ঢাকা, শনিবার 8 August 2020, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

কারণ ছাড়াই বাড়ছে চালের দাম

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। পর্যাপ্ত চালের সরবরাহও আছে। তারপরও বাজারে দফায় দফায় বাড়ছে চালের দাম।গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) তাদের দৈনন্দিন খুচরা বাজারদরের প্রতিবেদনে চালের দাম বাড়ার তথ্য তুলে ধরেছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজারে সরু চালের মধ্যে মানভেদে নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা মানভেদে ৪৪ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। যা গত সপ্তাহে কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা কমে বিক্রি হয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—কেন বাড়ছে চালের দাম? খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। ফলে খুচরা ও পাইকারিতে দাম না বাড়িয়ে তাদের উপায় নেই। তবে চালকল মালিকদের দাবি, আমন মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন ধানের দাম চড়া। তাই চালের দাম বেড়েছে। এছাড়া ভোক্তারা এখন সরু চালের দিকে ঝুঁকছে। তাই সরু চালের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের কৃষকরা এখনো মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা চাষাবাদে বেশি আগ্রহী। এ কারণে সরু চালের সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বাড়ছে। মিলাররা বলছে, এখন সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আমন ধান-চাল সংগ্রহ করছে। এর প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চালের দাম বাড়াতে মিলারদের অজুহাতের অভাব হয় না। আমন মৌসুমের শুরুতে প্রান্তিক কৃষকরা অনেক কম দামে ধান বিক্রি করলেও তখন তারা চালের দাম কমায়নি। অর্থাৎ তাদের কাছে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তি থাকলেও কমানোর ক্ষেত্রে নেই। বর্তমানে দেশের হাটবাজারগুলোতে ধান-চালের ব্যাপক সরবরাহ। তার পরেও দাম বাড়ায় বিস্মিত মানুষ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মাত্র ১০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করছে। যা মোট উৎপাদনের তুলনায় খুবই কম। তাই চালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের যে কথা বলা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই ঠিক নয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ ১৬ হাজার ৭১০ টন চালের বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৪৪ লাখ টন।

সরকার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত মাসে সাতটি মনিটরিং টিম গঠন করলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে এই টিম কী কাজ করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ মজুমদার বারবার বলছেন, কেউ কারসাজি করে চালের বাজার অস্থিতিশীল করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারসাজির সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে পারেনি মনিটরিং টিম।

এ পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্য কিনতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভোক্তারা। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তদের আয়ের সব টাকা চলে যাচ্ছে খাওয়া খরচে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের প্রশ্ন, চাল তো চীন থেকে আমদানি করতে হয় না। তাই চালের বাজারে করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়ার কথা নয়। তারপরও কেন বাড়ছে? চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিল মালিকদেরকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো সেই শক্তিশালী কারসাজি চক্রই এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অধরাই থেকে গেছে চক্রটি। সরকারি নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় পণ্যের দাম বাড়ায় বলে তারা মনে করেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তরা বলেন, কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেয়ার জন্য সরকার চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে রপ্তানির অনুমতি সচল রাখা সঠিক হবে না। তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চাল রপ্তানির অনুমতি না দিতে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবে, গত এক মাসে শুধু সরু চালের দামই ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। সরু চালের কেজি ৫০ থেকে বেড়ে ৫৫ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। মোটা চালের দাম ৩০ থেকে ৩২ টাকা ছিল এক মাস আগে। তা বেড়ে এখন ৩৫ টাকা হয়েছে। অন্যান্য চালের দামও কমবেশি বেড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন চাল মজুত আছে।

এদিকে কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও দিনাজপুরে ধান-চালের দাম পাইকারি বাজারে প্রতি সপ্তাহে বাড়ছে। কুষ্টিয়ার মোকামে মিনিকেট চালের দাম আবার বাড়ছে। ইতিমধ্যে গত দুই সপ্তাহে ২ টাকা বেড়েছে। মিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্যমতে, গত রোববার কুষ্টিয়ার খাজানগরের মোকামে মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকা দরে। মিলগেটেই ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে ৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম লায়েক আলী বলেন, আমরা চাল রপ্তানির অনুমতি চেয়েছিলাম কৃষক ও দেশের স্বার্থে। এখন সরকার কেন চাল রপ্তানির অনুমতি আটকে দিয়েছে, তা বুঝতে পারছি না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এটি স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একজন আরেকজনের দোষ দেয়। বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব সরকারের। কোনো কারসাজি হলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ