বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

নারায়ণগঞ্জের অর্ধশতাধিক ডকইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের জাহাজ

মুহাম্মদ নূরে আলম : প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জের অন্যতম উপজেলা শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা শিল্পাঞ্চল খ্যাত রূপগঞ্জের অবস্থান। এক সময়ের জামদানি, মশারী ও মসলিন কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ রূপগঞ্জ এখন শিল্পাঞ্চল খ্যাত কোলাহলপূর্ণ জনপদ। এখানে হাজারো রকমের কল-কারখানার ভিড়েও শীতলক্ষার পাড়ে কায়েতপাড়ায় ঠাঁই করে নিয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক ডকইয়ার্ড। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া এলাকায় তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাহাজ ও বলগেট। জাহাজ তৈরিকে কেন্দ্র করে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা কায়েতপাড়া গ্রাম এরই মধ্যে জাহাজের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখানে গড়ে উঠেছে ২৮ টি জাহাজ তৈরির কারখানা। হাজার মানুষের পদচারণে কায়েতপাড়া এখন কর্মমুখর জনপদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কায়েতপাড়ায় শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, মাসটাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি নামে জাহাজ কারখানা রয়েছে। এখন কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট ও ড্রেজার তৈরি হয় শীতলক্ষ্যার এ চরে। বিদেশি কাটা জাহাজের ৮ থেকে ১২ মিলিমিটার আকারের শিট ব্যবহার করা হয় জাহাজ তৈরিতে। ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে শিট কিনতে হয়। লোহার অ্যাঙ্গেল ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ১০ থেকে ১১ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে। আর অন্যান্য মালামাল পাওয়া যায় ঢাকার বংশাল অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে। একটি বড় জাহাজ তৈরিতে সব মিলে ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা খরচ হয়। এরপর নির্মাতারা সুবিধামতো লাভে তা বিক্রি করেন। ২০ থেকে ২৫ জন কারিগরের একটি জাহাজ তৈরিতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ মাস।
শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা ডকইয়ার্ড তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের বহু জাহাজ। গ্রামের পথ চলতেই টুক্ টাক্ শব্দে কান  ঝালাপালা হবার উপক্রম হবে। ডেমরা থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে উত্তরে এঁকেবেঁকে গেছে পীচঢালা সড়ক। সেই রাস্তা ধরে মাত্র ৩ কিলোমিটার এগুলেই জাহাজ তৈরীর অসংখ্য কারখানার দেখা মিলবে।
কোনটি সবে তৈরি হচ্ছে, কোনটি সমাপ্তির পথে। যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে যাবে বড় বড় জাহাজ দেখে। ইতোমধ্যেই শীতলক্ষ্যা পাড়ের এ চরটি এখন এলাকাবাসীর কাছে জাহাজের চর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এ জাহাজের চরেরই গ্রাম রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া। বর্ষায় নৌকা চড়ে এখানে-ওখানে যেতে হতো এলাকাবাসীকে। অজোপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝাই তাই ছিল কায়েতপাড়া। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জাহাজ তৈরির শিল্প। হাজার মানুষের পদচারনায় কায়েতপাড়া এখন এক কর্মমুখর জনপদ। কায়েতপাড়ার পূর্বগ্রাম, ভাওয়ালীপাড়া, ডাক্তারখালী, বড়ালু, মাঝিনা, হড়িনা, ও ইছাখালীর চরে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা। এছাড়া উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানগর ও দড়িকান্দির চরে রয়েছে আরো ৮/১০টি প্রতিষ্ঠান। দেশের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁ, গাজীপুরের কালীগঞ্জ, চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পাগলার পানগাঁও, সাভারের আশুলিয়া ও বরিবাশের বেলতা এলাকায় এই শিল্পের অবস্থান। মাস্টাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাস্টাং ইঞ্জিনিয়ারিং কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানাগুলোর অন্যতম। আড়াইশ’ ফুট থেকে শুরু করে শত ফুটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরী, জেটি, পল্টন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট আর ড্রেজার তৈরি হয় শীতলক্ষ্যার এই চরে।
জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেনশীট আর এঙ্গেল, মেশিন সরাসরি আমদানী করতে হয় চীন থেকে। অতিরিক্ত উপাদান বলতে টি-গার্ডার, বিট-গার্ডার, রং,  ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং রড আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরো কাজ। একটি বড় মাপের কোস্টার জাহাজ তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেইস লাইন তৈরি করে দেন। পরে ঠিকাদারের নির্দেশনাক্রমে ফিটাররা জাহাজের মলিন তৈরি করেন। ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজটির খাচা তৈরি নির্মাণ করেন। একটি বডি দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন আর রং এর কাজ। বড় জাহাজে ৩/৪টি খুপড়ি বা হেস থাকে।  যেখানে ৩/৪শ’ টন পর্যন্ত মাল বহন করা যায়। প্লেনশীট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশী কাটা জাহাজের ৮ থেকে  ১২ মিলির শীট ব্যবহার করা হয় জাহাজ তৈরিতে। ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে শীট কিনতে হয়। আর  লোহার অ্যাঙ্গেল ৭৫/৭৬ টাকায় পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৮/৯ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানী করা হয় চীন থেকে আর অন্যান্য মালামাল আছে ঢাকার বংশালে অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে। সর্বসাকুল্যে একটি বড় জাহাজ তৈরিতে ৯/১০ কোটি টাকা খরচা হয়। এরপর মালিকরা সুবিধামতো লাভ করে তা বিক্রি করেন। একটি জাহাজ ২০/২৫ জন কারিগর মিলে তৈরি করলে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ মাস।
জাহাজ তৈরির জন্য যিনি জমি দেন এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন তাকে বলা হয় কারখানা মালিক। আর যারা জাহাজটি ফিটিংস করেন তাদের বলা হয় ফিটার। জাহাজে ঝালাইয়ের কাজ করেন ওয়েল্ডার আর পুরো ব্যাপারটা যে নিয়ন্ত্রণ করে সে হলো ঠিকাদার। জাহাজ তৈরির সকল উপকরণ কিনে দেন জাহাজ মালিক। জমির মালিক একটি জাহাজ ফেলার জন্য জমির ভাড়া নেন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন ঠিকাদারের মাসিক বেতন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। একজন রাজমিস্ত্রি দৈনিক হাজিরা পান ৪০০ টাকা তার সহযোগী ৩০০ টাকা। ফিটারের দৈনিক বেতন ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। ওয়েল্ডার পায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। রং মিস্ত্রির হাজিরা ৩৫০ টাকা, তাদের সহকারীদের বেতন ২৫০ টাকা। আর সকল হেলপারের দৈনিক হাজিরা ২০০ থেকে আড়াইশ’ টাকার মধ্যে। সকল খরচা শেষে একটি জাহাজ পানিতে নামানোর পর জাহাজ মালিক আলোচনার ভিত্তিতে তা বিক্রী করেন। বছরে ৪০/৫০ লাখ টাকার মতো তাদের আয় হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া অত্র এলাকায় শিল্পটি গড়ে উঠায় এলাকাতে বাড়ি ভাড়া, লেদ মেশিন, খুচরো যন্ত্রাংশ আর পান/সিগারেটের দোকান দিয়ে এলাকার মানুষ বাড়তি উপার্জন করছে। তবে বেশ খুশি মাসটাং ডকইয়ার্ডের ম্যানেজার জয়নাল, রিয়াজ হোসেন, বাড়িওয়ালা নুরুল হুদা, জন, সাঈদ আহমেদ, হাবিব, সুমন, খোকন, আলী আকবর স্থানীয় ইউপি সদস্য শরীফসহ আরো অনেকে। তাদের এলাকায় জাহাজ শিল্প গড়ে উঠায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ। শীতলক্ষ্যা পাড়ের জাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি এবং মাস্টাং ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাস্টাং ডকইয়ার্ডের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদ হোসেন তুহিন আশংকা করেন, যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে কায়েতপাড়ার একমাত্র এই শিল্পটি। তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য বরাবর চাপ দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আর রাজউক ও বি আইডব্লিওটি-এর অনাপত্তি পত্র ছাড়া ছাড়পত্র প্রদান করছেনা পরিবেশ অধিদপ্তর।
এদিকে নদী বিষয়ক মহামান্য হাইকোর্টে বি আইডব্লিওটিএ’র একটি রিট পিটিশন থাকায় তারাও অনাপত্তি পত্র দিতে পারছে না। এ কারণে দেখা দিয়েছে জটিলতা। বিদ্যুৎ নির্ভর জাহাজ শিল্পের যদি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় তাহলে আশার আলো দেখেও হতাশায় হাবুডুবু খাবে রূপগঞ্জের জাহাজ শিল্প। আলোর নীচে যেমন বাস করে অন্ধকার ঠিক তেমনি রাজধানীর কোল ঘেঁষা এই জনপদটি ছিলো অবহেলিত। বছরের অর্ধেকটা সময় জুড়ে এলাকাটি থাকতো জলমগ্ন। কৃষিনির্ভর এলাকার মানুষ বছরে মাত্র একবার ফসলের মুখ দেখার কারণে তাদের দিন কাটতো খেয়ে না খেয়ে। অত্র এলাকার আব্দুল মালেক আর ফটিক খান বন্দর এলাকার সোনাকান্দায় বেড়াতে  গিয়ে দেখতে পেলেন শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে ওঠা সামান্য চরে তৈরি হচ্ছে ট্রলার। তাদের মাথায় চিন্তা ঢুকে তারাও তাদের প্রায় পতিত চরের জমিকে এভাবে কাজে লাগাতে পারেন। ভাবনা থেকেই তারা একাধিকবার দোহারে যান। কথা বলেন জাহাজ মালিকদের সাথে। তারা সম্মত হলে ২০০৫ সালে পূর্বগ্রাম এলাকায় দু’টি কারখানা চালু হয়। লাভের মুখ দেখায় একে একে গড়ে উঠলো অর্ধশত কারখানা। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ। তাই এখনই প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিয়ে সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে  টিকিয়ে রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ