বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গণতন্ত্রের সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। গণতন্ত্রের মোড়কে অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বহুমাত্রিক রূপ বিশ্বব্যাপী বিরাজ করছে। এর থেকে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ তাও কিন্তু নয়! গণতন্ত্রের সূচক ও আইনের শাসনের সূচক দু’টিতেই বাংলাদেশ পিছিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের প্রতিবেদন ২০২০ অনুযায়ী গত এক বছরে আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার যে চারটি মূলনীতি নির্ধারিত হয় সেগুলোর অন্যতম ছিল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র আকাশ থেকে যেমন আসে না, তেমনি বাইরে থেকেও আমদানি করা যায় না। এটি চর্চার বিষয়। চর্চা না করলে গণতন্ত্র কার্যকর হয় না এবং টিকে থাকে না। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি মেনে না চললে কিংবা জনগণের অধিকার হরণ করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন। গণতন্ত্রের জন্য এ অঞ্চলের মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা ভূ-ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নজির খুব বেশি নেই। কিন্তু সেই গণতন্ত্র আজ কোথায়? একটি দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটুকু বিরাজ করছে তা পরিমাপ করার জন্য ব্যারোমিটারের প্রয়োজন নেই। দেশটির বিরোধীদলের সভা-সমাবেশের অধিকারের চিত্রই বলে দেয় তারা কতটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারছে।
গণতন্ত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফ্রিডম হাউস সম্প্রতি তাদের ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২০ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে টানা ১৪ বছর ধরে বিশ্বে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কমছে। বিশ্বজুড়েই মার খাচ্ছে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ। তবে এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ পড়লে খুশি হতাম। কিন্তু বাংলাদেশের নামও বাদ যায়নি। এখানেও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০০ পয়েন্টের মধ্যে ২ পয়েন্ট কমে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯। অর্থাৎ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এখন ‘আংশিক মুক্ত’ দেশের কাতারে। আগের বছর ২০১৯ সালে স্কোর ছিল ৪১। ২০১৮ সালে এ স্কোর ছিল ৪৫ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৪৭। ওই তিন বছরও বাংলাদেশ ‘আংশিক মুক্ত’ দেশের কাতারে ছিল। ১৯৫টি দেশ ও ১৫টি অঞ্চলের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার চিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার স্কোর নির্ণয় করা হয়েছে। দেশ ও অঞ্চলগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগা করা হয়েছে- মুক্ত, আংশিক মুক্ত, মুক্ত নয়। এবারে প্রতিবেদনে ইন্টারনেট স্বাধীনতাও যোগ করা হয়েছে। ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়,একনায়কেরা গণতান্ত্রিক ভিন্নমত দমন করছেন এবং নিজেদের ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্বের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়,২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ৬৪টি দেশে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। মূল্যায়নের মোট স্কোর ১০০। এর মধ্যে রাজনৈতিক অধিকারে ৪০ এবং নাগরিক স্বাধীনতায় ৬০। বাংলাদেশের স্কোর ৪০ এর মধ্যে ১৫ এবং ৬০ এর মধ্যে ২৪। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট স্কোর ৩৯। তবে অনেক দেশে গণতন্ত্রের চর্চার নামে যা হচ্ছে তা গণতান্ত্রিক মনে হলেও আদৌ গণতান্ত্রিক কি না সে প্রশ্ন এখন প্রধান হয়ে উঠছে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের লক্ষণ সুস্পষ্ট, এমনকি স্বৈরাচারী শাসকরাও নিজেদেরকে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করছেন।
একটি স্বাধীন দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের গুরুত্বপূণ উপাদান হচ্ছে একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর সে নির্বাচনটি যখন একতরফা হয়ে যায় তখনই জনমনে বির্তকের জম্ম দেয়। বির্তকিত নির্বাচনের মাধ্যমে যখন একটি দল জয়ী হয় তখন কিন্তু দলটির ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে, এটা ক্ষমতাসীন দল অনুধাবন করতে পারে না। কারণ ক্ষমতার মোহে তাঁরা এতই অন্ধ হয়ে পড়ে যে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যটা করতে পারে না। এই সরকারের আমলে স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি, ব্যবসায়ীদের নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পর্যন্ত বির্তকিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সে গণতন্ত্র আজ নিষ্পেষিত। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের সামরিক শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে। ২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে। অথচ ক্ষমতায় এসে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করে দেয়। ১৯৯১ সালে প্রবর্তিত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন ব্যতীত কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হয়নি। যার জলন্ত প্রমাণ হচ্ছে আওয়ামী লীগের ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের হয়ে যাওয়া ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি আমলে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় পার্টির সময়কালে ১৯৮৬ সালের ৭ মে এবং ১৯৮৮ সালের ৩ মে এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থার নির্বাচন হওয়ার পেছনে বিরোধী জোটকে ক্ষমতাসীনরা দায়ী করে আসছির এতদিন। কিন্তু ২০১৮ সালে জাতি যে ভেলকিবাজির নির্বাচন দেখেছে তা মূলত সিলেকশন টাইপের নির্বাচন। গণতন্ত্রের নামে সিলেকশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর ১১ জানুয়ারি দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয় যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র পচে গেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ঘিরে নানা অনিয়ম, ব্যালট ছিনতাই এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের এজেন্ট ও ভোটারদের বের করে দেয়ার ঘটনা প্রতীয়মান হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সময় বিরোধী দলের প্রার্থীদের হুমকি, হয়রানি, আইনবহির্ভূত আটক এবং সহিংস হামলার ঘটনা ঘটার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিরোধী দলের প্রার্থীরা স্বাধীনভাবেও নিরাপদে প্রচার চালাতে পারেননি। আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য ভিসা এবং পর্যবেক্ষণের অনুমতিপত্র দেয়া হয়নি। ২২টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) মধ্যে মাত্র ৭টিকে স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসাবে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয় বিচারবর্হিভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন এবং আইনবর্হিভূত আটকের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এমনকি কারাবন্দী অবস্থায়ও অনেকে জীবনহানির আশংকার মধ্যে থাকছেন।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা নির্দয় হতে পারে তার বহু দৃষ্টান্ত গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে ভেলকিবাজির ভোট অনুষ্ঠিত হলে সেখানকার ক্ষমতাসীন শাসকরা কতটা দানবীয় হয়ে উঠতে পারে তার বড় উদাহরণ তো জার্মানির হিটলার। ভি-এস পাইপল তার একটি উপন্যাসে লিখেছিলেন-অধিক দূর থেকে নাকি সবকিছু অধিক স্পষ্ট দেখা যায়। কাছে থাকলে মানুষ সমস্যার মধ্যে নিজেও গুলিয়ে যায়। আর সেজন্য হয়তো ক্ষমতাসীন শাসকেরা জনগণের মনের দ্রোহটা বুঝতে পারে না। বাদ্যের আওয়াজ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। কিন্তু ছেড়া বাদ্যের আওয়াজ ঢুলি নিজেও শোনতে পায় না। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হচ্ছে না বলেই ভোটারদের মনে ভোট প্রদানের অনীহা ক্রমশ বাড়ছে। এর বড় উদাহরণ হচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। সরকার বিরোধী রাজনৈতিকদলগুলোকে রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেবে যাতে করে অদূরভবিষ্যতে গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে না পড়ে পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকা অর্জন করতে পারে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ