বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রসঙ্গ মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস

মো. আবুল হোসাইন চৌধুরী : করোনা ভাইরাস এক ধরনের সংক্রামক ভাইরাস। যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯, সেই রোগটিকে এখন মহামারী ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনা ভাইরাস এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। বর্তমানে চীন ছাড়াও একশোরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে বিপুল আতঙ্ক তৈরি করেছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। গবেষকরা ধারণা করছেন বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাস বহু মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়তে পারে। অচেনা হওয়ার কারণে যার কোনো প্রতিষেধকও এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।
মহামারী মূলত আল্লাহর গজব। মারাত্মক মরণব্যাধি এ করোনা ভাইরাস/মহামারী থেকে বাঁচতে দেড় হাজার বছর আগে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উপদেশ দিয়ে গেছেন। তার অনুসরণ করাই সবার জন্য জরুরি।
মানুষ ব্যাপকহারে আল্লাহ তা’আলার অবাধ্য হলে আল্লাহ পাক পৃথিবীতে গজব নাজিল করেন : যাতে মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পেরে তাওবার মাধ্যমে আবার ফিরে আসতে পারে। এই গজব বা মহামারী আসলে তখন করণীয় কী? ইসলামে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। যে কোন মহামারী থেকে বাঁচতে প্রথম ও প্রধান করণীয় হচ্ছে- নিজেদের কৃতকর্ম থেকে তাওবা করা এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার করা। এই মুহূর্তে আমাদের সবার উচিত, মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা। সর্বদা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকা। কারণ, কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর একটি হলো মহামারী।
করোনা ভাইরাস এক অজানা আতঙ্ক। রাসূলে আরাবি মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন অন্যায়, জুলুম ও অশ্লীলতার কারণে আল্লাহ তা’আলা জালেম ও অন্যায়কারীদের ওপর অপরিচিত মহামারী চাপিয়ে দেন। হাদীসে এসেছে-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৪০১৯)।
পাপাচারের শাস্তি হিসেবে অতীতেও আল্লাহ তা’আলা মহামারী দিয়েছেন। অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করেছেন। দাউদ (আ:)-এর যুগের একটি ঘটনা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তুমি কি তাদের দেখোনি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি ত্যাগ করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের বলেছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হোক। তারপর আল্লাহ তাদের জীবিত করেন।...’ (বাকারা : ২৪৩) তাফসীর ইবনে কাসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা সংখ্যায় ছিল চার হাজার। মহামারীর ভয়ে পালিয়ে ছিল। তারা বলেছিল, আমরা এমন ভূমিতে যাব যেখানে মৃত্যু নেই। তারপর তারা এক স্থানে একত্র হলে আল্লাহ তাদের ওপর মৃত্যুর ফরমান জারি করেন।’
মহামারী প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি, বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারী। অতএব, কোথাও মহামারী দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিযী : ১০৬৫)।
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে বা অঞ্চলে যদি কোনে প্রকার প্লেগ বা মহামারী জাতীয় সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে তোমরা যারা (ওই অঞ্চলের) বাহিরে আছ তারা ওই শহরে প্রবেশ করো না। আর যে শহরে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তোমরা যদি সে শহরে বসবাস করো তবে তোমরা সে অঞ্চল বা শহর থেকে বাহির হয়ো না।’ (বুখারী ও মুসলিম)
এ ছাড়া রাসূল (সা.) মহামারী থেকে বাঁচতে বেশি বেশি এই দোয়া পড়তে বলেছেন : “আল্লাহুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনুনী ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সাইয়্যি ইল আসক্বাম।” অর্থ : হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট ধবল, কুষ্ঠ এবং উন্মাদনাসহ সব ধরনের কঠিন দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে পানাহ চাই। (আবু দাউদ ও তিরমিযী)
অন্য হাদীসে এরশাদ হয়েছে, ‘উসমান বিন আফ্ফান (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি ৩ বার বলবে : ‘বিস্মিল্লা-হিল্লাযী লা ইয়াদ্বুররু মা‘আ ইস্মিহী শাইউন ফিল্ আরদ্বি ওয়ালা ফিস্ সামা-ই, ওয়াহুয়াস্ সামী‘উল ‘আলীম’। অর্থ : আল্লাহর নামে (সকল অনিষ্ট থেকে সাহায্য চাই), যার নাম (স্মরণের) সাথে আসমান ও যমীনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি  সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী সে ব্যক্তি সকাল পর্যন্ত কোন আচমকা বিপদে আক্রান্ত হবে না। যে ব্যক্তি সকাল বেলা এ বাণীগুলো ৩ বার পড়বেন সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তি কোন আচমকা বিপদে আক্রান্ত হবেন না।” (আবু দাউদ : ৫০৮৮)
এ ছাড়াও সূরা ফাতেহা, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দুইহাতে ফু দিয়ে হাত দ্বারা সব শরীর মাছেহ করা যেতে পারে।
করোনা ভাইরাস এর লক্ষণগুলো কী কী :
১. সর্দি, ২. কাশি, ৩. জ্বর, ৪. মাথা ব্যথা, ৫. গলা ব্যথা, ৬. মারাত্মক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ৭. শিশু, বৃদ্ধ ও কম রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস।
করোনা ভাইরাস যেভাবে সংক্রমিত
হতে পারে :
১.    আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে।
২.    আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বা মিলামেশা করলে।
৩.    অসুস্থ পশু-পাখির মাধ্যমে।
করোনাভাইরাসের প্রতিরোধের উপায় :
১. নিয়মিত ভাল করে সাবান-পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া। এক্ষেত্রে মেডিকেটেড হ্যান্ড-রাব ব্যবহার করা যেতে পারে।
২.    অপরিষ্কার হাতে অর্থাৎ হাত না ধোয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ না করা।
৩.    সর্দি-কাশি, জ্বর বা অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখা।
৪.  হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় নাক, মুখ ঢেকে রাখা।
৫.    অসুস্থ হলে ঘরে থাকা, অত্যাবশ্যক হলে ঘরের বাইরে যেতে মাস্ক ব্যবহার করা।
৬.    ঠাণ্ডা বা ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে না মেশা।
৭.    মাছ, মাংস ও ডিম খুব ভালোভাবে রান্না করা।
৮.    বন্য জীবজন্তু কিংবা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ না করা।
৯.    মুখে মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহসহ পুরো মানবজাতিকে দুনিয়ার সব অপরিচিত রোগব্যাধি থেকে হিফাজত করতে অন্যায় জুলুম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ