বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঋণখেলাপি ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেফতার বিচার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির সমাবেশে বামনেতারা বলেছেন, ঋণখেলাপি-ব্যাংক ডাকাতদের গ্রেপ্তার, বিচার ও তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক, আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও নৈরাজ্য চলছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই তারপরও জনগণের আমানতের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য সরকার নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিচ্ছে। দেউলিয়া ফার্মার্স ব্যাংকের কলঙ্ক ঢাকতে নতুন নাম করেছে পদ্মা ব্যাংক।
 গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির সমাবেশে বামনেতারা এইসব কথা বলেন। জোটের সমন্বয়ক বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমন্বয়কের বক্তব্যের পরই একটি বিক্ষোভ মিছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমুখে যাত্রা করলে দৈনিক বাংলার মোড়ে পুলিশ কাঁটাতারের বেরিকেড দিয়ে মিছিলে বাধা দিলে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মো. শাহ আলম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কবাদীর) কেন্দ্রীয় নেতা মানস নন্দী ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা কমরেড হামিদুল হক। সমাবেশ শেষ সমম্বয়ক কমরেড বলজুর রশীদ ফিরোজের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক, আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও নৈরাজ্য চলছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই তার পরও জনগণের আমানতের টাকা আত্মসাত করার জন্য সরকার নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিচ্ছে। দেউলিয়া ফার্মার্স ব্যাংকের কলঙ্ক ঢাকতে নতুন নাম করেছে পদ্মা ব্যাংক। তিনি বলেন অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম হিসেব করে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ খেলাপির যে তালিকা দিয়েছে তা চাতুর্যপূর্ণ বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। সরকার ঋণ খেলাপি ব্যাংক ডাকাতদের ভিআইপি, সিআইপি মর্যাদা দিয়ে পুরষ্কৃত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যাংক খোলার অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের চাপে ব্যর্থ হয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার জোরে নামে বেনামে ব্যাংক খুলছে । অর্থমন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের আর্থিক খাত ভালো না। অথচ এর আগে তিনি আর্থিক খাতের উন্নতির কথা বলে উল্টো বক্তব্য দিতেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের নেতাদের সিন্ধুকে ২৬ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এ টাকা কোথা থেকে আসলো? পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে অথচ তার পৃষ্ঠপোষক রাঘব বোয়ালদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? এ সরকার জনগণের ভোটে যেহেতু ক্ষমতায় আসেনি সেজন্য জনগণের প্রতি কোন দায় নেই। আজ ভোট ডাকাত ও ব্যাংক ডাকাত এক হয়েছে। ফলে এই সরকারের পক্ষে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা বা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে, ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ করতে হলে বর্তমান ভোট ডাকাতের আওয়ামী সরকারকে উৎখাত করতে হবে। সেই আন্দোলনে তিনি সকল বাম গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানান।
কমরেড মো. শাহ আলম বলেন, দেশে লুটপাটের অর্থনীতির বিরুদ্ধে বাম জোট আন্দোলনে নেমেছে। লুটপাটের অর্থনীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি এক মোহনায় এসে মিলেছে। দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে আনার জন্য সরকারের কোন পদক্ষেপ নেই। ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কার্যকর কোন উদ্যোগ দেশবাসী দেখছে না। এর বিরুদ্ধে একটা সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
জুনায়েদ সাকী বলেন, পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সরকার প্রতিদিন আমাদের উন্নয়নের গল্প শোনাচ্ছে অথচ প্রতিদিন দেশের ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। রি-সিডিউলের নামে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হয়। ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নয় এর পরিমাণ হবে ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকরা ২ লাখ কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে। চোরে চোরে খালাতো ভাই এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেরে দিচ্ছে। এই সব লুটপাটকারী সরকারের সহযোগিতায় একাজ করছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে। লুটপাটের টাকা জোগান দেয়ার জন্য জনগণের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। সরকার আর্থিক খাতে হরিলুটের ব্যবস্থা চালু করেছে। সরকার পুলিশ-আমলার সহযোগিতায় দেশ চালাচ্ছে। তাই এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
সাইফুল হক বলেন, সরকার মিছিল-সামবেশ, স্মারকলিপি পেশের মতো কর্মসূচিকেও ভয় পাচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো লালবাতি জ¦ালিয়েছে। আব্দুল হাই বাচ্চুকে গ্রেফতার করতে পারছে না। সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছে এদের হাত এত লম্বা যে, এদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ যে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতো তার সুদ কমিয়ে দিয়েছে। চুনোপুটিদের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করা হচ্ছে আর রাঘব-বোয়ালরা টাকা কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে, সরকার এদের পাহারা দিচ্ছে। পাপিয়ার মতো মাফিয়ারা পুরো দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের হাতে দেশ এখন জিম্মি।
অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আজ পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হচ্ছে কিন্তু কার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে পাপিয়ারা সৃষ্টি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কি সেটা জানেন না? দেশবাসী সেই আশ্রয়দাতা গডফাদারদেরও বিচার চায়।
মানস নন্দী বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে সে টাকা লুটপাট হয়ে যায়। সরকার জনগণের আমানত রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে তাই তার ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। সরকার অর্থপাচারকারী, ঋণ খেলাপিদের পাহারাদার। সরকার জনগণের ভোট লুটপাট করেছে আর একদল লুটেরাদের দিয়ে জনগণের অর্থ লুট করাচ্ছে। উভয় লুটেরারা আজ পরস্পরের বন্ধু। এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
মোশরেফা মিশু বলেন, পুলিশ এ সরকারকে বেশিদিন পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে পারবে না। সরকার লুটপাটকারীদের সাজা না দেয়ার কারণে তারা উৎসাহের সাথে লুণ্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক কমিশন করে লুটপাট থামানো যাবে না যদিনা তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয়। শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোতে গণপাহারা বসাতে হবে।
হামিদুল হক বলেন, অর্থমন্ত্রী দেশী বিদেশী লুটেরাদের ফায়দা লুটার নানা ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট অর্থমন্ত্রীর সার্টিফিকেট বাগিয়ে নিয়েছে। বাস্তবে সে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অর্থমন্ত্রী। এক পরিবারের ৪ জন পরিচালক ৯ বছর মেয়াদ করার মধ্যদিয়ে লুটপাটের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে।
বাম জোটের ঘেরাও পূর্ব সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ হেল কাফি রতন, বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আকবর খান, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা ফখরুদ্দিন কবীর আতিক, গণসংহতি আন্দোলনের মুনীরুদ্দিন পাপ্পু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ