বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

পাপিয়াকান্ডে হোটেল মালিক-কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতাও দেখছে র‌্যাব

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে খ্যাত গুলশানের ঢাকা ওয়েস্টিন হোটেলের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটটি ভাড়া নিয়ে নিচের সারির একজন রাজনৈতিক কর্মী মাসের পর মাস কী করে আসছিলেন, তা ওই পাঁচ তারা হোটেলের মালিক ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা ভালোভাবেই জানতেন বলে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা। ওয়েস্টিনের ২২ তলায় চার বেডরুমের ওই স্যুইটের প্রতিরাতের ভাড়া সাধারণভাবে দুই হাজার ডলারের মত। ওই স্যুইট ভাড়া নিয়েছিলেন যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া, যিনি গ্রেফতার হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। 

২৮ বছর বয়সী ওই নারী সমাজের উঁচুতলার লোকদের জন্য ‘যৌনসেবার কারবার’ চালাতেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, অনেক হোমড়া চোমড়া রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীর সঙ্গে পাপিয়ার যোগাযোগ ছিল, তাদের মধ্যে হোটেলের মালিকানা ও পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও আছেন।

এদিকে, রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

পাপিয়ার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনে বহু ভিডিও পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা, যেগুলো এখন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। 

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাসেম বলেন, “পাপিয়া হোটেলের ভেতরে তার কক্ষে এসব অপকর্ম করেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ তার অবৈধ কার্যক্রমকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে কি না বা তার কার্যক্রমকে বেগবান করতে অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করেছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হবে। যদি তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।”

ওই হোটেলের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাবদ পাপিয়া প্রতি মাসে পরিশোধ করেছেন দেড় কোটি টাকার মত, আর তার পুরোটাই তিনি নগদে দিয়েছেন বলে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ভাষ্য। তবে হোটেল কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি নন।

র‌্যাবের এক অভিযানে গত শনিবার ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া ওরফে পিউ, তার স্বামী নরসিংদীর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন এবং তাদের সহযোগী আরও দুজন। তাদের কাছে পাওয়া যায় বিদেশি মুদ্রা ও জাল নোট।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক শাফী উল্লাহ বুলবুল সেদিন বলেন, পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের ‘প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট’ ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে আসছিলেন।

পাপিয়াদের জিজ্ঞাসাবাদের পর হোটেল ওয়েস্টিনে পাপিয়ার নামে বুক করা সেই স্যুইট এবং ইন্দিরা রোডে তাদের দুটি অ্যাপার্টমেন্টেও অভিযান চালায় র‌্যাব।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, হোটেল কর্তৃপক্ষকে অন্ধকারে রেখে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকান্ড চালিয়ে আসা কারও পক্ষেই সম্ভব না। তাছাড়া অনেকের সঙ্গে পাপিয়ার ছবি ও ভিডিও এখন সোশাল মিডিয়ায় আসছে। এমন এক ভিডিওতে ওয়েস্টিন ঢাকার মূল মালিক নূর আলীকেও পাপিয়াসহ বেশ কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে গল্প করতে দেখা গেছে।

ওয়েস্টিনের বোর্ডে কারা

‘দি ওয়েস্টিন ঢাকা’ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের একটি হোটেল। গুলশান ২ নম্বরে ওয়েস্টিনের ওই ২৪ তলা হোটেল ভবনের কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। আর ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

এ কোম্পানির উদ্যেক্তা পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আছেন ব্যবসায়ী নূর আলী, যিনি ইউনিক গ্রুপেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আর তার স্ত্রী সেলিনা আলী ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।

এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করা নূর আলী ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-২ আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হন।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ১৩ জুন তেজগাঁও থানায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী (আজকের প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা একটি চাঁদাবাজি মামলার বাদী ছিলেন এই নূর আলী। পরে অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে পুলিশ ওই মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নূর আলীর উপস্থিতিতেই এক নির্বাচনী সভায় শেখ হাসিনা বলেন,যারা মিথ্যা মামলা দিয়েছিল, তারাও ভুল বুঝে ক্ষমা চেয়েছে।

নূর আলীর আরেক কোম্পানি বোরাক রিয়েল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষ থেকে মনোনীত পরিচালক হিসেবে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের পর্ষদে আছেন পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস শারাফাত এবং নূর ট্রেড হাউজের প্রতিষ্ঠাতা সিইও খালিদ নূর। ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক হিসেবে আছেন ইউনিক গ্রুপের পরিচালক গাজী মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং চার্টার্ড লাইফ ইনসুরেন্স কোম্পানির পরিচালক গোলাম সারওয়ার, যিনি নূর আলীর বিভিন্ন কোম্পানির অর্থ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দৈনিক আমাদের সময়ের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক পদে আছেন।

এছাড়া সাবেক ব্যাংকার কে মাহমুদ সাত্তার (মিঠু সাত্তার) এবং মোহম্মদ ফোরকান উদ্দিন এবং অ্যাকাউন্টিং ফার্ম এম এম রহমান অ্যান্ড কোং এর অংশীদার মোহাম্মদ ফোরকান উদ্দিন ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের পর্ষদে আছেন স্বাধীন পরিচালক হিসেবে।

 

কী করেছেন পাপিয়া?

 

র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, মাদক-অস্ত্র চোরাচালান, জমি দখল করিয়ে দেওয়ার মত কাজের পাশাপাশি ওয়েস্টিন হোটেলে নারীদের দিয়ে ‘যৌন বাণিজ্য’ চালিয়ে আসছিলেন শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ এবং সেখান থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আসত ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের এই নেত্রীর হাতে।

র‌্যাব-১ এর উপঅধিনায়ক সাফাত জামিল ফাহিম জানান, গত বছরের ১২ অক্টোবর হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট ভাড়া নেন পাপিয়া। গ্রেপ্তারের সময়ও তার নামেই ছিল ওই স্যুইট, তবে মাঝে বেশ কিছুদিন ছিলেন না।

আরও দুটো কক্ষ ভাড়া নেওয়া ছিল পাপিয়ার নামে। ১২ অক্টোবরের পর থেকে মোট ৫১ দিন ওই স্যুইটে থাকার জন্য পাপিয়া ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৭ টাকা বিল মিটিয়েছেন। হোটেলের বার ব্যবহারের জন্য ব্যয় করেছেন এক কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিদিন হোটেল বেয়ারাদের টিপস দিতেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

র‌্যাব কর্মকর্তা ফাহিম বলছেন, পাপিয়া সব সময় বিল মেটাতেন নগদ টাকায়, চেক কিংবা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেন না।

 

কীভাবে পারলেন পাপিয়া?

 

পাপিয়ার বিরুদ্ধে করা তিনটি মামলায় ওয়েস্টিন হোটেলে পাপিয়ার কর্মকান্ডের বিবরণ দেওয়া হলেও তাতে হোটেল কর্তৃপক্ষের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না- সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। 

তবে হোটেল কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু। তিনি লিখেছেন, “আন্তর্জাতিক চেইন ব্যবস্থাপনার ৫-তারা হোটেলে রুম বুকিং দিতে বিস্তারিত পরিচয় লিপিবদ্ধ করতে হয়। এজেন্সি প্রয়োজনে এসব তথ্য সংগ্রহও করে থাকে। বাইরের সাক্ষাৎকারী সাধারণত লবিতে বসে কথা বলেন, কদাচ রুমে যান। সেখানে ভাড়াটে নারী এনে অনৈতিক কাজ চললো কি হোটেল কর্তৃপক্ষের অজান্তে? পাপিয়ার মামলায় হোটেল কর্তৃপক্ষ কি জবাবদিহিতায় আসবে?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাকের আহমেদও বলছেন, ওয়েস্টিন হোটেল নিয়মের অজুহাত তুলে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, “হোটেলের দায়বদ্ধতা হল, তাদের কাছে (হোটেলের অতিথি) কে আসবে না আসবে সেগুলো স্ট্রিক্টলি মনিটর করবে। বোর্ডার ছাড়া তো রাতে হোটেলে আর কারও থাকার কথা না। এ ব্যাপারে হোটেল মালিকরা দায় এড়াতে পারে না। বাইরের মানুষ এসেছে, বাইরের মানুষ থেকেছে উইদাউট দেয়ার কনফার্মেশন, এটা অসম্ভব ব্যাপার।”

এসব প্রশ্নের উত্তরে ওয়েস্টিনের মার্কেটিং কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী পরিচালক সাদমান সালাহউদ্দিন বলেন, “এ ধরনের ঘটনা যে কোনো জায়গায় হতে পারে। কিন্তু এ ঘটনায় হোটেল দায়ী হতে পারে না। আমাদের গেস্ট এসেছে বিভিন্ন দেশ থেকে। রুমে যারা আছে, তাদের প্রাইভেসি আছে। এখন কে কোথায় কী করেছে, সেটা দেখার সুযোগ নেই। আমাদের রুমের মধ্যে কোনো ক্যামেরা নেই। ভেতরে কী হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি না।”

পুলিশ এ বিষয়ে কী করছে জানতে চাইলে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, “এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে এখনও আসেনি। অভিযোগ থাকলে আমরা দেখব। এখন বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলার তদন্ত করছে। হোটেলের কেউ দোষী হলে তা তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।”

‘রাজধানীর হোটেলগুলোতে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হবে’

রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোতে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘সরাইখানা আইনে আছে, আবাসিক হোটেলে প্রতিদিন কারা অবস্থান করবে তাদের তালিকা নিকটস্থ থানায় জমা দিতে হবে। দেশি-বিদেশি যারাই থাক না কেন তাদের নাম ঠিকানাসহ তালিকা জমা দিতে হবে। তবে এত বেশি সংখ্যক আবাসিক হোটেল যে প্রতিনিয়ত সেটি করা হয় না। প্রতিনিয়ত করলে হোটেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয় এবং পুলিশেরও তদারকিতে অসুবিধা হয়। তাই খুব বেশি তদারকি করা হয় না।’

যুবলীগ নেত্রী শামীমা নুর পাপিয়ার কার্যকলাপ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে হোটেলগুলোতে যাতে অসামাজিক কার্যকলাপ না হয় এবং হোটেল পরিচালনার যে নীতিমালা রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে। সেখানে যাতে ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটিজ না ঘটে সে ব্যাপারে সজাগ থাকবে পুলিশ।’

পাপিয়ার বিষয়ে আবদুল বাতেন বলেন, ‘পাপিয়ার বিরুদ্ধে র‌্যাব তিনটি মামলা করেছে। ওইসব মামলায় পাপিয়া এখন ১৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গতকাল (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে মামলাগুলো ডিবিতে হস্তান্তর হয়েছে। এখনো জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি। পাপিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, কারা ইন্ধনদাতা, তার অর্থের উৎস কী, এত বেপরোয়ার পেছনে শক্তির উৎস কী- সবই তদন্ত করে দেখা হবে। এমনকি অনৈতিক বিষয় থাকলেও তদন্ত করে দেখা হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি হোটেলে কি ধরণের কার্যকলাপ চলতে পারে, তাদের কি নিয়ম কানুন আছে, কারা ভাড়া নিয়ে হোটেলে থাকতে পারবে- তা চেক করে দেখা হবে। এর বাইরে সেখানে কী কী করার নিয়ম আছে তাও দেখা হবে। পাপিয়ার অবস্থানের বিষয়ে হোটেলের কী দায় আছে তাও দেখা হবে।’

এছাড়া পাপিয়ার বিষয়ে কোনো ভূক্তভোগী অভিযোগ করলে সেই অভিযোগগুলোও তদন্ত করা হবে বলে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার।

‘তদন্তের স্বার্থে’ সাংবাদিকদের তথ্য দেবে না ওয়েস্টিন

পাপিয়া ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারের ঘটনায় কোনও ধরনের মন্তব্য করবে না বা সাংবাদিকদের কোনও তথ্য দেবে না ঢাকা ওয়েস্টিন হোটেল কর্তৃপক্ষ। আইনানুগ তদন্তের স্বার্থে ও নীতিগত কারণে এই অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। তবে পাপিয়ার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সব ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানায় হোটেল কর্তৃপক্ষ।

পাঁচ তারকা এই হোটেলে মাসের পর মাস অবস্থান করেছেন শামীমা। অভিযোগ উঠেছে, ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া নিয়ে দেহ ব্যবসা চালিয়ে তিনি যে আয় করতেন, তা দিয়ে শুধু হোটেল বিলই দিতেন কোটি টাকার বেশি। ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে পাপিয়ার অবস্থান করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হোটেল কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে প্রশ্ন চায়। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) কয়েকটি প্রশ্ন ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষের ই-মেইলে পাঠানো হয়। একদিন সময় নিয়ে বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে ফিরতি ই-মেইলের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা ওয়েস্টিন হোটেলের মার্কেটিং কমিউনিকেশনের সহকারী পরিচালক সাদমান সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত আছি। আমাদের কঠোর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা এই ধরনের ঘটনার জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চলমান তদন্তে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমস্ত ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়ানো হয়েছে। একটি অতিথিসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, সব অতিথির সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সংশ্লিষ্ট ঘটনার আইনানুগ তদন্তের প্রেক্ষিতে বর্তমানে হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনও ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকবে।’

র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাপিয়া-মতি সুমন দম্পতির সুনির্দিষ্ট কোনও পেশা নেই। ঢাকা ও নরসিংদীতে তাদের গাড়ির শোরুম ও কার ওয়াশ সলিউশন সেন্টার থেকে বাৎসরিক আয় ১৯ লাখ টাকা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাপিয়া ও তার স্বামী মতি সুমনের অনেক অপকর্মের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা ঢাকা ও নরসিংদী এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা করে অঢেল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া তাদের আয়ের অরেকটি উৎস হলো নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো। সাত নারীকে এ কাজে ব্যবহার করতেন পাপিয়া। এছাড়া হোটেল ওয়েস্টিনে সবসময় পাপিয়ার নামে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট বুক থাকতো। সর্বশেষ গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৫৯ দিন ঢাকা ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অবস্থান করেন পাপিয়া ও তার সহযোগীরা। সেখানে আনুষঙ্গিক খরচসহ পাপিয়া সর্বমোট ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ টাকা নগদ পরিশোধ করে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘ওই পাঁচ তারকা হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের তথ্য দিয়ে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। ঢালাওভাবে হোটেল কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করতে পারি না। কারণ হোটেলের কাজই ব্যবসা করা। অভিযোগের ভিত্তিতে পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।’

গত ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাপিয়াসহ চার জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব ১-এর একটি দল। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলো পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন (৩৮), তাদের সহযোগী সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)। তারা অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নানা অনৈতিক কাজ, জালনোট সরবরাহ, রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে জানায় র‌্যাব।

গ্রেফতারের পর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে হোটেল ওয়েস্টিনে পাপিয়ার নামে বুকিং করা বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট এবং ফার্মগেট এলাকার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব আরও একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি ব্যাংক চেকবই, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ