সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ডিএসইর ভয়াবহ দরপতনে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা

স্টাফ রিপোর্টার: বড় দরপতন দিয়ে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস পার করেছে দেশের শেয়ারবাজার। এদিন লেনদেনের শুরুতেই একের পর এক প্রতিষ্ঠানের পাশে লালচিহ্ন পড়তে থাকে। দিনের শুরুতে হু হু করে দাম কমে প্রায় দেড়শ প্রতিষ্ঠান সার্কিট ব্রেকারের (দাম কমার সর্বোচ্চ) সীমার কাছে চলে আসে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় আতঙ্ক আর পুঁজি হারানোর শঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের একটি দল লেনদেন বন্ধ করার দাবি নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ছুটে যায়। যদিও ডিএসই কর্তৃপক্ষ তাদের সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। শেয়ারবাজারের ভয়াবহ দরতপন দেখা দেয়ায় বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সঙ্গে বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৈঠক শেষে জানানে হয়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে সরকারি-বেসরকারি ১১ বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, রূপালী, ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক; শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ঢাকা ব্যংক, মার্কেন্টাইল ও ব্যাংক এশিয়া।
গতকাল রোববার বিকেলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দিয়ে সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সার্কুলারের আওতায় এ তহবিল গঠন করেছে ব্যাংকগুলো।
বিএমবিএ’র সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বিশেষ তহবিলের বিষয়সহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
শেয়ারবাজার টেনে তুলতে স্টেকহোল্ডারদের একটি অংশের দাবির প্রেক্ষিতে এবং সরকারের ওপর মহলের হস্তক্ষেপে গত ১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়।
নিজস্ব উৎস অথবা ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ শতাংশ সুদে এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো, যা পরিশোধের সময় পাবে পাঁচ বছর। আর ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এ তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া এই সুবিধার পর এক মাসের বেশি সময় কেটে গেলেও তহবিলের গঠনে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এক মাসে মাত্র ৩টি ব্যাংক তহবিল গঠন করেছে।
ব্যাংকগুলোর তহবিল গঠনে এমন গড়িমসি করায় শেয়ারবাজারে দরপতন হচ্ছে বলে অভিযোগ শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের। এর মধ্যে গত সপ্তাহে একাধিক দিন বড় দরপতন হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকা কমেছে। রোববারও শেয়ারবাজারে বড় দরপতনে দিন শুরু হয় যা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
গতকাল শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরুর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ১০০ পয়েন্টের ওপরে পড়ে যায়। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে পতনের মাত্রা। ফলে একপর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৩৪ পয়েন্ট পড়ে যায়। তবে শেষ দিকে এসে পতনের মাত্রা কিছুটা কমে।
এরপরও ধসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শেয়ারবাজার। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৬০ পয়েন্ট কমে তিন হাজার ৯৬৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এর মাধ্যমে পাঁচ বছর পর সূচকটি চার হাজার পয়েন্টের নিচে নামল।
২০১০ সালে শেয়ারবাজারে মহাধসের পর ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ডিএসইর সূচকে পরিবর্তন আনা হয়। বাজারটিতে প্রধান মূল্য সূচক হিসেবে চালু করা হয় ডিএসইএক্স। শুরুর দিন সূচকটির ভিত্তি পয়েন্ট ছিল চার হাজার ৫৫ পয়েন্ট। এরপর কিছুদিন সূচকটি পতন হলে চার হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসে।
তবে ২০১৩ সালের ১০ জুন আবার চার হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে সূচকটি। এরপর ২০১৫ সালে আবার পতন দেখা দিলে ৪ মে সূচকটি আবার চার হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসে। অবশ্য পরের কার্যদিবসেই তা চার হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়। এরপর আর চার হাজার পয়েন্টের নিচে নামেনি ডিএসইএক্স। তবে বড় পতনের কবলে পড়ে রোববার আবার সূচকটি চার হাজার পয়েন্টের নিচে চলে এলো।
এই পতনের কবলে পড়ে এদিন ডিএসইতে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে দাম কমেছে ৩৩৮টির। আর সাতটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে পতন হয়েছে প্রধান সূচকের সঙ্গে ডিএসইর অপর দুই সূচকের। এর মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৪৮ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৩৩৩ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসইর শরিয়াহ্ ৩১ পয়েন্ট কমে ৯২৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
শেয়াবাজারের এই পতনকে রক্তক্ষরণের সঙ্গে তুলনা করে বিনিয়োগকারী আমিনুল বলেন, শেয়ারবাজারে প্রতিদিন ভয়াবহ দরপতন হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই আমাদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আজ (রোববার) তো শেয়ারবাজারে রক্তনদীই বয়ে গেল। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
এদিকে লেনদেন শুরুর দুই ঘণ্টার মধ্যে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ২৩৪ পয়েন্ট পড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের একটি প্রতিনিধিদল লেনদেন বন্ধ করার দাবি নিয়ে ডিএসইর নিকুঞ্জের অফিসে যান। সেখানে ডিএসইর এমডি, সিওও এবং সিএফওর সঙ্গ বৈঠক করেন তারা।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা ডিএসইর কাছে দুই সপ্তাহ লেনদেন বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছিলাম। তবে ডিএসইর এমডি আমাদের বলেছেন- আগামীকাল থেকে শেয়ারবাজার ভালো হয়ে যাবে। তার কথার ওপর ভিত্তি করে আমরা দুইদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই দুই দিনের মধ্যে বাজার ভালো না হলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।
সংগঠনটির সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, কারসাজিচক্র পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটাচ্ছে। এই দরপতন ঘটাতে তারা করোনাভাইরাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। করোনাভাইরাস আতঙ্কে আমাদের শেয়ারবাজারে দরতপন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই আমাদের দাবি এই কারসাজিচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সেইসঙ্গে কিছুদিনের জন্য শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ রাখতে হবে। সেইসঙ্গে নিয়ম করতে হবে প্রতিদিন প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউজকে কমপক্ষে দুই কোটি টাকার লেনদেন করতে হবে।
দরপতনের বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। তাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আতঙ্কে পেনিক সেল না দিয়ে, শেয়ার ধরে রাখতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সবাই বাজার ভালো করতে চেষ্টা করছে। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি এই বাজার ভালো হবে।
এদিকে দরপতনের সঙ্গে ডিএসইতে দেখা দেয় লেনদেন খরা। দিনভার বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৩৭৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ৪০৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আগের আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ৩৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
অপর শেয়ারবাজর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই ৪৮৯ পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ১৫৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৩৪টির এবং চারটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ