বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনা ভাইরাস : কতিপয় তথ্য বিভ্রাট সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা

আসিফ আরসালান : করোনা ভাইরাস সম্পর্কে এখন আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষেরই কিছু না কিছু ধারণা আছে। তথ্য প্রযুক্তির বিপুল উন্নতির এই যুগে তথ্য সংগ্রহ খুব কঠিন একটি বিষয় নয়। বরং বলা যায় যে, যদি কেউ আন্তরিক ভাবে কোনো চেষ্টা চালান তাহলে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন। এব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটি হল সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ। আপনি যে বিষয়টি জানতে চান সেই বিষয়টি সঠিকভাবে লিখে সঠিক স্থানে লগ ইন করুন। আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে সেই বিষয়ের ওপর নানান ধরনের তথ্য। এখনকার যুগে এভাবেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু তার একটি বিড়ম্বনাও রয়েছে। অনেক সময় একই বিষয়ে পরস্পর বিরোধী তথ্য পাওয়া যায়।
করোনা ভাইরাস নিয়েও এই ধরনের তথ্য বিভ্রাট ঘটতে দেখা গেছে। এর কারণ খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না। দেশ থেকে এবং বিদেশ থেকে একই বিষয়ের ওপর অনেকে তাদের নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এর ফলে জনগণের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই ইউটিউবে দেশী এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, ঐ সব স্ট্যাটাসে রয়েছে পরস্পর বিরোধীতা। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ঐ ইন্সটিটিউটের পরিচালক সেব্রিনা ফ্লোরা ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে বক্তৃতা করেন। এই সেমিনার ছিল একটি লেকচার সিরিজ। সেমিনারে ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা  ডাঃ এসএম আলমগীর দৃঢ়তার সাথে বলেন যে ২৫ বা ২৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস মারা যায় বলে কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন। এই মতামতের ভিত্তিতে অনেকে এই কথাও বলছেন যে আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ কমে যাবে এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। তিনি দ্ব্যার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে এই ধারণা ভুল। কারণ তার মতে করোনা ভাইরাস আংশিক ভাবে ধ্বংস হয় ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
রোগতত্ত্ব ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডাঃ আসলামের এই বক্তব্য ভ্রান্ত মতবাদ বলে ব্যক্ত করেছেন অপর এক ব্যক্তি। ইউটিউবে আপলোড করা ঐ বক্তব্যে তিনি বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, ২৫/২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই করোনা ভাইরাস ধ্বংস হয়। তিনি বলেন, আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া হতে করোনা বিদায় নেবে। কারণ তখন এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৩/৩৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হবে। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে ইরানে করোনা প্রকোপ এত ভয়াবহ কেন? উত্তরে তিনি বলেন যে ইরানের করোনা উপদ্রপ এলাকা সমূহে তাপমাত্রা ১২/১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসয়। এই বক্তব্য বাস্তবের নিরিখে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এখনো বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৩১ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তারপরেও এখানে গত শনিবার পর্যন্ত ২৪ জন রোগী সনাক্ত হয়েছে এবং ২জন মারা গেছেন। আমরা আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি, বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা যেন ২৪ এর ওপরে না ওঠে। কিন্তু আমরা বললেই তো হবে না। যদি কোন ব্যক্তির দেহে কোভিড-১৯ ভাইরাসটি ঢুকে পড়ে তাহলে তার প্রকাশ ঘটতে কমপক্ষে ৭ দিন, উর্ধ্বে ১৪ দিন সময় লাগে। আমরা যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেই কথায় ফিরে যাচ্ছি। আমরা কম্পিউটারে, ল্যাপটপে বা মোবাইলে অথবা টেলিভিশনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত অনেক তথ্য পাই। এবং তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই জনকল্যাণ চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই আমরা ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবে আপলোড করি। সারা দেশের মানুষ এমনিতেই আতংকিত হয়ে আছেন। তারা নিজেকে বড় অসহায় মনে করছেন। এই অসহায় অবস্থায় তারা সামাজিক মাধ্যমে যা কিছুই পান সেই টুকুই লুফে নেন। এজন্য আমাদের বক্তব্য হচ্ছে এই যে বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণ করবেন না। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে যেসব ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলো নীচে উল্লেখ করছি এবং কোনটি বিশেষজ্ঞ মতামত সেটিও পাশাপাশি উল্লেখ করছি।
॥দুই॥
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কথা ছড়িয়ে পড়েছে যে একটু পর পর, স্পষ্ট করে বললে ১৫ মিনিট পর পর, পানি, লবঙ্গ, ভিনেগার মিশ্রিত পানি বা গরম পানি পান করলে করোনা গলা থেকে কন্ঠনালী এবং কন্ঠনালী থেকে ফুসফুসে যায় না। বরং ঐ গুলো পান করলে  গলা যদি ভাইরাস ঢুকে বসে থাকে তাহলে পানি বা গরম পানি পান করলে সেটি কন্ঠনালী দিয়ে না গিয়ে খাদ্যনালি দিয়ে পরিপাকতন্ত বা স্টমাকে চলে যায়। স্টমাকের এসিডিটি বা অম্ল ক্ষার করোনা ভাইরাসকে ধ্বংস করে। গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি এ্যান্ড মেটাবলিজমের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ তানজিনা হোসেন বলেন যে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
আমরা কিছুক্ষণ আগে বলেছি যে, কারো কারো মতে ২৫/২৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে করোনা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তাই তাদের মতে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে যেহেতু প্রচণ্ড গরম পড়বে তাই আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে করোনা চলে যাবে। ডা. তানজিনা হোসেনের মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তার মতে আবহাওয়া ও পরিবেশের সাথে করোনার কোনো সম্পর্ক নেই। যে কোনো তাপমাত্রায় করোনার সংক্রমণ ঘটতে পারে।
থার্মাল স্ক্যানারে করোনা ধরা না পড়লে ধরে নেয়া হয় যে করোনা হয়নি। এই ধারণাও ভুল। থার্মাল স্ক্যানার শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করে। কোভিড-১৯ শরীরে আছে কিনা সেটি সম্পর্কে থার্মাল স্ক্যানের স্ক্যানিংয়ে কিছু বোঝা যায় না।
ঢাকার রাস্তাঘাটে, বাস, ট্রাক, রিকশা, সিএনজি, রেলগাড়ী, স্টিমার প্রভৃতি সব রকমের গণপরিবহনে দেখা যায় যে মানুষ মাস্ক পরে ঘোরাফেরা করছেন। তাদের ধারণা যে মাস্ক পরলেই বুঝি ভাইরাস শরীরে হানা দেবে না। এটিও ভ্রান্ত ধারণা। মানুষের দেহে যেসব পথ দিয়ে করোনা ভাইরাস ঢোকে সেগুলো হলোÑ চোখ, মুখ, নাক এবং কান। মাস্কে চোখ এবং কান খোলা থাকে। করোনা বায়ু বাহিত রোগ নয়। মাস্কের ভেতরে যে ফাঁক থাকে সেদিক দিয়েও ভাইরাস ঢুকতে পারে। বরং মাস্ক পরা জরুরি তাদের যারা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন।
একটি কথা পরিস্কার করে বলা দরকার। যেহেতু এখন পর্যন্ত করোনা রোগ প্রতিরোধের কোনো টিকা বা ইনজেকশন বের হয়নি তাই রোগ নিরাময়ের চেয়ে ভাইরাসটি যাতে শরীরে প্রবেশ করতে না পারে সেই দিকে সর্বাধিক নজর দিতে হবে। আর সেটি করতে গেলে জানতে হবে যে এই রোগটি কীভাবে ছড়ায় বা মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এটি ছড়ায় নিম্নোক্ত উপায়েঃ
করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শ^াস-প্রশ^াস, হাঁচি,কাশি অথবা কথা বলার সময় তার মুখ দিয়ে যে ড্রপলেট বা তরল কণা বেরিয়ে আসে। সেই ড্রপলেটের মধ্যেই থাকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের ভাইরাস। কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক মনে করেন যে এই ভাইরাসের আয়তন ৬০০ শত ন্যানোমিটার। মুখ নিঃসৃত ঐ তরল কণা বা ড্রপলেট যদি কোনো সুস্থ ব্যক্তির হাতে পড়ে এবং সুস্থ ব্যক্তিটি যদি তার হাত দিয়ে নাক, চোখ, কান বা মুখ এবং সেই সাথে মুখমণ্ডল স্পর্শ করেন তাহলে ঐ ভাইরাসটি ঐ ব্যক্তির চোখ, নাক, মুখ এবং কান দিয়ে প্রথমে গলায় যায় এবং পরে গলা থেকে কন্ঠনালী দিয়ে ফুসফুসে যায়। তাই সুস্থ্য ব্যক্তিকে আক্রান্ত ব্যক্তির অন্তত ৩ ফুট দূরে থাকতে হবে।
॥তিন॥
এখন বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে সংক্রমণ হয় এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যায়। এব্যাপারে আমরা যে যাই বলিনা কেন সেটি শতকরা একশত ভাগ নির্ভরযোগ্য হবেনা। এব্যাপারে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশ মেনে চলতে হবে। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ওপর বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা শতভাগ নির্ভরশীল। বাংলাদেশের রোগ তত্ত্ব সংস্থাটি আমেরিকার সিডিসির সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কাজ করছে। তার পরেও আমাদেরকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য একটি বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করতে হবে। আর সেটি হতে পারে একমাত্র বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা।
গবেষণায় দেখা গেছে যে ৬২ থেকে ৭১ শতাংশ এ্যালকোহলে করোনা ভাইরাসকে ছেড়ে দিলে ভাইরাসটি মরে যায়। ০.৫ শতাংশ হাইড্রোজেন প্রিঅক্সাইড এবং ০.১ শতাংশ সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড মেশানো ব্লিচ দিয়ে ভাইরাসটি ধ্বংস করা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশে রোগতত্ত্ব সংস্থার একটি বক্তব্য সঠিক বলে মনে হয়। সেটি হলো, ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এই ভাইরাসটি বেঁচে থাকতে পারে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে আমরা প্রত্যেক দিন যে কাপড় চোপড় পরে বের হই ঘরে ফেরার পর সেই কাপড়টি কী প্রতিদিন ধুতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আপনার জামা কাপড়ে যদি ভাইরাস লেগেও যায় তাহলেও সেটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে আপনার শরীরে প্রবেশ করবে না। কাপড় চোপড় নরম বস্তু। সেগুলো যদি ঘরে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা হয় তাহলে ২ দিনের মধ্যেই ঐ ভাইরাস মারা যাবে। ঘটনাক্রমে যদি ভাইরাসে আপনার  হাত লেগে যায় আর যদি আপনি সেই ভাইরাস লাগা হাত দিয়ে নাক, মুখ চোখ, স্পর্শ করেন একমাত্র তখনই আপনি সংক্রমিত হবেন। আর যদি কোনোক্রমে ভাইরাসে আপনার হাত লেগে গেল আর আপনি হাত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে আপনার মুখমণ্ডল স্পর্শ করেন, তাহলে আপনার সংক্রমিত হওয়ার ভয় নাই।
সব কথার শেষ কথা হলো দু’টি। একটি হলো, যে ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছেন তার নিকট থেকে আপনাকে দূরে থাকতে হবে। আপনি বাইরে বের হলে কীভাবে বুঝবেন যে কার সংক্রমণ হয়েছে আর কার হয় নাই।  সে জন্যই একমাত্র নিরাপদ ব্যবস্থা হলো কোয়ারেন্টিন অর্থাৎ ঘরে থাকা। আর আপনার ঘরেও যদি কারো সংক্রমণ হয় তাহলে আপনি একটি ঘরে  একা একা নির্জন বাস করবেন।
আর দ্বিতীয়টি হলো হাত ধোয়া। এ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যেই সব কিছু জেনে গেছেন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হ্যান্ড ওয়াশ অনেক দোকান থেকেই হাওয়া হয়ে গেছে। বেশি দাম দিয়ে হলেও এখনো সাবান কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের কি কিছুই করার নাই? এই লেখার শেষ পর্যায়ে আজ (শনিবার) দেখলাম ডেইলি স্টারের অন লাইনে দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গে মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ঘোষণা করেছেন যে তার সরকার পশি^মবঙ্গের সাড়ে সাত কোটি মানুষের নিকট বিনামূল্যে আগামী ৬ মাসের জন্য খাদ্যশস্য বিতরণ করবেন। আমাদের সরকার কি এব্যাপারে কিছুই করতে পারেন না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ