শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পরও শেয়ারবাজারের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পদক্ষেপের পরও শেয়ারবাজারের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। এত পদক্ষেপের পরও কেন বাজার পতনের ধারায়, তা বুঝতে পারছেন না শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরাও। একের পর এক ধসের কবলে পড়ছে শেয়ারবাজার। বড় ধরনের ধসে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। শেয়ারবাজারের এমন আচরণে উদ্বিগ্ন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ছলতি বছরের জানুয়ারিতে বড় ধসের পর পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ জাগাতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় ব্যাংকগুলোকে ‘বিশেষ তহবিল’ গঠনের সুযোগ দেওয়ার পর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। নিজস্ব উৎস অথবা ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঁচ শতাংশ সুদে এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো, যা পরিশোধের সময় পাবে পাঁচ বছর। আর ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ সাত শতাংশ সুদে এ তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এই সুবিধা দেয়ার ফলে শেয়ারবাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ৪ হাজার ৩৮৫ পয়েন্টে নেমে যাওয়া ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসএক্স হু হু করে বেড়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪ হাজার ৭৫৮ পয়েন্টে চলে আসে। অর্থাৎ পতন কাটিয়ে ১০ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ডিএসইর প্রধান সূচক বাড়ে ৩৭৩ পয়েন্ট। বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছিল। তবে এরপরেই ঘটে ছন্দপতন। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ১২ কার্যদিবসের মধ্যে ১০ কার্যদিবসেই দরপতন হয়েছে। এর মধ্যে বড় দরপতন হয়েছে একাধিক কার্যদিবসে। আর গতকাল রীতিমতো ধস নেমেছে। এদিন লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৯৭ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ২৮৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ২৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৪৩৫ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসইর শরিয়াহ্ সূচক ১৬ পয়েন্ট কমে ৯৯৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পরও বাজারের এই দরপতনে উদ্বিগ্ন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, জানুয়ারিতে বড় ধসের পর এক মাস যেতে না যেতেই কেন ফের বড় পতন হচ্ছে।
পতনের কারণ জানতে চাইলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি সাইদুর রহমান জানান, কিছুই বুঝতে পারছি না; এতো কিছুর পর কেন পতন হচ্ছে বাজারে? কোনা কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। কী বলবো, আমার কোনো মন্তব্য নেই।
বাজারের এই পতনকে স্বাভাবিক মনে করছেন কি না? উত্তরে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বাজারে যে বড় উত্থান হয়েছে তাও স্বাভাবিক না। এখন যে দরপনত হচ্ছে এটাও স্বাভাবিক না। সবাই যদি কোন ব্যাংক তহবিল গঠন করল, কোন ব্যাংক বিনিয়োগ করল এ নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে কিভাবে চলবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ তহবিলের সুযোগ দেয়া হলে বিএমবিএর পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে ওই সিদ্ধান্তকে পুঁজিবাজারের জন্য যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে আমরা এখনো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলছি। পাঁচ বছরের জন্য সুযোগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংক কখন এই সুযোগ নেবে সেটা ব্যাংকের বিষয়। কিন্তু সুযোগ যেটা দেয়া হয়েছে, সেটা অবশ্যই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
বাজার বিশ্লেষক ডিএসইর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, আমরা হতাশ। জানি না কী হচ্ছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল বাজার সংশোধন হচ্ছে। কিন্তু কেন এভাবে টানা পতন হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। বড় ধসের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজারের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও বড় পতন হচ্ছে। বিষয়টি পরিষ্কার না। 
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হলেও ব্যাংক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সেইভাবে বিনিয়োগে আসেনি। আবার যারা বিনিয়োগে আছে তারা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ না করে সবাই ট্রেডারের ভূমিকায় রয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক শেয়ারবাজারে।
গতকাল রোববার সবকটি মূল্যসূচকের পতনের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। দিনভর বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৩০৪টির। আর ১৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা বেড়েছে। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৪২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ৪১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে লেনদেন বেড়েছে ১৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে ভিএফএস থ্রেড ডাইংয়র শেয়ার। কোম্পানিটির ১৩ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্কয়ার ফার্মাসিটিক্যালের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। এছাড়া লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- খুলনা পাওয়ার, নাহি অ্যালুমিনিয়াম, ওরিয়ন ফার্মা, ওরিয়ন ইনফিউশন, মুন্নু জুট স্টাফলার্স, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ এবং জিনেক্স ইনফোসিস।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩০৫ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৯৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ৮ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৪৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৯৬টির এবং ১৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
শেয়ারবাজারের দরপতনের কারণ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান বলেন, সবাই এখন ট্রেডারের ভূমিকায় চলে গেছে। কেউ বিনিয়োগের জন্য আসছে না। শেয়ারের দাম একটু বাড়লেই বিক্রি করে দিচ্ছে। এ অবস্থা চললে বাজার ভালো হবে কি করে? এই বাজার ভালো করতে হলে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হলেও তার সুফল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিনিয়োগ করছে না। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। যার ফলে বাজারে দরপতন হচ্ছে। আর এ পতনের কবলে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি বলেন, বাজারে এখন যে দরপতন হচ্ছে তাকে কিছুতেই স্বাভাবিক বলা যায় না। আমাদের সন্দেহ পরিকল্পিতভাবে বাজারে দরপতন ঘটানো হচ্ছে। এর পিছনে কারা আছে তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
শেয়ারবাজারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী কিন্তু পুঁজিবাজার ঠনঠন, সেটাতো হতে পারে না। সুতরাং এর কারণগুলো বাজার সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে হবে। সরকার সমাধান করে দেবে না। সরকার পুঁজিবাজার সমাধান করতে পারে না। তবে পুঁজিবাজারের সমস্যা সমাধানে সব ধরনের সহযোগিতা সরকার করবে। সমাধানের পথ তৈরি করুন। আমরা সমাধান দেখতে চাই। সমাধান আপনার হাত দিয়েই সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের কাজ হবে পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করার জন্য এ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। দেশের সামস্টিক অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে তার রিফ্লেকশন যাবে পুঁজিবাজারে। এটা ডাইরেক্ট লিংক। তারপরও অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী কিন্তু পুঁজিবাজার ঠনঠন, সেটাতো হতে পারে না। কেননা  সরকার অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করলো এর রিফ্লেকশনটা পড়ে পুঁজিবাজারে। এটা একেবারে ডাইরেক্ট প্রতিবিম্ব, আয়না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ