শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

নারী দিবসের ভাবনা

নাঈমা সুলতানা : আন্তর্জাতিক নারী দিবস (পূর্ব নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস) প্রতি বছর ৮ মার্চ তারিখে দিবসটি পালিত হয়। সারা বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ হিসেবে এই দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে নারীদিবস উদযাপনের লক্ষ্য নানা প্রকার হয়ে থাকে। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও নারীদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি গুরুত্ব পায়।
এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে মার্কিন সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ এ স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি, নারীর সমঅধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে।
এ বছরের নারী দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য হলো
“I am Generation Equality: Realizing Women’s Rights”
যা বাংলায় দাঁড়ায়, “আমি প্রজন্মের সাম্যতা : মহিলাদের অধিকার আদায় করছি।”
বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব জুড়ে নারী সমাজ অজস্র সহস্র সমস্যার সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। এই সমস্যাগুলো কালের আবর্তনে আমাদের সমাজ সামাজিকতার নামে নারীদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছে।
আজো বাংলাদেশে এমনও জায়গা আছে যেখানে নারীদের নূন্যতম সম্মানটুকু দেয়া হয় না। আনন্দের কথা হলো, এই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, শুধু তাই নয় বিরোধী দলের প্রধানও একজন নারী, এটা আজকের কথা নয়, ১৯৯১ সাল থেকে। নারীর সম অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও কাজ করে যাচ্ছে। সরকার প্রতিনিয়ত নানান ধরনের পরিকল্পনা, প্রকল্প, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। নারীদের জন্য রয়েছে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
এতকিছুর পরেও নারী কি আসলেই তার অধিকার ফিরে পেয়েছে? আমি মনে করি “না”। এদেশে এখনও ছোট্ট ছোট্ট শিশু, কিশোরী, যুবতী, এমনকি বৃদ্ধা ধর্ষিতা হয়, এসিড নিক্ষেপ করে ঝলসে দেয়া হয় তার চেহারা ও শরীর, খুন করা হয়। নারী নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে না, সে স্কুলে যেতে পারে না, কাজে যেতে পারে না, সারাক্ষণ এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় তাকে।
আমাদের সমাজ সমঅধিকারের কথা বলে, কিন্তু নারীদেরকে সম-অধিকার আসলে দেয়া হয়না। সমাজ বলে, “যে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা”।
যে সমাজের প্রত্যেকটা মানুষ কোনো না কোনো নারীর পেটেই বেড়ে উঠেছে আর জন্ম গ্রহণ করেছে, সেই নারীকেই তারা অগ্রাহ্য করে থাকে।
নারীর সাথে মানুষের সম্পর্ক নানান ধরনের হয়ে থাকে, যেমন মা, বোন, ভাবি, স্ত্রী, কন্যা, দাদী, নানী, মামী, চাচি, খালা, ফুফু আরো হয়তো আছে অনেক। সম্পর্ক গুলোর নাম যখন আমরা নেই তখন কিন্তু দেখা যায় যে এদের সাথে আমাদের একটা গভীর ভালবাসার, মায়ার, মমতার, আদরের, স্নেহের সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু এই নারীরাই যখন তার অধিকার চায় তখন তাকে তার অধিকার দেয়ার বিপরিতে তাদের নির্যাতন ও অত্যাচার করা হয়, তাদের জীবনকে বিষিয়ে দেয়া হয়, এটা পরিবারের গল্প। সমাজ আরো ভয়ংকর, যে অধিকার চায়, তাকে খুব সহজে অধিকার আদায় করে নিতে দেয় না, তার জীবনের পথ কে কঠিন করে দেয়া হয়, তাকে লড়াই করতে বাধ্য করা হয়, অথচ যেটা অধিকার সেটা এমনিতেই পাওয়ার কথা।
সমাজের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নারীদেরকে মানুষ ভাবতে হবে, তাদের অধিকার আদায় করতে হবে। বিশ্ব এগিয়ে চলছে, যে সমাজে নারীরা পিছিয়ে সেই সমাজ এমনকি দেশ কোনভাবেই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না, তাকে পড়ে থাকতে হয় সবথেকে পেছনে, হয়তো গতি থাকে কিন্তু সে গতি মন্থর।
নারীদের অবাধ চলাচল নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে হবে, তার কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ করতে হবে, নারীরা যে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা লাভ করে সেই শিক্ষাঙ্গনকে নারীদের জন্য নিরাপদ করতে হবে, সমাজের সকল মঙ্গল কাজে নারীর অংশগ্রহণ নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ সেটা পরিত্যাগ করতে হবে। নারীকে সম্মান করতে। আর যাতে কোনদিন নারী আতঙ্কের মধ্যে না থাকে, চলতে গিয়ে বলতে গিয়ে নারী যাতে আর কখনো ভয় না পায় সেই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এই সমাজেরই, সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের।
আমরা সমতা চাই, নারী পুরুষের সমতা, কর্মের সমতা, অধিকারের সমতা, সম্মানের সমতা। আমরা চাই সমাজের প্রত্যেকটা মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে নারীর অধিকারের বিষয়ে সচেতন হবে, নারীর অধিকার আদায়ের জন্য সচেষ্ট হবে, নারীকে সম্মান করবে। তবেই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সুখী ও সমৃদ্ধশালী হবে। এই হোক আমাদের নারী দিবসের সিদ্ধান্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ