শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

মি’রাজ শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয় নয় বরং বিশ্ব শান্তির চিরন্তন ফরমূলা

মাওঃ মুফতী মো: ওমর ফারুক : মি’রাজ শব্দের অর্থ উর্ধ্বগমন, সিঁড়ি বেয়ে উপরে আরোহন ইত্যাদি। মুলত মি’রাজ হচ্ছে রাসুল সা: এর জীবনের বিস্ময়কর ঘটনা যা দ্বারা রাসুলের রিসালাতের সত্যতা, মহান আল্লাহর অসিম ক্ষমতার নমুনা প্রদর্শন,এবং বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক, সকল বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী সর্বযুগের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব মহানবী (সা.)কে স্বচক্ষে আসমান জমীন-জান্নাত জাহান্নাম এর পরিধি সুখ শান্তি কি আমলে কি পুরস্কার,গোটা পৃথিবীকে শান্তিময় করার কলা কৌশল, অতিত নবী রাসুলদের সাক্ষাৎকার মতবিনিময় ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ের বাস্তব চিত্র যেন রাসুল (সা.) সরেজমিনে দেখে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে শতভাগ সফল হতে পারেন সেই জন্যই মি’রাজ।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে দাঙ্গা হাঙ্গামা, মারামারি কাটাকাটি, জুলুম নির্যাতন অন্যায় অবিচার ইত্যাদি অপকর্ম চলছে, তা হতে সমাজকে রক্ষা করতে হলে মিরাজের শিক্ষাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন অপরিহার্য্য। তবেই সমাজে, দেশ-বিদেশে সর্বত্র বয়ে আসবে অবিরাম অনাবিল শান্তি শৃঙ্খলা। আসুন আমরা মিরাজের শিক্ষাগুলো যথাযথ ভাবে জেনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করি।
নিম্নে মিরাজের শিক্ষাগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো।
১ নং শিক্ষা : “তোমার প্রভূ হুকুম করেছেন - তোমরা এক আল্লাহ তা’য়ালা ব্যতীত আর কারো ইবাদত করবে না”। অর্থাৎ ইবাদত হবে একমাত্র আল্লাহর। “আল্লাহ তা’য়ালার আদেশ ও নিষেধের ভিত্তিতে জীবন কাটানোর নামই হলো ইবাদত”। আর যিনি আল্লাহ তা’য়ালার আদেশ ও নিষেধের আলোকে জীবন পরিচালনার চেষ্টা করেন তাকে আবদ বা আবেদ বলা হয়। শুধু নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক আ’মালকে ইবাদত বলাহয় না। ইবাদত হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’য়ালার কথা মেনে চলার নাম।
যার কারণে সূর্যোদয়ের সময় নামায পড়লে সাওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়। ঈদের দিন রোযা রাখলে সাওয়াব হয় না বরং গুনাহ হয়। কেননা ঐ সময় নামায ও রোযার ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাহলে বুঝা গেল নামায রোযা ইত্যাদিকে তখনই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত বলা হবে যখন এগুলো আল্লাহর কথার আলোকে আদায় করা হয়। এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোও নিকট মাথানত করা, প্রনাম করা, কবর পুজা করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে কোন কিছু চাওয়া এবং তার উপর তাওয়াক্কুল করা ইবাদতের সম্পূর্ণ বিপরীত।
নামায মি’রাজের অন্যতম উপটৌকন। নামায একমাত্র ইবাদত যা তিঁনি মি’রাজের রাত্রিতে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে এ উম্মতের উপর ফরজ করেছেন। নামায হলো মুমিন ব্যক্তির মি’রাজ স্বরূপ। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) মি’রাজের মাধ্যমে যেভাবে আল্লাহর দিদার লাভ করেছেন, মুমিন ব্যক্তিও নামাযে সেরূপ আল্লাহর দিদার লাভে সক্ষম হবে। নামাযই হলো কাফের ও মুমিন ব্যক্তির মাঝে একমাত্র পার্থক্যকারী। দ্বীনের মধ্যে নামায হলো দেহের মধ্যে মাথার মতো। অর্থাৎ মাথা বিহীন দেহ যেমন চিনা যায় না তেমনি নামায বিহীন মুসলমানকেও রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মত বলে চিনবেন না। অথবা মাথাবিহীন দেহ যেমন জীবিত থাকে না, অনুরূপ নামায বিহীন ঈমানও টিকে থাকে না। নামায হলো বেহেস্তের চাবি। সুতরাং নামাযের ব্যাপারে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করা মুমিন ব্যক্তির ঈমানী দায়িত্ব।
২ নং শিক্ষা : “আর পিতা মাতার সাথে সদাচরণ কর” আল্লাহ তা’য়ালার পরেই পিতা মাতার হক। পবিত্র কুরআনের অসংখ্য জায়গায় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর ইবাদতের পরেই পিতা মাতার সাথে সদাচরণ করতে আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত ও পিতা মাতার সাথে সদাচরণ ওৎপ্রোত ভাবে জড়িত। মাতা পিতার খেদমত না করে শুধু নামায রোযা ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। যে ব্যক্তি পিতা মাতাকে জীবিত পেয়েছে কিন্তু তাদেরকে খুশি করে জান্নাত লাভ করতে পারেনি রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে তিরস্কার করেছেন। আবার পিতা-মাতার অসন্তোষ সন্তানের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। যদি কোন সন্তানের উপর পিতা-মাতা অসন্তুষ্ট থাকেন-সে সন্তান কখনো কামিয়াব হতে পারে না। “দু’টি বিষয়ের শাস্তি দুনিয়াতেই পেতে হয়। জুলুম এবং পিতার মাতার অবাধ্যতা”। তাই আমাদের উচিত যে কোন মূল্যে পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করা। পিতা-মাতার ও উচিত সন্তানদের কে সে ভাবে গড়ে তোলা। পিতা-মাতা তাদের দায়িত্বের অবহেলার কারণে সন্তানসন্ততি পাপ কাজে জড়িয়ে পড়লে এ অপকমের্র দায়ভার তাঁরা কখনো এড়াতে পারবে না।
৩ নং শিক্ষা : পরস্পর পরস্পরের হক অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে যত মারামারি তা কারো অধিকার নষ্ট করার দরুণ অথবা অন্যায় অবিচারের দরুণ তাই প্রত্যেকেই প্রত্যেকের হক বা অধিকার যথযথভাবে আদায় করলে সর্বত্র শান্তিময় পরিবেশ বিরাজ করবে। সামাজিক অনেক অনুষ্ঠানাদি দেখা যায় যেখানে সাজ সজ্জা করে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করা হয় অথচ প্রতিবেশী, গরীব আত্নীয় স্বজন কে ঐ অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয় না। “আত্মীয় স্বজন, মিসকিন এবং পথিকদের হক তাদেরকে বুঝিয়ে দিন”। ইসলামে সকল মানুষের জীবনের সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজনের হক বলতে বুঝায়, তাদের মিরাসী সম্পদ এবং আতিথেয়তার অধিকার। যদি কোন আত্মীয় উত্তরাধিকার সূত্রে কোন সম্পদের মালিক হয়, তা তাকে প্রদান করা বাধ্যতামূলক। যদি ছল চাতুরী করে তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে সে বড় গুনাহগার হবে। যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের মিরাস কর্তন করবে আল্লাহ তার জান্নাতের অধিকার কর্তন করবেন।
৪ নং শিক্ষা: কেহ গাছতলায় কেহ বা বিশতলায়,কেহ হাজার টাকার কার্পেট এর উপর জুতো দিয়ে হাটে কেহ মারা যাওয়ার পর দাফনের কাপড়ের জন্য রাস্তায় লাশ রেখে পয়সা সংগ্রহ করা লাগে ইহা মানবতা মনুষ্যত্ব নয় এর মূল কারণ অবৈধ ইনকাম যা অপচয় অপব্যয়ের সুযোগ তৈরী করে তাই সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো অবৈধ ইনকামের পথ বন্ধ করে বৈধ পথে আয় রোজগারের পথ সুগম করে দেওয়া। “অপব্যয়-অপচয় করিও না, নিশ্চয় যারা বেহুদা খরচ করে তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রভূর সঙ্গে বিদ্রোহকারী”। “বনী আদম পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে কিয়ামতের দিন পা নাড়াতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে তা কোথায় ব্যয় করেছে, তার যৌবনকাল- তা কোন কাজে লাগিয়েছে, তার মাল সম্পর্কে সে এগুলো কোথা হতে আয় করেছে, কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার জ্ঞাত বিষয়ের কতটুকু আমল করেছে। অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ব্যয় ও সম্পদ বিনষ্ট করা হলো অপচয়। এক কথায় আয়-ব্যয়, সঞ্চয় সবই হবে আল্লাহর ইচ্ছায়।
৫ নং শিক্ষা : কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি আত্মীয় স্বজন, মিসকিন ও সম্বলহীনকে হাদিয়া বা দান স্বরূপ কিছু দিতে না পারলেও তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। দান করা সম্ভব না হলে উত্তম কথা বলে তাদেরকে বিদায় দিতে হবে। গরীব অসহায়কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যতার সাথে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
৬ নং শিক্ষা : দানশীল আল্লাহর নিকটবর্তী, জান্নাতের নিকটবর্তী, মানুয়ের নিকটবর্তী, আর কৃপণ আল্লাহ হতে দূরে, জান্নাত হতে দূরে, মানুষ হতে দূরে, জাহান্নামের নিকটবর্তী। যে সব লোককে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহদানে ধন্য করেছেন, অথচ তৎসত্ত্বেও তারা কৃপণতা করে, তারা যেন এ কৃপণতাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে না করে। বরং ইহা তাদের জন্য খুবই অকল্যাণকর। তারা কৃপণতা করে যা কিছু সঞ্চয় করেছে কিয়ামতের দিন উহাই তাদেও গলার বেড়ি হয়ে দাঁড়াবে। মূর্খ দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকট কৃপণ আবেদ ব্যক্তির চেয়ে অধিক প্রিয়। রাসুল (সা.) বলেছেন প্রতারক, কৃপণ ও খোটা দানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। বর্তমানে সমাজে অনেক সম্পদশালী ধনী ব্যক্তিরা আছেন যারা দান খয়রাত করেন না। আবার অনেকে কাফনের কাপড় ক্রয় করার জন্য ভিক্ষা করে। সম্পদশালী ধনী ব্যক্তির উচিৎ সমাজের অসহায় ব্যক্তিকে ও আল্লাহর রাস্তায় দান করে সমাজ থেকে দ্রারিদ্রতা দূর করা।
৭ নং শিক্ষা : “নিজেদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের আশংকায় হত্যা কর না। আমি তাদেরকে রিযিক দেব এবং তোমাদেরকেও। বস্তুতই তাদেরকে হত্যা করা একটি মস্ত বড় অন্যায়”। জাহিলীয়াতের সময় মেয়ে সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া হত। ইহা মারাত্মক অপরাধ। সন্তান হত্যা করলে বংশবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হয়। রিযিক দেয়ার ক্ষমতা মানুষের হাতে নয় বরং তা আল্লাহ তা’য়ালার হাতে নিবদ্ধ যিনি তোমাকে খাওয়াচ্ছেন, তোমার পূর্বের লোকদের খাইয়েছেন এবং পরবর্তী লোকদেরও ঠিক তিঁনি খাওয়াবেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা যিনি নিজের ব্যাপারে ঘোষণা করেছেন-“নিশ্চয়ই আল্লাহই তো রিযিকদাতা, শক্তির আধার এবং পরাক্রমশীল। আমাদের উচিৎ সন্তান হত্যা না করে বংশ বিস্তার করা।
৮ নং শিক্ষা : “যিনা ব্যভিচারের নিকটেও যাবে না। নিশ্চয়ই ইহা অত্যন্ত খারাপ কাজ ও অতীব নিকৃষ্ট পথ”-এর ফলে সমাজে নানা ধরনের অনিয়ম দানা বাধেঁ দাম্পত্য জীবনে কলহ সৃষ্টি হয় পারিবারিক ব্যবস্থাপনা ভেংগে পড়ে, নারী জাতির সম্মান ক্ষুন্ন হয়।শুধু তাই নয় ফ্রি সেক্্র বা অবাধ যৌনতার ফলে বংশ পরিচয় হারিয়ে যায় ফলে পারিবারিক ছিন্ন হয় এবং বৃদ্ধকালে বৃদ্ধাশ্রমে অমানবিক জীবন নিয়ে ঘৃণার সহিত বিদায় নিতে হয় তাই এ জাতীয় অপরাধ হতে সমাজকে রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব।
৯ নং শিক্ষা : “শরীয়তের সিদ্ধান্ত ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে হত্যা কর না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। হত্যা, গুম খুনাখুনি, ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম এমন কি অন্যায়ভাবে গাছের একটি ডালা ভেংগে ফেলতে ইসলাম নিষেধ করেছে। তাই হত্যা গুম রাহাজানি ইত্যাদি বন্ধে যে কোন শ্রেণী পেশার মানুষকে এগিয়ে আসা উচিত এবং এ সব অপকর্ম বন্ধে সরকার কে সকলের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা দরকার।
১০ নং শিক্ষা : “ইয়াতিমের ধন-মালের কাছেও যেও না, তবে অতি উত্তম পন্থায়। ইয়াতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে এর নিকটবর্তী হওয়া ও ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ। আর এতে কোনরূপ অন্যায় হস্তক্ষেপ কবিরা গুনাহ।
১১ নং শিক্ষা : “তোমরা ওয়াদা পূরণ করবে। নিঃসন্দেহে ওয়াদা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। ওয়াদা মৌখিক হোক কিংবা লিখিত, ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক বা রাজনৈতিক, তা পূরণ করা ঈমানী দায়িত্ব। এর ব্যতিক্রম মুনাফিকি। মুনাফিকের আলামত তিনটি। যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ কওে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে। ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের উচিৎ ওয়াদা পালন করা।
১২ নং শিক্ষা : “তোমরা পাত্র দ্বারা মাপ করলে ভর্তি করে দিবে এবং ওজন করে দিলে ত্রুটিহীন পাল্লা দ্বারা ওজন করে দিবে”। মাপে কিংবা ওজনে কম দিলে একদিকে যেমন অপরকে ধোঁকা দেয়া হয়, অপর দিকে এই উপার্জনটা ও সম্পূর্ণ অবৈধ। এর মাধ্যমে নিজের সততা লোপ পায় এবং প্রতিপক্ষের উপর সাংঘাতিক রকমের জুলুম করা হয়।
১৩ নং শিক্ষা : “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছনে লেগে যেওনা। নিশ্চয়ই চক্ষু, কর্ণ ও অন্ত:করণ সব কিছুর ব্যাপারেই জবাব দিতে হবে”। অর্থাৎ না জেনে কোন বিষয়ে কথা বলবে না। গুজব ছড়ানো, মিথ্যা সাক্ষী দেয়া, অনুমানভিত্তিক প্রচারণা, ঘটনার রূপ বিকৃত করা ইত্যাদি ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষেধ। বরং ইসলামের নির্দেশ
১৪ নং শিক্ষা : “জমিনের বুকে বাহাদুরি করে চলবে না। তোমরা না জমিনকে দীর্ণ করতে পারবে, না পর্বতের ন্যায় উচ্চতা লাভ করতে পারবে”। “জমিনের উপর গর্বভরে চলো না, আল্লাহ আত্ম-অহংকারী দাম্ভিক মানুষদের ভালবাসেন না”। “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি অহংকার করে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন।
মিরাজের শিক্ষায় আরো কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যে গুলো বাস্তবায়ন হলে সমাজে শান্তি শৃংখলা ফিরে আসবে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো :
সুদ ও ঘুষ পরিহার করা : মি’রাজের রাত্রিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)কে জাহান্নামে সুদখোরদের ভয়াবহ অবস্থা দেখানো হয়েছিল। শিরক ও কুফুরীর পর জঘন্যতম গুনাহ সমূহের মধ্যে সুদ সবার শীর্ষে। হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে বকেয়া আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। আর যদি পরিত্যাগ না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। সুদের মত এ জঘন্য পাপ থেকে বেঁচে থাকা মি’রাজে বিশ্বাসী প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির একান্ত কর্তব্য।
যাকাত আদায় করা : যাকাত ইসলামের মুল ভিত্তি সমূহের অন্যতম। আল্লাহ তা’য়ালা যতবার কুরআনে নামাজের কথা বলেছেন প্রায় সকল জায়গায় একত্রে যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন।যাকাত ইসলামের মৌলিক বিষয় অথচ রাষ্ট্রিয়ভাবে যাকাত আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এ দেশে বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা যাকাত আদায় সম্ভব, যা দ্বারা বেকারত্ব দূর করা সম্ভব।
আল্লাহর পথে জিহাদ করা : আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাই হলো জিহাদ বা সাধনা। হত্যা, খুন ইত্যাদি জিহাদ নয় বরং অন্যায়ভাবে একটি পিপঁড়া মেরে ফেলা ইসলামে নিষিদ্ধ। মানুষ কে অন্যায় অপরাধ মূলক কাজ হতে ভাল কাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, সাধনা দাওয়াত সবই জিহাদ। যেমন কেহ ফেনসিডিল সেবন করে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, তাকে ঐ কাজ হতে ফিরিয়ে আনার সরকারী, বেসরকারী ব্যক্তিগত সকল প্রকার চেষ্টাই হচ্ছে জিহাদ। অতি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের উপর নানা অজুহাতে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে তা প্রতিহত করার জন্য বিশ্বমানবতা মনুষ্যত্বের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে পড়েছে।
আমানতের খেয়ানত না করা : আমানতের হেফাযত করা ঈমানের পরিচায়ক আর আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকরে লক্ষণ। “মুনাফিকের আলামত তিনটি, যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে লঙ্ঘন করে এবং আমানতের খেয়ানত করে”। আমানত হলো কোন বস্তু কারো নিকট নিরাপদ মনে করে গচ্ছিত রাখা। স্কুলেরছাত্র শিক্ষকের নিকট আমানত, দোকানের মালিকের সম্পদ ম্যানেজারের নিকট আমানত, মালিকের বাস, ট্রাক চালকের কাছে আমানত, ব্যাংকের গ্রাহকের ডিপোজিট ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিকট আমানত, বর্ডার পাহারায় যারা নিয়োজিত দেশের সম্পদ তাদের নিকট আমানত। স্বামীর সম্পদ স্ত্রীর কাছে আমানতস্বরূপ তদ্রুপ রাষ্ট্রীয় সম্পদ সরকার প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট আমানত যার হেফাজত করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
উল্লেখিত বিষয়গুলো নিজেদের জীবনে পালন করা সমাজে বাস্তবায়নে একে অপরকে সহযোগিতা করা দরকার। তবেই আমাদের জীবনে মি’রাজের সত্যিকারের শিক্ষা এর উপকারিতা আমরা ভোগ করতে পারব সমাজে শান্তি শৃংখলা ফিরে আসবে।
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার কলামিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক। e-mail: ofaroq12662@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ