বুধবার ০৩ জুন ২০২০
Online Edition

বিদ্যুতের দাম বাড়নোর ফলে জনগণের পকেট থেকে কাটা যাচ্ছে ২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : চলতি মাস থেকে বাড়তি মূল্যে বিদ্যুত কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। নুতন করে দাম বাড়নো ফলে তা চলতি মাস থেকেই কার্যকর হয়েছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরেক দফা বেড়েছে।
পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন- তিন ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের দাম আরেক দফা দাম বাড়নোর ফলে ভোক্তাদের প্রতি মাসে গুণতে হবে বাড়তি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৬ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ছয় টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে সাত টাকা ১৩ পয়সা। ফলে চলতি বছর বিদ্যুৎ বিল বাবদ জনগণের ব্যয় বাড়বে দুই হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ-সংক্রান্ত আদেশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর সারা দেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে সাত হাজার ১৩৫ কোটি ইউনিট। এতে গ্রাহকদের ব্যয় বাড়বে প্রায় দুই হাজার ৬২৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) গ্রাহকরা। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এ সংস্থার প্রতি ইউনিটে গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল ছয় টাকা ২৬ পয়সা। গতকাল থেকে তা বেড়ে হয়েছে ছয় টাকা ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ।
চলতি বছর আরইবির বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫৮১ কোটি ৯০ লাখ ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হলে সংস্থাটির গ্রাহকদের ব্যয় পড়ত ২২ হাজার ৪২২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে নতুন হার কার্যকরের ফলে তাদের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ২৩ হাজার ৫৬৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু আরইবির গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়বে এক হাজার ১৪৬ কোটি ২১ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিক থেকে এর পর রয়েছে যথাক্রমে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ঢাকা (ঢাকা শহর ব্যতীত) ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এ সংস্থার প্রতি ইউনিটে গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল সাত টাকা ১৫ পয়সা। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে সাত টাকা ৫৬ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
চলতি বছর পিডিবির বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে এক হাজার ২৫১ কোটি ১০ লাখ ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সংস্থাটির গ্রাহকদের ব্যয় হতো আট হাজার ৯৪৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। নতুন হার কার্যকরের ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ৯ হাজার ৪৬১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০২০ সালে পিডিবির গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়বে ৫১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।
সূত্রমতে, ঢাকা শহরের দক্ষিণাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল সাত টাকা ৬৩ পয়সা। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে আট টাকা আট পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।
চলতি বছর ডিপিডিসির বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৬৬ কোটি ৯০ লাখ ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সংস্থাটির গ্রাহকদের এ খাতে ব্যয় হতো সাত হাজার ৩৭৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে নতুন হার কার্যকরের ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে সাত হাজার ৮১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি বছর ডিপিডিসির গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়ছে ৪৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এদিকে ঢাকা শহরের উত্তরাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। এ সংস্থাটির গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল সাত টাকা ৬৩ পয়সা। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে আট টাকা সাত পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
চলতি বছর ডেসকোর বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সংস্থাটির গ্রাহকদের এ খাতে ব্যয় হতো চার হাজার ৩৮৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে নতুন হার কার্যকরের ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে চার হাজার ৩৮৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি বছর ডেসকোর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়ছে ২৫২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
দেশের উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। সংস্থাটির গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল ছয় টাকা ৬২ পয়সা। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে ছয় টাকা ৯৮ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
চলতি বছর নেসকোর বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৯৮ কোটি ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সংস্থাটির গ্রাহকদের এ খাতে ব্যয় হতো দুই হাজার ৬৩৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। তবে নতুন হার কার্যকরের ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে দ্ইু হাজার ৭৭৮ কোটি চার লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি বছর নেসকোর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়ছে ১৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
এদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। সংস্থাটির গড় বিদ্যুৎ বিল ছিল ছয় টাকা ৮৫ পয়সা। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে সাত টাকা ২২ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল গড়ে বেড়েছে ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।
চলতি বছর ওজোপাডিকোর বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৬১ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট। আগের হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সংস্থাটির গ্রাহকদের এ খাতে ব্যয় হতো দুই হাজার ৪৭৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে নতুন হার কার্যকরের ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে দ্ইু হাজার ৬১২ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি বছর ওজোপাডিকোর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বাড়ছে ১৩৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
উল্লেখ্য, খুচরা পর্যায়ের পাশাপাশি পাইকারি (বাল্ক) বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রতি ইউনিটে ৪০ পয়সা বা ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এর পরও বাল্ক খাতে প্রতি ইউনিটে পিডিবির ঘাটতি রয়ে গেছে ৪৭ পয়সা। এ ঘাটতি পোষাতে সরকারকে বিদ্যুৎ খাতে চলতি বছর তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
এদিকে বিদ্যুতের দামের বিরোধিতা করে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ।
জনগণের ‘পকেট কাটতেই’ সরকার বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়িয়েছে মন্তব্য করে এর বিরুদ্ধে ‘গণপ্রতিরোধ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  ‘গণমানুষ, ভোক্তা অধিকার কিংবা ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর যুক্তি-অনুরোধ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সরকার যখন মন চাচ্ছে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে। আওয়ামী সিন্ডিকেটের মুনাফার জন্যই তারা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বাণিজ্যের মন্দা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর পতনের মধ্যেই দেশে সব পর্যায়ে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য বাড়ানোর একমাত্র কারণ হলো লুটপাট। এ দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রাহকদের পকেট থেকে বছরে দুই হাজার কোটি টাকা লুটে নেবে আওয়ামী সিন্ডিকেট।’
তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ-পানির সামান্য মূল্য বৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি হবে না। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের জন্য বিদ্যুৎ-পানির দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সামান্য মূল্য বৃদ্ধিতে জনগণের ভোগান্তি হবে না।’
সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে। কারণ, সরকার বিদ্যুতে যেমন ভর্তুকি দিচ্ছে, পানিতেও সেরকম ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মুজিববর্ষে আমরা শতভাগ বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাতে চাই। সামনে গরমের মৌসুম, লোকজন যেন কষ্ট না পায়, সেজন্য আমরা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন করতে চাই। একটু কষ্ট হলেও জনগণ এর সুবিধা পাবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ