বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নারায়ণগঞ্জে শতাধিক গার্মেন্টের কয়েকশ কোটি টাকার অর্ডার বাতিল ও স্থগিত

নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা: করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো রকম সমঝোতা ছাড়াই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তৈরি পোশাকের কার্যাদেশ বাতিল করছেন বিদেশী ক্রেতারা। যার পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকা। গত দুই দিনেই নারায়ণগঞ্জে বাতিল ও স্থগিত হয়েছে শতাধিক রফতানিমুখী কারখানার কার্যাদেশ। পেমেন্ট আটকে যাওয়ায় আগামী কয়েক মাস শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে কারখানার মালিকদের মাঝে। ইতোমধ্যে নিট গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান আশঙ্কা করেছেন নিট খাতে কোটি শ্রমিকের বেকার হয়ে পড়ার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে টালমাটাল জনস্বাস্থ্য ও বিশ্ব অর্থনীতি। বিপর্যস্ত বাংলাদেশের পোশাক খাতও। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ বলছে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলাচ্ছে ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত। গত বুধবার কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে শতাধিক নিট কারখানার কার্যাদেশ বাতিল ও স্থগিত করেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ সহসভাপতি (অর্থ) ও আর এস কম্পোজিটের মালিক মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে গার্মেন্ট সেক্টরের অবস্থা ভয়াবহ। গত বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ আমার একটি দেড় লাখ পিছের শিপমেন্ট ছিল সেটা কাভার্ডভ্যানে লোড করার পরে মেইল আসে স্থগিত করার জন্য। গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) একই বায়ারের আরো দেড় লাখ পিছ শিপমেন্ট হওয়ার কথা ছিল সেটাও স্থগিত করার মেইল এসেছে। এই দু’টি শিপমেন্টের ব্যাক টু ব্যাক এলসির সব পেমেন্ট করা হয়েছে কিন্তু বায়ার জানিয়ে দিয়েছে আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে কোন ধরনের পেমেন্ট দিতে পারবে না। আমার আরেক বায়ার সোয়া লাখ পিছের অর্ডার ক্যানসেল করেছে। ইতালীতে আমার একটি শিপমেন্ট পোর্টে পৌঁছালেও বায়ার সেটা রিসিভ করতে পারছে না কারণ সেখানে হোম কোয়ারেন্টাইন চলছে। ওই বায়ারও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কোন ধরনের পেমেন্ট দিতে পারবে না বলে জানিয়েছে। বায়াররা মেইল দিয়েছে নিটিং কাটিং ডাইং যে অবস্থায় রয়েছে সেটা হোল্ড করতে। আমার মতো বাকি গার্মেন্ট মালিকদেরও একই অবস্থা। তারাও আমাকে কল দিয়ে জানতে চেয়েছে এখন কি করার কিন্তু আমি কাউকেই উত্তর দিতে পারছি না। একমাত্র আল্লাহর রহমত ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন পথ দেখছি না। সামনের মাসে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবো কিনা জানিনা। আমাকে যারাই কল দিচ্ছে তাদেরকে একটা কথাই বলছি যাতে পার্টি পেমেন্ট না দিয়ে হলেও শ্রমিকদের বেতন দেয়ার জন্য অর্থ সঞ্চয় করে রাখে। কারণ শ্রমিকরা প্রতি মাসে তাদের মজুরী দিয়ে বাড়ি ভাড়া দোকান বাকি দিয়ে থাকে। নিট সেক্টরে বর্তমানে ৮৫-৯০ ভাগ কারখানা এফেক্টেড। আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ৯৯ ভাগ কারখানাই এফেক্টেড হবে। শ্রমিকদের কাছে আমার অনুরোধ তারা যাতে অযথা সঞ্চিত অর্থ খরচ না করে।
বিকেএমইএ’র সচিব সুলভ চৌধুরী এ বিষয়ে জানান, আমরা অনেক কারখানার মালিকদের কাছ থেকে অর্ডার ক্যানসেল কিংবা অর্ডার স্থগিতের বিষয়ে ফোন পেয়েছি। কিন্তু সেটা হিসেব না করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা থেকে আমরা কল পেয়েছি। সামনে কি ধরনের পলিসি নিয়ে আমরা কাজ করবো সে বিষয়ে আমাদের সভাপতি এমপি সেলিম ওসমান মহোদয়ও সার্বিক নজরদারি করছেন। শীঘ্রই আমরা বোর্ড মিটিংয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাবো।
উল্লেখ্য এর আগে গত ১৭ মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে সরকারী নির্দেশনা অনুয়ায়ী নারায়ণগঞ্জ কলেজে দোয়া ও বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানের পূর্বে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে সংক্ষিপ্ত মত বিনিময় সভা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সরকার দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু আপনারা খেয়াল রাখবেন সেই সময়টাতে যেন বাচ্চারা কোচিং করতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত না হয়। এমনও হতে পারে ছুটি আরো বৃদ্ধি পেতে বা আবার এমনও হতে পারে নির্ধারিত সময়ের আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে যেতে পারে। আপনারা এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন। শিক্ষার্থীদের খোঁজ রাখবেন। সরকারী নির্দেশনা মেনে চলবেন তাহলে হয়তো দেখা যাবে আমরা করোনা আক্রান্ত হবো না। এরপরও আরো একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন আমাদের হতে হবে। সেটা হলো এই করোনার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সকল প্রকার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোন কোন দেশে কারফিউ ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও যদি এমন হয় তাহলে শুধুমাত্র নিট খাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে সেই পরিস্থিতির দিকেই যাচ্ছে। আজকে যে সচেতনতার কথা বলছি অভাবের কারণে হয়তো এই সচেতনতার কথা বলতে পারবো না।
অপরদিকে বিজেএমইএ জানিয়েছে তাদের ১০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বা ৮৭৯ কোটি ২৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। কাজের অভাবে যেন কারখানা বন্ধ না হয়, সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আমরা এখনো ১০৩-৪ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে আছি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এটা বদলে যাচ্ছে। আমরা কোনোমতে ফ্যাক্টরি বন্ধ করার পক্ষে না। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে বাজার থাকবে। কাজেই আমাদেরও একটু শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। সেই সঙ্গে একটু হিসাব রাখতে হবে। কোন ক্রেতা কেমন ক্যানসেল করছে। তারাই সব সময় আমাদের মার্ক দেবে। আমরাও তাদের মার্ক দেব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ