মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ট্রাম্পের ষড়যন্ত্রমূলক ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনার নানা দিক

১৪ মার্চ, পার্সটুডে : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে দখলদার ইসরাইলের অনুকূলে একের পর এক নানা পদক্ষেপ নিয়েই চলেছেন যা কিনা নজিরবিহীন এবং পূর্ববর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট এতটা ধৃষ্টতা দেখাতে পারেননি। ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বিতর্কিত ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

দখলদার ইসরাইলের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়, সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের সঙ্গে একীভূত করা, ফিলিস্তিনিদেরকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়া, ইসরাইলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও ইউনেস্কো থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং সর্বশেষ জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের ৩০ শতাংশ ভূখণ্ডকে ইসরাইলে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা যায়। এর পাশাপাশি ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা ঘোষণার মাধ্যমে ইসরাইলের প্রতি ট্রাম্প সরকারের সর্বাত্মক সমর্থন দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হল। ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনা ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসরাইলের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করা, ইসরাইলকে নজিরবিহীন সেবা প্রদান, পাঁচ হাজার কোটি ডলার সাহায্য দেয়ার বিনিময়ে নামমাত্র অতি ক্ষুদ্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব মেনে নিতে ফিলিস্তিনিদেরকে রাজি করানো এবং এটাকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে আমেরিকায় আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের ফায়দা হাসিল করা ও মার্কিন ইহুদিদের সমর্থন লাভ, আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং সর্বোপরি পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে ওঠা ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত প্রায় দুই বছর ধরে ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করে আসছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার  উপদেষ্টা ও ইহুদি জামাতা জারেড কুশনারকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে গত বছর ২৪ ও ২৫ জুন বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অর্থের যোগান নিয়ে কথাবার্তা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত মানামা সম্মেলন ব্যর্থ হয় এবং ফিলিস্তিন স্বশাসন কর্তৃপক্ষসহ ফিলিস্তিনের অন্যান্য সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠন একযোগে ট্রাম্পের ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও ইহুদি জামাতা জারেড কুশনারও ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মানামায় অর্থনৈতিক সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বহু দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্মেলনে উপস্থিত হলেও তারা বলেছেন ফিলিস্তিনি নেতাদের উপস্থিতি ছাড়া এ সম্মেলন পূর্ণ হবে না।

জারেড কুশনার এও দাবি করেন, "'ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ৫ হাজার কোটি ডলার থেকে ২৮০০ কোটি ডলার জর্দান নদীর পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ দেয়া হবে।" তবে ফিলিস্তিনি নেতারা যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে না নেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত এ অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করা হবে না বলে কুশনার জানান।

প্রকৃতপক্ষে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা জারেড কুশনার ফিলিস্তিনি নেতাদেরকে আর্থিক সুবিধা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে ওই প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে ওই প্রস্তাবের বিরোধিতায় অটল রয়েছে। এ ব্যাপারে জারেড কুশনার বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিরা ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনার বিরোধিতা করলেও হোয়াইট হাউজের জন্য এখনো অনেক রাস্তা খোলা রয়েছে।'

মানামা সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর কুশনার ও তার সহযোগীরা পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে একের পর এক সফরের মাধ্যমে ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি'র পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন লাভের চেষ্টা করছেন।     

চূড়ান্ত ঘোষণা বেশ ক'বার পিছিয়ে দেয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২৮ জানুয়ারি ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ সবার সামনে তুলে ধরেন। এসব সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার পাশে ছিলেন। ইসরাইলকে সুরক্ষা দেয়া এ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করে ট্রাম্প ওই অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, তার পরিকল্পনা উগ্রপন্থা মোকাবেলায় ভূমিকা রাখবে। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়া সফরে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার ব্যাপারে সমবেদনা প্রকাশ করলেও তাদের দুর্দশার প্রধান কারণ যে ইসরাইল সে বিষয়টি তিনি বেমালুম চেপে যান।

'ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি'র ব্যাখ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য ৮০ পৃষ্ঠার এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি এ পরিকল্পনাকে সব পক্ষের জন্য বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছেন, এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এটি ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্পও এও বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন সরকার গঠনের বিষয়টি নির্ভর করছে তারা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কতখানি অবস্থান নিতে পেরেছে তার ওপর।

এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামি জিহাদ আন্দোলনের ইসরাইল বিরোধী তৎপরতার অবসান, ইসরাইল বিরোধী শ্লোগান বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনের শহীদ পরিবারদেরকে অর্থ সহায়তা দেয়া বন্ধ করার দাবি জানান।  ট্রাম্প বলেন, তার সহযোগীরা অর্থাৎ উপদেষ্টাগণ ও অন্যান্য কর্মকর্তারা যারা আশেপাশের রয়েছেন তারা সবাই ইসরাইলের ভক্ত। দখলদার ইসরাইলের প্রতি ট্রাম্প তার আনুগত্য ও আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি কখনো এমন কাজ করব না যা ইসরাইলের নিরাপত্তাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেবে। শান্তির জন্য ছাড় দিতে হয় কিন্তু আমি চাই না ইসরাইল শান্তির জন্য কোনো ছাড় দিক।'

বাস্তবতা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনার মাধ্যমে দখলদার ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে তেল আবিবকে খুশী করার জন্য বায়তুল মোকাদ্দাসে আমেরিকার দূতাবাস স্থানান্তর, গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়া, পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া ও ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা যায়।

'ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা ঘোষণা অনুষ্ঠানে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এ পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরাইলের জন্য তার অশেষ সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। নেতানিয়াহু দাবি করেন, এর আগে সম্পাদিত শান্তিচুক্তিগুলো ইসরাইলের অনুকূলে এতোটা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না এবং জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের ওপর ইসরাইলের কর্তৃত্বকেও স্বীকার করা হয়নি। তিনি ট্রাম্পকে তার সবচেয়ে ভাল বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ট্রাম্প কেবল মুখে নয় কাজে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরাইলের জন্য স্বীকৃতি আদায় এবং হামাস সংগঠন ও গাজা এলাকাকে নিরস্ত্র করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ফিলিস্তিন শরণার্থী সমস্যা বাইরে থেকেই সমাধান করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ