বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ইস্কাটনে ভবনে আগুনে শিশুসহ নিহত ৩

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর ইস্কাটনের একটি ভবনে অগ্নিকান্ডে এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে; দগ্ধ ও  ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও পাঁচজন।

ফায়ার সার্ভিস‘র নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা এরশাদ হোসাইন জানান, বুধবার দিবাগত রাত শেষে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দিলু রোডের একটি পাঁচতলা ভবনের গ্যারেজে আগুনের সূচনা হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধা ঘণ্টার চেষ্টায় ৫টা ৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এরশাদ হোসাইন বলেন, আগুন নেভানোর পর উদ্ধারকর্মীরা ওই ভবন থেকে এক শিশুসহ তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। একজন পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায় গ্যারেজে। একটি শিশুসহ দুজনের মৃতদেহ ছিল তিনতলার সিঁড়িতে।”নিচতলায় যার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তার নাম আব্দুল কাদের লিটন, বয়স ৪০ বছর।

তার শ্যালক জহির আলম ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে সাংবাদিকদের বলেন, ওই ভবনের দোতলায় 'ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল' নামে একটা বায়িং হাউজে চাকরি করতেন লিটন। নিচতলায় গ্যারেজের পাশে একটি কক্ষে তিনি থাকতেন। বাকি দুজনের মধ্যে শিশুটি ওই ভবনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা শহিদুল কিরমানী রনি ও জান্নাতুল ফেরদৌস দম্পতির সন্তান এবিএম রুশদী বলে ধারণা করছেন স্বজনরা।

জান্নাতুল ফেরদৌসের ভাই শাহাদাত হোসেন বিপ্লব বলেন, “বাচ্চাটার শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আমার ভাগ্নেকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

৩৯ বছর বয়সী রনি এবং ৩৪ বছর বয়সী জান্নাতও এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন। তাদের ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

 মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানান, রনির শরীরের ৪৩ শতাংশ এবং জান্নাতের ৯৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে।

জান্নাতের ভাই বিপ্লব বলেন, “আমি আহত অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। উনি বলেছেন, আগুন লাগার পর রনিরা তিনতলা থেকে বের হওয়ার সময় রুশদী ওদের হাত থেকে ছিঁটকে পড়ে।”

অন্য আরেকটি মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশ বলছে, ওই মৃতদেহটি পুরুষের না নারীর, তাও বাহ্যিকভাবে দেখে বোঝা কঠিন।

ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া সুমাইয়া আক্তার (৩০), মাহাদি (৯) ও মাহমুদুল হাসান (৯ মাস) নামে তিনজনকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তারা ওই ভবনের পঞ্চম তলার বাসিন্দা। তারা শঙ্কামুক্ত বলে বাচ্চু মিয়া জানিয়েছেন।

দগ্ধ রনির বাবা একেএম শহিদুল্লাহ বলেন, তার ছেলে পুলিশ প্লাজায় ভিআইভিপি এস্টেট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি কোম্পানির ফাইন্যান্স ম্যানেজার। আর পুত্রবধূ জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অর্থ বিভাগে চাকরি করেন।

রনিদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরের ইটনায়। তার বাবা দৈনিক কালেরকণ্ঠের সিনিয়র প্রোডাকশন ম্যানেজার। বাসায় আগুন লেগে ছেলে-ছেলে বউয়ের দগ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে ছুঁটে আসেন।

ওই বাড়ির গ্যারেজে থাকা পাঁচটি গাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে। তবে কীভাবে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।

দুই লাশের পরিচয় মিলেছে, মেয়েকে খুঁজছেন বাবা : অগ্নিকান্ডে নিহত তিন জনের মধ্যে দুই জনের পরিচয় মিলেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে স্বজনরা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেন। নিহতরা হলেন-আবদুল কাদের লিটন (৪৫) ও এ কে এম রুশদী (৫)।

এর মধ্যে আবদুল কাদের লিটনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম নন্দনপুর গ্রামে, তার বাবার নাম মোহাম্মদ উল্লাহ (মৃত)। লিটন ওই ভবনের নিচতলায় অবস্থিত ‘ক্লাসিক ফ্যাশন’ নামে একটি বায়িং হাউজের অফিস সহকারী ছিলেন। তার স্ত্রী মরিয়ম বেগম দুই সন্তান রনি (২০) ও সোনিয়াকে (২২) নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। কাদের তার কর্মস্থলেই থাকতেন। মর্গে এসে স্বজনেরা তার পরিচয় শনাক্ত করেন।

নিহত রুশদীর বাবার নাম শহিদুল পির মানি ও মা জান্নাতুল ফেরদৌসি। তাদের বাড়ি নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। শিশুটির লাশ শনাক্ত করেন তার দাদা এ কে এম শহিদুল্লাহ। অগ্নিকান্ডে রুশদী’র বাবা মা উভয়ই দগ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নিহত আরেকজনের পরিচয় মেলেনি। তবে ওই ভবনের ছাদের ঘরে বসবাসকারী একটি পরিবার দাবি করছে, এই লাশ তাদের মেয়ে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জান্নাত জুথির (১৭)। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম (৪২) পূর্ত ভবনের প্রশাসনিক সেকশনে চাকরি করেন। মা লাল বানু (৩৫) গৃহিণী, ভাই আশিক আপন (২৪) মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। চার জনের এই পরিবারটি ওই ভবনের ছাদের একটি রুমে থাকেন।

মেয়েটির চাচা মো. সুরুজ্জামান বলেন, ‘আগুন লেগেছে সে আতঙ্কে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল জুথি। আর ওপর থেকে বাবা, ভাই গ্রিল বেয়ে বাইরে দিয়ে নামেন। তারা দুজনেই সামান্য আহত হন। মাও নামার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। তার পা ও কোমরের হাড় ভেঙে যায়। তিনি পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। আমরা ধারণা করছি, পোড়া এই মেয়েটি আমাদেরই মেয়ে।’

বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা ছাদ থেকে পাশের ভবনে লাফিয়ে পড়ি। আমাদের আগেই মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে চলে গেছে। এটা আমারই মেয়ে।’

এখন পর্যন্ত ওই ভবনের আর কোনও পরিবার ওই লাশ তাদের কোনও স্বজনের বলে দাবি করেনি।

হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার সেলিম শাহরিয়ার জীবন স্টালিন বলেন, ‘মৃত তিন জনের মধ্যে শিশুসহ দুই জন পুরোপুরি পুড়ে গেছে, যা দেখে শনাক্ত করার মতো না। তাই পোড়া দুই জনেরই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে ফরেনসিক বিভাগকে বলা হয়েছে। একজনের শরীর পোড়েনি। সম্ভবত ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে তিনি মারা গেছেন। তার নাম আবদুল কাদের।’

বাড়ির কেয়ারটেকার লুৎফর রহমান জানান, ‘নিচ তলায় গাড়ির গ্যারেজ থেকে আগুন লাগে। পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে। তিনজন মারা গেছে। শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছি। নিচতলায় আগুন লাগার পর আমি বাইরে বের হয়ে সবাইকে চিৎকার করে বের হতে বলছি। হু হু করে আগুন নিচ থেকে ওপরে উঠে গেছে।’

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ