শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে অলিম্পিক গেমস?

অরণ্য আলভী তন্ময় : সারা দুনিয়ার মানুষ চার বছর পর পর অনুষ্ঠেয় অলিম্পিক গেমসের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। বিশেষ একটি কিংবা দুটি নয় অনেকগুলো খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বিধায় এর আবেদন অনেক বেশি থাকে। কিন্তু এবার সেই আবেদন অনেকটাই যেন হারিয়ে গেছে। সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য এখন মুর্তিমান এক আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। শুরুতে চীনে ধরা পড়ার পর এখন সারাবিশ্বের ১২৫টিরও বেশি দেশে ধরা পড়েছে এই রোগের রোগী। বিশ্বের অনেক দেশের ক্রীড়া আসরই স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়েছে। সেখানে জাতীয় আসরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আসরও রয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্স, শুটিং, সাইক্লিং, গলফের মতো আন্তর্জাতিক আসর পড়ে গেছে স্থগিতের খাতায়। আর গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ হিসেবে পরিচিত অলিম্পিক গেমস নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা। কারণ ২০২০ অলিম্পিক গেমসটি অনুষ্ঠিত হবে জাপানে। এই দেশটি আবার চীনের পাশ্ববর্তী। চীনের কিছুদিন পর পরই এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ে সূর্যোদয়ের দেশটিতে। সে কারণে করোনা ভাইরাস নিয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে অলিম্পিক গেমসের এবারের আসর। আগামী জুলাইয়ে অলিম্পিক গেমস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের ২০৬টি দেশের প্রায় ১১ হাজার অ্যাথলেট অংশ নেবেন এবারের অলিম্পিকে। চীন বরাবরই অলিম্পিকের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। করোনার প্রভাবে অলিম্পিক পিছিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন স্বয়ং জাপানের ভারপ্রাপ্ত অলিম্পিক মন্ত্রী সেইকো হাসিমোতো। তবে এই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সংস্থার (আইওসি) প্রেসিডেন্ট থমাস ব্যাচ। সম্প্রতি আসন্ন অলিম্পিক গেমস নিয়ে বোর্ড মিটিং করেছে আইওসি। বৈঠক শেষে থমাস ব্যাচ বলেন, ‘এখনো অলিম্পিক গেমস নিয়ে আমরা আতঙ্কিত নই। টোকিওতে ২০২০ সালে অলিম্পিক গেমস আয়োজন করার বিষয়ে আমরা বদ্ধপরিকর।’ অলিম্পিকের জন্য অ্যাথলেটদের অনুশীলন করে প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। এরপর আইওসি’র পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী সকল দেশের কাছে এক বিবৃতিতে বলা হয়, টোকিওতে নির্ধারিত সময়েই সফলভাবে এবারের অলিম্পিক আয়োজন করা হবে। এই মুহূর্তে আইওসি’র হাতে প্ল্যান ‘বি’ নেই। এদিকে জাপান সরকার ও আইওসি খতিয়ে দেখেছে নির্ধারিত সময়ে অলিম্পিক শুরু না হলে বিশাল অঙ্কের লোকসানে পড়তে হবে। ইতোমধ্যেই অলিম্পিকের বাজেট ১.৩০ ট্রিলিয়ন ইয়েন ছাড়িয়ে গেছে। ফলে জাপান সরকারও খুব করেই চাইছে নির্ধারিত সময়েই শুরু হোক এই অলিম্পিক। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সঙ্গে টোকিওর চুক্তি অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষ পর্যন্ত অলিম্পিক স্থগিত রাখা যাবে। করোনার প্রভাবে শেষ পর্যন্ত আইওসি জুলাই মাসে টোকিও অলিম্পিক স্থগিত করতে বাধ্য হতে পারে। তবে অলিম্পিক স্থগিত হলে বিশাল অঙ্কের আর্থিক বোঝা বইতে হবে। অবশ্য অলিম্পিক স্থগিত রাখা হবে কিনা, বা সময় পরিবর্তন করা হবে কিনা, তার সবকিছুই নির্ভর করেছে আইওসির সিদ্ধান্তের ওপরে। এখন প্রতিদিনই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এ ম”ত্যের সংখ্যা। এরই মধ্যে জাপানে ২ সপ্তাহের জন্য সব ধরনের খেলাধুলা পিছিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে। জাপানের একটি বাস্কেটবল দল জানিয়েছে তারা এই সপ্তাহে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলেছে। যতটা সম্ভব বাড়িতে থেকে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছে জাপান সরকার। এদিকে জাপানে বন্ধ রাখা হয়েছে অলিম্পিক স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ। অলিম্পিক পিছিয়ে দেওয়া বা টোকিও থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই আইওসির নেই। আইওসিও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডিক পাউন্ড যদিও ভিন্ন কথা বলেছেন, ‘যদি রোগটি এতটাই বিপজ্জনক থাকে, তাহলে অলিম্পিক সরাসরি বাতিলই করতে হবে। কারণ, এটা আয়োজনের জন্য অনেক কিছু আমাদের পক্ষে থাকতে হবে। অ্যাথলিটদের নিরাপত্তা, স্পোর্টস ভিলেজ, খাবার-দাবার, হোটেল, সাংবাদিক বন্ধুদের নিরাপত্তা। এসব ঠিক না হলে বাতিলই করতে হবে। কিছুদিন পরই আমরা পর্যবেক্ষণ করব। যদি সব ঠিকঠাক ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়, তাহলেই শুধু খেলা হবে, নইলে নয়। এটা পিছিয়ে দেওয়া বা স্থানান্তরের কোনো সুযোগ নেই।’ টোকিও অলিম্পিকের মশাল প্রজ্বালন করার কথা রয়েছে ১২ মার্চ। গ্রিসের বিভিন্ন স্থানে প্রদক্ষিণের পর মশালটির জাপান-যাত্রা শুরু হবে ২৬ মার্চ। ২৪ জুলাই টোকিও অলিম্পিক শুরুর আগে ১২১ দিন জাপানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় জায়গায় যাওয়ার কথা মশালটির। কিন্তু কোন কোন জায়গায় এটি পাঠানো হবে, কোন অনুষ্ঠানে কতজন অংশগ্রহণকারী থাকবে, এসবই এখনও ঠিকঠাক করে উঠতে পারেনি আয়োজক কমিটি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে কর্মপরিধির বিস্তারিত চূড়ান্ত করে ফেলার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। প্রজ্জ্বলিত মশালকে বলা হয় অলিম্পিকের প্রতীক। মশালের মতো প্রতীকীভাবে থমকে আছে এখন গোটা টোকিও অলিম্পিকই। করোনাভাইরাসের প্রভাবে জাপানের জীবনযাত্রা এতটাই ব্যাহত হয়ে চলছে যে, ২০২০ অলিম্পিক হবেই- এমন আশ্বাস দিতে পারছে না কেউই। ১৮৯৬ সালে আধুনিক অলিম্পিক শুরুর পর মাত্র একবারই নির্ধারিত সময়ে অলিম্পিক আয়োজন করা যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চীন-জাপান যুদ্ধের কারণে না হওয়া ১৯৪০ অলিম্পিকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল টোকিওতে। অবশ্য চার বছর আগে ব্রাজিলের রিও অলিম্পিকও শুরুর আগে জিকা ভাইরাসের কারণে শঙ্কার মধ্যে ছিল। তবে নির্দিষ্ট সময়ের আগে সেটি উবে যায়। জাপান কর্তৃপক্ষ আশা করছে, মহামারি রূপ ধারণ করা করোনাভাইরাসও এপ্রিলের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। তবে এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি, তাতে কোনো ‘প্ল্যান বি’ও রাখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন টোকিও অলিম্পিক কমিটির ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল কাতসুরো এনোয়ো। অনেকটা আশাবাদী কন্ঠে অলিম্পিক আয়োজনের শীর্ষ এই কর্তকর্তা জানিয়েছেন, ’টোকিও অলিম্পিক হবে না, এমনটা আমরা মাথায়ই আনছি না। না হলে কী করা যাবে সেই পরিকল্পনাও তাই নেই।’ ৯ আগস্ট অলিম্পিক শেষ হওয়ার পর ২৫ আগস্ট শুরু প্যারা অলিম্পিকে খেলার কথা আরও চার হাজার ৪০০ অ্যাথলেটের। ১৯১৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক বাতিল হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে, ১৯৪০ ও ১৯৪৪ সালে অলিম্পিক গেমস বাতিল হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে। এর বাইরে সবগুলো আসরই বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প সব কিছুর চোখ রাঙানি এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়িয়েছে। কিন্তু এবার যুদ্ধ নয়, বৈরী প্রকৃতি নয়ও; প্রায় অদৃশ্য এক ভাইরাসের আতঙ্কেই পিছিয়ে যেতে পারে অলিম্পিক গেমস। ২০২০ সালেই হবে অলিম্পিক, তবে নির্ধারিত সময় মেনে বছরের মাঝামাঝি সময়ে হয়তো গেমস আয়োজন করা যাবে না বাস্তব কারণেই। তবে করোনা ভাইরাসের এই অবস্থার মধ্যে যদি অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করা হয় তাহলে দর্শকশূন্য গ্যালারি হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সময়ের উপর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ