মধ্যে রয়েছে বর্তমান কালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম নাট্যকার তওফীকুল হাকীম মিশরীর ঐতিহাসিক প্রমাণ্য নাটক ‘মোহাম্মদ সালালাহু অলাইহে ওয়া সালাম’ এবং আলামা ছফিউর রহমান মোবারক পুরীর ‘আর রাহীকুল মাখতূম’ গ্রন্থ দ্বয়ের বঙ্গানুবাদ। ‘আর রাহীকুল মাখতূম’ গ্রন্থের অনুবাদ সম্পর্কে লেখক ও কবি আল মাহমুদ অনুবাদ গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের একটি নতুন নির্মাণ বলে অবিহিত করেন। সৈয়দ আলী অহসান তার লিখিত প্রবন্ধে বলেন, খাদিজার অনুবাদে মাতৃভাষার দীপ্ত অহংকার ও অংগীকার দুটোই রয়েছে, খাদিজা অসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে এবং অনুপম বাক্য বিন্যসে গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ করেছেন; তার অনুবাদটি যেন অনুবাদ নয়-এ এক নতুন সৃষ্টি।
 ১৯৭৯ সাল থেকে খাদিজা আখতার রেজাই লণ্ডনে আছেন এবং সেখানে বসেই তিনি তার সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শামসুন্নাহার নিজামী (জন্ম ১১-১১-১৯৫১)
বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য চর্চায় যে কয়েকজন নারী বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের অন্যতম মোহতারামা শামসুন্নাহার নিজামী। শামসুন্নাহার নিজামী ঝিনাইদহ জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম -জনাব আফজাল হোসেন, মাতার নাম-মোহতারামা মরিয়ম নেসা। তিনি ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি জনাব মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
সুসাহিত্যিক বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুসলিম বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের বিশিষ্ট সিপাহসালার জনাব মতিউর রহমান নিজামীর সংস্পর্শে এসে শামসুন্নাহার নিজামী ইসলামী সাহিত্য রচনার বিশেষ অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তাঁর বেশীর ভাগ লেখা ৭০-৮০ দশকে প্রকাশিত হয়। ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি মাসিক বেগম, মাসিক মদিনা, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ও দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তার উলেখযোগ্য গ্রন্থ হল ‘আদর্শ সমাজ গঠনে নারী’, ‘নারী মুক্তি আন্দোলন’, নারী নির্যাতনের কারণ ও প্রতিকার’, ‘পর্দা একটি বাস্তব প্রয়োজন’, ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠায় মহিলাদের দায়িত্ব ইত্যাদি।
তিনি ইসলামী আন্দোলন ও সাহিত্য রচনার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজিক কাজেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সামসুন্নাহার নিজামী ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ‘মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজে যোগ্যতার সাথে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
হাফেজা আসমা খাতুন
বাংলা দেশের ইসলামী আন্দোলনে হাফেজা আসমা খাতুন একটি অতি সুপরিচিত নাম। নারীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সময়ের দাবী অনুযায়ী প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে চলছেন। তাঁর লিখিত প্রবন্ধ ‘আপনার শিশুকে কি শিক্ষা দেবেন’ মাসিক পৃথিবী : ফেব্রুয়ারী ১৯৯২, ‘নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত মহানবী (স:)’ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা : ১৯৮৪, ‘বর্তমান সমাজের অবক্ষয় প্রতিরোধে মাহে রমযানের গুরুত্ব’-আল মুনীর সিয়াম স্বারক গ্রন্থ-১৯৯৯, ‘রমজান ও ব্যক্তি চরিত্র সংস্কার’ ‘সিয়াম’ বিশেষ সংখ্যা ১৯৯১ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও তাঁর প্রচুর লেখা বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছে।
ফজিলা তাহের
ফজিলা তাহের ইসলামী আন্দোলনের ময়দানে এক অতি সুপরিচিত নাম। ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তিনি দেশের বিভিন্ন নাম করা পত্রিকাতে লিখে চলেছেন বিরামহীন ভাবে বহুত দিন ধরে। প্রাবন্ধিক হিসাবে তিনি ইসলামী মহলে যথেষ্ঠ সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর প্রবন্ধাবলী মাসিক পৃখিবীতে প্রকাশিত : ‘আলাহর আইন ও শরিয়তে মেয়েদের অধিকার-মর্যাদা’ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, ‘আমল নামার হাকিকত’ ডিসেম্বর ১৯৯৪, ‘মেয়েদের ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা’ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬, ‘কুরআন থেকে হেদায়াত লাভের উপায়’ ফেব্রুয়ারী১৯৮৬, ‘সংযত জবান : মুমিনের বৈশিষ্ট্য’ জানুয়ারী ১৯৮৭, ‘মহিলাদের ইসলামী পুনর্জাগরণে সাইয়েদ আবুল আলার অবদান’ নবেম্বর ১৯৮৯, ‘ইসলামে মেয়েদের অধিকার ও কর্মসংস্থা প্রসঙ্গ’ মে ১৯৯১, ‘প্রসঙ্গ শাফায়াত’ ডিসেম্বর ১৯৯০, ‘কন্যা সন্তান : আমাদের মানসিকতা এবং ইসলাম’ এপ্রিল ১৯৯৩, ‘ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় মেয়েদের অধিকার’ ইত্যাদি।
ফজিলা তাহের ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তাঁর সাহিত্য রচনা ইসলামী আন্দোলনের অনুসঙ্গ মাত্র।
সাবিনা মলিক
সাবিনা মলিক ইসলামী সাহিত্যের গল্প শাখায় এক নতুন ফোটা ফুল। বাংলায় ইসলামী সাহিত্যের সংগ্রামী পুরুষ মতিউর রহমান মলিকের সহধর্মীনি সাবিনা মলিক। তিনি নানা বিষয় নিয়ে সুস্থ জীবন বোধের নির্মল চাষ করেছেন তাঁর গল্পে। এতদিনে তিনি প্রচুর গল্প লিখেছেন।
 সাবিনার শিশু গল্প : ‘তালে তালে তাল’ জানুয়ারী ২০০৩, ‘ভেজা সময়’ নভেম্বর ২০০৪, ‘ভেতর বাড়ি বা’র বাড়ি’ সেপ্টেম্বর ২০০৬, ‘শুধু স্বপ্ন নয়’ জানুয়ারী ১৯৯৭, ‘রেহানার বিয়ে’ ইত্যাদি। সাবিনার গল্প শুধু মাত্র গল্প নয়, গল্পের ভিতর দিয়ে তিনি সমাজ সংস্কার ও নীতি নৈতিকতার শিক্ষা প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি কবিতা লিখেছেন অনেক। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে। যেমন :
‘আমি তাঁকিয়েই রইলাম টুপটুপ করে ঝরে পড়বার মুহুর্ত পর্যন্ত
আর তাকিয়ে রইলাম অশ্রুকণা আমার মুখে নেমে আসা পর্যন্ত
আর আমি তাকিয়েই রইলাম
চাঁদটির কান্নার গ্রোতে আমার চোখ,
আমার গাল আর আমার চিবুক ভেসে যাওয়া মুহুর্ত পর্যন্ত।’
       (একাকী চাঁদটা কাঁদছিল)
মাসুদা সুলতানা রুমী
মাসুদা সুলতানা রুমী ইসলামী সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল জ্যেতিষ্ক। মাসুদা সুলতানা জাতীয় আদর্শ এবং ঐতিহ্য সচেতন এক নির্ভীক কলম সৈনিক। ইসলামী সাহিত্য রচনার জগতে তিনিই একমাত্র নারী যার গল্প, কবিতা, শিশু সাহিত্য ও প্রবন্ধের সব ক্ষেত্রে রয়েছ সাহসী বিচরণ। তাঁর কবিতা জীবনের এক নতুন ইঙ্গিত নিয়ে এসেছে। কবি মাসুদা সুলতানা রুমী ১৯৬০ সালের ৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জ জিলার নওহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো: ফখরুল ইসলাম মোলা এবং মাতার নাম বেগম মমতাজ ইসলাম। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বি.এ। তাঁর স্বামী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ।
রুমী স্কুল জীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। মাসিক সংস্কার পত্রিকায় প্রথম তাঁর ‘উম্মে আয়মান’ নামে একটিন প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই তার কাব্য জগতে প্রবেশ। রুমির কবিতায় গোটা বিশ্বের মুসলমানদের কথা এসেছে। মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন কবি রুমি উচ্চারণ করেছেন-
স্পেনকে মুসলিম শূন্য করার নীল নকশা
বাস্তবায়িত করল ফার্ডিন্যান্ড আর ইসাবেলা
আশ্রয়ের নামে মসজিদে ঢুকিয়ে
আগুনে পুড়িয়ে জাহাজে চড়িয়ে সমুদ্রে ডুবিয়ে..
কবি মুসলমানদের আহবান জানিয়েছেন জেগে ওঠার জন্য ঐক্য বদ্ধ হওয়ার জন্য :
এসো জ্বলে উঠি আরেকবার
স্পেন বিজয়ী তারেক মুসার মত
জেরুসালেম বিজয়ী সালাউদ্দীনের মত
ছিনিয়ে নিতে পুন: স্পেন জেরুসালেম
আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মীর, চেচনিয়া...
কবি মাসুদা সুলতানা কবিতার পাশাপাশি শিশুদের জন্য গল্প লিখে চলেছেন বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। তবে তাঁর সবচাইতে বড় অবদান ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে পুস্তক রচনার ক্ষেত্রে। তাঁর লিখিত এসব ইসলামী সাহিত্য পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। মাসুদা সুলতানা রুমীন প্রকাশিত কয়েক খানা বই : ‘যুগে যুগে দাওয়াতী দ্বীনের কাজে মহিলাদের অবদান’, ‘মহিমান্বিত তিনটি রাত’, ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঈমান’, ‘স্মৃতির এ্যালবামে তুলে রাখা কয়েকটি দিন’, ‘নামাজ বেহেশতের চাবী’, ‘ভালবাসা পেতে হলে’, ‘তাকওয়াই হোক মো’মিন জীবনের লক্ষ্য ইতাদি। মাসুদা বিরচিত এ সব বই শুধু মাত্র নারী চিত্তেই ঝড় তুলেনি, পুরুষদেরকেও যথেষ্ট আগ্রহশীল করে তুলেছে তার বই অধ্যয়নে।
বেগম ফজিলাতুল কদর
বেগম ফজিলাতুল কদর ইসলামী রসে চিত্ত সিক্ত করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করে আসছেন। মাসিক মদিনা পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি মুসলমানদেরকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কবিতার শিরোনামই বলে দিচ্ছে মুসলমানদের দায়িত্ব কি। তাঁর কিছু কবিতার শিরোনাম : ‘সঞ্চয়ে রইবে বিত্ত’, ‘মুহাম্মাদ সালালাহু আলাইহে ওয়া সালাম’, ‘তবুও তো মানুষের’, ‘অসার পার্থিব প্রেম’, ‘আলাহর সৃষ্ট নারী’, ‘বলো ভালবাসি’, ‘তোমার মেঘের রাজ্যে’, ‘জাগো নাম এক’, ‘দেশ প্রেম ঈমানের অংশ’, ‘যিয়ারতের অক্ষয় স্মৃতি’ ইত্যাদি। ‘তবুও তো মানুষের’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :
‘এখনও মানুষেরা
আকাশের দিকে না তাঁকিয়ে
ইবলিছি বুদ্ধি নিয়ে
অন্ধকার পথে চলে দলে বলে।’
ইসলামী সাহিত্য রচনার জগতে ফজিলাতুল কদরের মাঝে সম্ভাবনার ইঙ্গিত লক্ষ করা যায়।
শাহিন আক্তার আঁখি
ইসলামী সংস্কৃতির ধারা অক্ষুন্ন রেখে যারা গল্প লিখে চলছেন তাদের মধ্যে শাহিন আক্তার আঁখি অন্যতম। তাঁর জন্ম ও বড় হওয়া কুমিলা শহরের ধর্ম সাগরের পশ্চিম পাড়ে। স্কুল জীবনে তিনি স্থানীয় কচি কাঁচার আসর চাঁদের হাটের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ লেখিকা সংসদের পরিচালনা পরিষদ সদস্য ও জাতীয় শিশু সংগঠন ফুলের মেলার কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সাহিত্য বিভাগীয় সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেশ গল্প লিখে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর লেখা গল্প ‘লাল শালু ২০১০’, ‘কুশল প্রসঙ্গে’ ইত্যাদি পড়লে বুঝতে পারা যায় যে, তিনি তাঁর গল্পে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ ছাড়াও গল্প লেখায় এগিয়ে আছেন আমিনা শামারুখ, ফারজানা মাহবুবা, হুমায়রা বিনতে আসাদ ও আরো অনেকে। কবিতা অঙ্গনে কবি লুবনা জাহান (১৯৪৫-৯৫), নাসরীন মুস্তফা, কামরুন নাহার রুনী যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছেন।
মোছাম্মাত কবিতা সুলতান
কবিতা সুলতানা বিশেষ ভাবে প্রবন্ধ কার। মাসিক মদীনা ও মুসীলম জাহান পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা মোছাম্মাত কবিতা সুলতানা। তিনি নারীদের বিভিন্ন দিক ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখে আসছেন। প্রবান্ধিক হিসাবে তিনি যথেষ্ঠ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ : ‘বিশ্ব নবী (দ:) বিশ্ব শান্তি’, ‘দরিদ্র বিমোচনে বিশ্ব নবী (সা:), ‘রসুলুলাহর (সা:) জিহাদের স্বরূপ’, ‘কুফরী সংবিধান’ ইত্যাদি। তার প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘ধন্য আমি নারী’, ‘মুরতাদের আর্তনাদ’।
নুরুন নাহার
ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মাসিক মদীনায় প্রবন্ধ লিখে যাচ্ছেন। তিনি সফল অনুবাদক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। ‘নারী জীবনের সেরা উপহার’ তাঁর বিশেষ অনুবাদ কর্ম।
এ ছাড়া ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে যারা লিখে চলছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন জাহানারা উম্মে শিফা, দিলরুবা আবেদীন প্রমুখ। এ ছাড়া আলামা ইকবালের জীবনের ওপর বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা করেছেন মিসেস উম্মে সালমা, কানিজ-বাতুল ও ইশরাত জাহান।
ইসলামী সাহিত্য রচনার সময় কাল মোটেই দীর্ঘ নয়, তা ছাড়া বাংলা দেশে ইসলামী সাহিত্য রচনাকালের বিশৃঙ্খল, তরণ ও অশান্ত আবহাওয়ায় নতুন সাহিত্য রচনা কদাচিত সম্ভব হয়। তুবুও আশা করা যায় ইসলামী সাহিত্য রচনায় নতুন নতুন প্রতিভার উন্মেষ মুসলিম নারী সমাজে আল্লাহর রহমতে শীগ্রই ঘটবে। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ