শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্যাংকের বিনিয়োগের ঘোষণায়ও থামেনি শেয়ারবাজারের ধস

* করোনায় কুমলো শেয়ারবাজারের লেনদেনের সময় * সাত বছরের মধ্যে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান
স্টাফ রিপোর্টার : করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ভয়াবহ ধসের কবলে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজার। ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণাও ধস ঠেকাতে পারছে না। এই পতনের কবলে পড়ে শেষ ১০ কার্যদিবসে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ৮৬৩ পয়েন্টই নেই হয়ে গেছে। এটা সাত বছরের মধ্যে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। আর শেষ সাত কার্যদিবসে মূলধনে নেই ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এমতাবস্থায় শেয়ারবাজারের লেনদেনের সময় কমানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপে বেশ কিছুদিন ধরেই বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস চলছে। যার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও। তবে ৮ মার্চ বাংলাদেশ প্রথম তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ পেলে আতঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর প্রভাবে ৯ মার্চ শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স একদিনে রেকর্ড ২৭৯ পয়েন্ট পড়ে যায়। এরপর একে একে আট দিন চলে গেলেও বড় ধসের কবল থেকে বেরোতে পারেনি শেয়ারবাজার।
শেয়ারবাজরে একের পর এক বড় ধস নামায় ১৬ মার্চ ব্যাংক মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠক শেষে ব্যাংকগুলো বুধবার (১৮ মার্চ) থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। তবে এ ঘোষণাও শেয়ারবাজারের ধস ঠেকাতে পারেনি।
অবশ্য দিনের লেনদেনের শুরুতে শেয়ারবাজারে বড় উত্থানের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র ৫ মিনিটের লেনদেনে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ১০৮ পয়েন্ট বেড়ে যায়। কিন্তু এই উত্থান প্রবণতা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। লেনদেনের সময় আধা ঘণ্টা পার না হতেই একের পর এক প্রতিষ্ঠানের দরপতন হতে থাকে। ফলে দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ১৬৮ পয়েন্ট কমে ৩ হাজার ৬০৩ পয়েন্টে নেমে গেছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৬১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ২০৩ পয়েন্টে এসে পৌঁছেছে। আর ডিএসইর শরিয়াহ সূচক ৩৯ পয়েন্ট কমে ৮৩৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন অংশ নেয়া মাত্র ১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৩৩৩টির। আর ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। পতনের এই বাজারে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৪২৯ কোটি ৩ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ৪০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে লেনদেন বেড়েছে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অপর শেয়ারবাজর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই ৪৪২ পয়েন্ট কমে ১১ হাজার ১৩৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২২১টির এবং ৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
৭ দিনে নেই ৪৪ হাজার কোটি টাকা: করোনাভাইরাস আতঙ্কে মন্দা পুঁজিবাজারে পতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিপর্যয়ের কারণে পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থা বিরাজ করছিল। এরসঙ্গে নতুন করে আতঙ্ক হিসাবে দেখা দিয়েছে করোনভাইরাস। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়ার পর থেকে পুঁজিবাজারে টালমাটাল অবস্থা। করোনা আতঙ্কে সবশেষ সাত কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে ৪৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা বাজার মূলধন নেই হয়ে গেছে। একই সময়ে ডিএসই সূচক হারিয়েছে ৬৮৩ পয়েন্ট।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, করোনাভাইরাস আতঙ্কে বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ ছিল। এরসঙ্গে করোনাভাইরাস আতঙ্কে পতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের কবলে পড়েছে। পুঁজি হারিয়ে প্রায় প্রতিদিনই নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ আতঙ্কিত হয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি না করা।
এদিকে গতকাল বুধবার লেনদেন শুরুর প্রথম ৩৫ মিনিট পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলে শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা যায়নি। সকাল ১১টা থেকে সূচক ঋণাত্নক হতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পতনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক আগের দিনের চেয়ে ১৬৮ পয়েন্ট কমে ৩ হাজার ৬০৩ পয়েন্টে নেমে আসে। এটি আগের সাত বছরের মধ্যে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে ২০১৩ সালের ৯ মে‘র পর ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৩ হাজার ৫৫৯ পয়েন্ট। ওইদিনের পর গতকাল সূচক সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে।
এর আগে গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার দিন ডিএসই বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। একইদিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৪ হাজার ২৮৭ পয়েন্ট। মাত্র সাত কার্যদিবসে বড় দরপতনের কারণে বুধবার ডিএসইর মূলধন ৪৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা কমে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬৮৩ পয়েন্ট কমে ৩ হাজার ৬০৩ পয়েন্টে নেমে আসে।
করোনায় কুমলো শেয়ারবাজারের লেনদেনের সময়: করোনাভাইরাসের কারণে দেশের শেয়ারবাজারে লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। নতুন সময় অনুযায়ী সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শেয়ারবাজারে লেনদেন হবে।
গতকাল বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেলে জরুরি বৈঠকে বসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপে বেশ কিছুদিন ধরেই বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস চলছে। যার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও। তবে ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ পেলে আতঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
এর প্রভাবে ৯ মার্চ শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স একদিনে রেকর্ড ২৭৯ পয়েন্ট পড়ে যায়। এরপর একে একে আটদিন চলে গেলেও বড় ধসের কবল থেকে বের হতে পারেনি শেয়ারবাজার।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে যাওয়া এই প্রতিনিধি দল ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ রাখার জন্য আনুষ্ঠানিক দাবি জানান। তবে ডিএসইর এমডি তাদের সে দাবি গ্রহণ না করে বলেন, ‘আগামীকাল থেকে শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সবাই শেয়ারবাজার ভালো করতে চেষ্টা করছে।
তবে গত সোমবার আবার শেয়ারবাজারে ধস নামে। এরপর বিকেলে ব্যাংক মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠক শেষে ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বুধবার থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। এমন আশ্বাসের পরও বুধবার শেয়ারবাজারে ধস নামে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিকেলে জরুরি বৈঠকে বসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদ। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, শেয়ারবাজারে লেনদেন চলমান থাকবে। তবে লেনদেনের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ