রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কয়রায় লবণাক্ত জমিতে বিনা চাষে আলু উৎপাদন ॥ বাম্পার ফলন

খুলনা অফিস : জমি চাষ না করেই আলু লাগানোয় কৃষক তৃঞ্চা ঢালীকে অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। বাড়ির পাশের অনিতা মণ্ডল বলেই দিয়েছিলেন, ‘কষ্ট করে লাভ নেই। বিনা চাষে আলু হয় না। কথায় আছে, ষোল চাষে আলু।’ কিন্তু মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে সেই উপহাসকারী প্রতিবেশী থেকে শুরু করে এলাকার মানুষ অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে তৃষ্ণা ঢালীর বিনা চাষের আলুর ক্ষেতের দিকে। গত ১৩ মার্চ আলুর মাঠ দিবস পালন অনুষ্ঠানে বিনা চাষে আলু উৎপাদন করে সকলকে দেখিয়ে দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন কয়রার কৃষক তৃষ্ণা ঢালী। খুলনা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলা সদর। সেখান থেকে আরো চার কিলোমিটার গেলে ৩নং কয়রা গ্রাম। ওই গ্রামের কৃষক তৃষ্ণা ঢালীর বসতবাড়ি লাগোয়া ১২ বিঘা জমির প্রায় পুরোটাই অনাবাদি। শুধু মাঝখানের ১০ শতক জমিতে সারি সারি সবুজ আভা ছড়িয়ে আছে গোল আলুর গাছ। বিনা চাষে রোপণ করা ওই গোলআলুর সবুজ গাছের সঙ্গে এলাকার কৃষকের বিস্ময় আর আগামীর স্বপ্নও যেন ফুটে উঠেছে। 

সরেজমিন ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লোনায় আক্রান্ত কয়রা উপজেলায় মাত্র একটি ফসল হয়। সেটা বর্ষা মওসুমে আমন ধান। অনেকে অবশ্য নোনা পানিতে চিংড়ি চাষ করে। যারা চিংড়ি করে না, তাদের জমি বাকি সময় অনাবাদি থাকে। সেই অনাবাদি জমিতে এবারই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ‘বিনা চাষে’ আলু রোপণ করেন তৃঞ্চা ঢালী। লবণাক্ততা সহিষ্ণু আলুর নতুন জাতের বীজ থেকে শুরু করে সার্বিক সহযোগিতা করেছে সরেজমিন কৃষি গবেষণা বিভাগ, দৌলতপুর, খুলনা। ওই বিভাগের বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসানই বিনা চাষে আলু রোপণ করতে উদ্বুদ্ধ করেন তৃঞ্চা ঢালীকে। প্রথমে রাজি না হলেও পরে তিনি ঝুঁকি নেন। ১০ শতক জমিতে রোপণ করেন ৮০ কেজি আলুর বীজ। প্রথম দিকে অনিশ্চয়তা থাকলেও মাত্র দেড় মাস পর মুখে হাসি ফুটতে শুরু করে তাঁর। ‘ধান কাটার পর জমি তখনো পুরোপুরি শুকায়নি, জমিতে কাদা ছিল। সেই কাদামাটির ওপর দড়ি টানিয়ে সারি সোজা করে বীজ আলু বসিয়ে দিয়েছিলাম। এক সারি আলু থেকে আরেক সারির দূরত্ব ৬০ সেন্টিমিটার। প্রতি সারির একটি বীজ থেকে আরেকটির দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার। আলুর ওপর গোবর ছড়িয়ে তার ওপর খড়কুটা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম। এতেই সোনা ফোলেছে আলুর খেতে।’ তবে বিনা চাষে আলুর ফলন ভালো হয়কিনা এই দ্বিধা থেকে কিছু জমিতে চাষ করে আলু লাগিয়েছেন তিনি। 

হাতের ইশারায় সেই খেত দেখিয়ে বললেন, ‘ওই খেতে তার ১৬ বার মাটিরচাষ দেয়া লেগেছে, মাটি একেবারেই ধুলার আকার নিলে সেখানে রোপন করেছেন বীজ আলু। আর সেচ, সার, কিটনাসক মিলিয়ে অনেক খরচ হয়ে গেছে। তাছাড়া আলু গাছের গোড়া বাধানো আর লেবার খরচও অনেক। সেই তুলনায় বিনা চাষে একেবারে মাগনায় ফলন পেয়েছেন এই আলুর খেতে।’ কৃষক তৃঞ্চা ঢালীর দেখাদেখি কয়রার আরও অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন চাষহীন পদ্ধতিতে আলু রোপণে। 

কৃষক কৃষ্ণা রানী ঢালী ‘বিনা চাষের’ আলুর ক্ষেতের মাটি খুঁড়ে গাছ তুলে দুই হাত ভরে আলু দেখিয়ে বলেন, ‘আলুর আকারও বেশ বড়। কয়েক দিন পর বাজারে বিক্রি করা যাবে। 

কৃষি গবেষণা কয়রার বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে আমন ধান কাটার পর মাটি শুকাতে অনেক বেশি সময় লেগে যায় যে করনে আলু চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ধান কাটার পর জমি ফাঁকা হবার সঙ্গে সঙ্গেই বিনা চাষে আলু আবাদের সুযোগ ঘটে। এই পদ্ধতিতে আলুর আবাদ করলে আলু বেশি সুস্বাদু হয় এবং এর আকারও অনেক বড় হয়। 

সরেজমিন কৃষি গবেষণা বিভাগ খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. হারুনর রশীদ বলেন, কয়রায় অনেক জমি আমন ধান কাটার পর পড়ে থাকে। ওই পতিত জমিতে যদি এলাকার কৃষকরা বিনা চাষে আলু উৎপাদন কৌশল দেখে ও শিখে নিয়ে চর্চা করেন তবে তাঁরাও লাভবান হবেন। আর এভাবেই পরিবার ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় তাঁরাও অবদান রাখতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি আরও বলেন, কয়রায় প্রথমবারের মতো বিনা চাষে আলু আবাদ করে সফলতা এসেছে। ধীরে ধীরে চাষাবাদ বাড়াতে পারলে স্থানীয় কৃষিতে বৈপ্লাবিক পরিবর্তন আসবে। এটি যেমন কৃষকের জন্য অনেক সাশ্রয়ী হবে, তেমনি অনেক পতিত জমিও চাষের আওতায় আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ