বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা ভাইরাস প্রয়োজন আরও সতর্কতা

আসিফ আরসালান : দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত তিন ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন পুরুষ ও একজন নারী। আক্রান্ত দুই পুরুষ ইটালি ফেরত। এক পুরুষের পরিবারের সদস্য ঐ নারী। তাঁদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর। তিনজনেরই অবস্থা স্থিতিশীল ছিলো। গত শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রতিদিনের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।
আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, আক্রান্ত তিন জনের কোভিড-১৯ রোগের মৃদু উপসর্গ ছিল। একজনের জ¦র ও একজনের কাশি রয়েছে। আর অন্যজনের জ¦র ও কাশি দু’টোই ছিলো। তাঁদের লক্ষণ ও উপসর্গ নির্ভর চিকিৎসা চলছিলো। বিশেষ কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়নি। এরই মধ্যে তাদের সুস্থতার খবর জানা গেছে। এই তিন জন ছাড়াও তাদের সংস্পর্শে আসা আরো দু’জনকে কোয়ারেন্টাইন (সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে আলাদা রাখা) করে রাখা হয়েছিলো।
আক্রান্ত দুই পুরুষ ইতালিতেই থাকেন। সম্প্রতি তাঁরা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেন। তবে বিমানবন্দরে তাঁদের করোনা ভাইরাসের লক্ষণ ধরা পড়েনি। এর কারণ হিসাবে আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে আসার সময় তাঁদের লক্ষণ ছিল না। দেশে আসার পরে তাঁদের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। তখন তাঁরা আইইডিসিআরের হট লাইনে যোগাযোগ করেন। তবে তাঁরা কবে দেশে ফিরেছেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে চাননি আইইডিসিআরের পরিচালক। আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ না করতে অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের যেন সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন না হতে হয়।
বাংলাদেশে যে তিন জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন সে খবর আমি আপনি সকলেই জানি। আমরা এও জানি যে ঐ তিনজনের মধ্যে দুই জন সুস্থ হয়েছেন এবং এদের দুইজনের মধ্যে একজন ইতোমধ্যেই বাড়ি ফিরে গেছেন। দ্বিতীয় জনও দু একদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরবেন বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছেন। এসম্পর্কে শুক্রবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, গত রোববার ইতালি ফেরত দু’জনসহ তিন করোনা আক্রান্তের তথ্য দেয় আইইডিসিআর। এরই মধ্যে তাদের দু’জন সুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক।
সুস্থদের একজন বাড়ি ফিরে গেছেন। আরেকজন সুস্থ তাকেও শিগগিরই ছাড়া হবে বলে জানান ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা। করোনা আক্রান্ত আরেকজনের অবস্থা স্থিতিশীল।
আগেই বলেছি যে এসব খবর সব মানুষই জানে। কিন্তু তার পরেও আমরা সেই খবর রিপিট করলাম কেন? কারণ হচ্ছে তাদের আক্রান্ত হওয়া এবং সুস্থ হওয়ার সমগ্র বিষয়টি দারুণ অস্পষ্টতায় ঘেরা। এই তিন ব্যক্তি কারা? তাদের নাম ধাম কি? এদের দুইজন নাকি ইতালি থেকে এসেছেন। কবে ইতালি থেকে এসেছেন? বিমানবন্দরে তাদেরকে ইমিগ্রেশন আটকে দেয়নি কেন? তারা যে ইতালি থেকে এসেছেন সেটি তো তাদের পাসপোর্টেই উল্লেখ ছিল। তারপরেও তারা ইমিগ্রেশনের এরিয়া পার হয়ে গেলেন কীভাবে? পার হয়ে তারা কোথায় গেলেন? ঢাকায় না অন্য কোনো জেলায়? নাকি গ্রামে? কোন জেলা? কোন উপজেলা? কোন গ্রাম? এসবের কিছুই বলা হয়নি? কেন বলা হয়নি? মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ না করতে অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ, তাদের পরিবারের সদস্যদের যেন সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন না হতে হয়।
অদ্ভুত যুক্তি সেব্রিনা ফ্লোরার। যেখানে স্পেনের রানী আক্রান্ত হন এবং তাদের পরিচয় নিজেরাই প্রকাশ করে দেন সেখানে ঐ তিন ব্যক্তির সম্মান কি একটি দেশের রানীর চেয়েও বড় হয়ে গেল? স্পেনের রানীর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ দেখুন। খবরটি গত শনিবার বেরিয়েছে। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন স্পেনের রানি লেতিজিয়া। স্পেন সরকারের এক মন্ত্রীও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, ওই মন্ত্রীর সংস্পর্শে এসেই করোনায় আক্রান্ত হন রানি। কেননা, সম্প্রতি রানি লেতিজিয়া ওই মন্ত্রীর গালে চুমু খেয়েছিলেন।
॥ দুই॥
ইংল্যান্ডের মতো অত্যন্ত উন্নত দেশে যেখানে করোনা ভাইরাসে ১০ হাজার ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন বলে স্বয়ং ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সেখানে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আমরা চাই আল্লাহ যেন আক্রান্তের সংখ্যা তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। তবে বাংলাদেশের মতো বিশেষ করে ঢাকার মতো এত ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এটি ভাবতে একদিকে যেমন আনন্দ হয় অন্যদিকে তেমনি সংশয়ও হয়। স্পেন এবং ইংল্যান্ড সম্পর্কে গতকাল শনিবার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে সেটি নিম্নরূপ :
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন আর্সেনালের স্প্যানিশ কোচ মাইকেল আর্তেতা। স্থগিত হয়ে গেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে আগামী শনিবারের আর্সেনাল-ব্রাইটন ম্যাচ। স্বেচ্ছা-আইসোলেশনে থাকবেন মাইকেল আর্তেতার সংস্পর্শে আসা ক্লাবের স্টাফরা।
ব্রিটেনে ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে (কভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এমনটা জানিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি জনগণের প্রতি পরিবারের সদস্যদের অকাল মৃত্যুর ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। এখানে স্বস্তির সংবাদ এই যে, দক্ষিণ এশিয়া দেশসমূহ যথা- ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় আক্রান্তের সংখ্যা যেমন কম তেমনি মৃতের সংখ্যাও বলতে গেলে শূন্য (শুধুমাত্র ভারতে ১)।
করোনা ভাইরাস প্রাণঘাতী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এইডসও প্রাণঘাতী। কিন্তু এমন নোংরা ও গর্হিত কাজ থেকে এইডসের জন্ম হয় যে মানুষ লজ্জায় একথা প্রকাশ করতে পারে না। সেই ব্যক্তি নিজেই বা তার কোনো নিকটাত্মীয় সেই কথা প্রকাশ করতে লজ্জা বোধ করেন। তারপরেও পৃথিবী বিখ্যাত মার্কিন অভিনেতা মার্লোন ব্রান্ডো এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। Mutiny on the bounty নামের সিনেমা করে মার্লোন ব্রান্ডো সারা দুনিয়াব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর আর একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি The Godfather এ অভিনয় করেও তিনি তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এ হেন জগদ্বিখ্যাত অভিনেতা যে এইডসে আক্রান্ত হয়েছিলেন সেটি যদি প্রকাশ পায় তা হলে বাংলাদেশের ইতালি ফেরত দুই ব্যক্তির করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরে তাদের সামাজিক সম্মান কেমন করে হেয় হয়, সেটি মানুষ বুঝতে অক্ষম।
মিসেস সেব্রিনা ফ্লোরা এবং তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবগতির জন্য গত শুক্রবার দৈনিক ‘প্রথম আলো’র ১৩ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সংবাদের শিরোনাম, “আমরা করোনায় আক্রান্ত”। সংবাদে বলা হয়েছে, “অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলেন হলিউড তারকা টম হ্যাঙ্কস ও তাঁর স্ত্রী রিটা উইলসন। অস্ট্রেলিয়া থেকেই টুইটার ও ইনস্ট্রাগ্রামে একটি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুবার অস্কারজয়ী এই হলিউড তারকা।”
ইনস্টাগ্রামে ৬৩ বছর বয়সী টম হ্যাঙ্কস জানান, তাঁদের দুজনেরই একটু ক্লান্ত লাগছিল। ঠাণ্ডা লেগেছিল। শরীরে ব্যাথাও ছিল। মাঝে মধ্যেই রিটার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেত। আবার কিছুক্ষণ পর চলেও যেত। এরকম ক্ষেত্রে বিশে^র অন্য কেউ হলে যা করতেন, তিনিও তাই করেছেন। শরীরে করোনা ভাইরাস আছে কি না, তা পরীক্ষা করিয়েছেন। আর লিখেছেন, ‘পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, আমরা উভয়েই করোনায় আক্রান্ত। প্রথম দিনে এর চেয়ে আর বেশি কি বলব? আমাদের কী হালনাগাদ, তা জানাতে থাকবো।’
ব্যাচেলর পার্টি, বিগ, ফরেস্ট গাম্প- প্রভৃতি সিনেমার মাধ্যমে তিনি নিজেকে বড় পর্দার তারকাদের আকাশে ধ্রুবতারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মার্কিন সংগীত শিল্পী ও অভিনেতা এলভ্সি প্রিসলির বায়োপিকের শুটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন এই অভিনেতা। টম হ্যাঙ্কস এর চেয়েও কি বেশি সম্মানী হয়ে গেলেন বাংলাদেশের ঐ দুই ইতালি ফেরত ব্যক্তি? কাকে কি বোঝাচ্ছেন সেব্রিনা ফ্লোরা এবং তার হায়ার অথোরিটি?
॥তিন॥
শুক্রবার ১৩ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে মাত্র ৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩ জনই সুস্থ হয়েছেন। এটি খুশির খবর, তাতে সন্দেহ নেই। তাই বলে এখানে আত্ম তুষ্টির কিছু নেই। গণচীন সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চীন সরকার যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন সেই রকম ব্যবস্থা যদি পৃথিবীর অন্যান্য দেশ গ্রহণ না করে তাহলে এই রোগ অন্তত পক্ষে জুন পর্যন্ত স্থায়ী হবে। যারা মনে করেন যে, গরম পড়লেই এই ভাইরাস মরে যাবে তারা ভুল করছেন। যেহেতু সবচেয়ে বেশি করে আক্রান্ত চীন এবং সবচেয়ে বেশি সাফার করেছে তারা এবং সবচেয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা, তাই তাদের কথায় আমাদের আস্থা স্থাপন করতে হবে। একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এবারের করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতি Epidemic আকারে নয়, Pandemic আকারে। Epidemic হলো মহামারী, কিন্তু সেটি একটি এলাকা, দেশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। অতীতে আমরা কলেরা, প্লেগ, যক্ষ্মা প্রভৃতি দেখেছি। এগুলো অবিভক্ত ভারতের অথবা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ অথবা একটি প্রদেশের একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু Pandemic দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী মানে না। এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এবার আমরা দেখছি বর্তমানে পৃথিবীর ১৯৭টি দেশের মধ্যে ১৩২টি দেশেই করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র ৬৫টি দেশে এই কলাম লেখা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েনি। রাব্বুল আল আমিনের কাছে আমাদের মোনাজাত, আর যেনো না ছড়ায়। কিন্তু কে জানে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই ১৩২ সংখ্যাটি আরো বৃদ্ধি পাবে না?
এতদিন পর্যন্ত সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিল চীন। তারপরেই দক্ষিণ কোরিয়া, তার পর ইরান এবং ইতালি। কিন্তু হঠাৎ করে ভয়াবহতার দিক দিয়ে ইতালি ২ নম্বরে এসেছে। শুক্রবার বিকেলে জাতিসংঘের ওয়েব সাইটে দেখা গেল যে ইতালিতে এই মুহূর্তে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫১১৩ জন এবং মোট মৃতের সংখ্যা ১০১৬ জন। বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং আমাদের স্বাস্থ্য সেবাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অপ্রতুল। সুতরাং বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সময় সময় যেসব নির্দেশ এবং পরামর্শ দিচ্ছে সেগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ বিপদ আসন্ন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ