বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

শেষ সময়ে বইপ্রেমীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জমজমাট বইমেলা

গতকাল বুধবার অমর একুশে বইমেলার একটি স্টলে বই কেনার জন্য ভিড় জমিয়েছে বইপ্রেমীরা -সংগ্রাম

ইবরাহীম খলিল : লেখক, দর্শনার্থী ও বই প্রেমীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে উঠেছে বইমেলা। দিন গড়াচ্ছে আর মেলায় ভীড় বাড়ছে বইপ্রেমী পাঠক, লেখক, দর্শনার্থীর। যদিও বইমেলায় বিদায়ী সুর বাজতে শুরু করেছে। অন্যদের পাশাপাশি বইমেলায় কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের ভিড়ও চোখে পড়ার মত। অন্যদের গল্প-উপন্যাস বা কবিতার বইয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও ক্ষুদে বইপ্রেমী, কিশোর, তরুণদের একটি বড় অংশের বেশি আগ্রহ সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর বইয়ে।
গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫৬টি। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত বইয়ের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে যায়। লেখক ও অভিভাবকরা বলছেন, সায়েন্স ফিকশন বইগুলো মূলত বিজ্ঞানমনস্ক সৃষ্টিশীল চিন্তার জগতকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে কিশোর, তরুণদের। তাই তাদের এসব বইয়ের প্রতি একটু বেশিই আগ্রহ।
ধানমন্ডি থেকে মায়ের সঙ্গে বই মেলায় এসেছিল হলিক্রস স্কুলের শিক্ষার্থী তাসলিমা ফারজানা স্বপ্নীল। স্বপ্নীল বলেন, অন্যান্য বইয়ের চেয়ে সায়েন্স ফিকশন বই পড়তে ভালো লাগে। জাফর ইকবাল স্যারের সায়েন্স ফিকশন বই সবচেয়ে বেশি পড়ি। আজ বইমেলায় জাফর ইকবাল স্যারের ছাড়াও আরও দুইটি সায়েন্স ফিকশন বই কিনেছি। অন্যদিকে সায়েন্স ফিকশনের বই পাওয়া যাচ্ছে এমন এক স্টলের বিক্রয়কর্মী হাবিবুর রহমান বলেন, প্রতিবারই মেলায় তরুণ-কিশোরদের কাছে জয়প্রিয়তার তালিকায় থাকে সায়েন্স ফিকশনের বই। আগে থেকে নাম জেনে আসা বইগুলো স্টলে এসে খুঁজছে তারা। কিনেও নিচ্ছে পাশাপাশি অন্যান্য স্টলেও সায়েন্স ফিকশনের কী বই আছে জানতে চাচ্ছে তারা।
বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলায় আসা নতুন বইয়ে মধ্যে গল্পগ্রন্থ ৫২৪, উপন্যাস ৬৪৩, প্রবন্ধগ্রন্থ ২২৩, কাব্যগ্রন্থ ১২৯৭, গবেষণাগ্রন্থ ৯১, ছড়ার বই ৮৩, শিশুতোষ গ্রন্থ ১৭১, জীবনীগ্রন্থ ১১৬, রচনাবলি আট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ১৩৮, নাটক ২৩, বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ৭১, ভ্রমণকাহিনী ৭৩, ইতিহাসগ্রন্থ ৮০, রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থ ১২, চিকিৎসা-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ২৫, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গ্রন্থ ১১৩, রম্য-ধাঁধা ৩২, ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থ ১৬, অনুবাদ সাহিত্য ৪৪, অভিধান ১৪, সায়েন্স ফিকশন ৫৬ এবং অন্যান্য বই এসেছে ২৩০টি।
গতকাল বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে জমে ওঠে আড্ডাও। রাজধানীর কারও কারও বিকেল থেকে সন্ধ্যার ঠিকানা হয়ে ওঠে অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। বন্ধু-বান্ধব আর পরিবারের সঙ্গেও এসময় জমে ওঠে আড্ডা খোশগল্প। আড্ডা জমে লেখক আর পাঠকদের মধ্যেও। প্রতিদিন বিকেল হলেই বন্ধুরা মিলে অনেকেই চলে আসেন। ফিরেন না মেলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত।
একাডেমির নতুন ভবনের সামনে পুকুর পাড়ে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের আশপাশে, লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণসহ বিভিন্ন স্টল বা প্যাভিলিয়নের পাশে জমে আড্ডা। দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, লেখার ধরনসহ নানা বিষয় ওঠে আসে তাদের আড্ডায়।
এদিকে, মেলাজুড়ে আড্ডা চললেও থেমে নেই বিক্রিও। মেলাতে এখন যারা আসছেন, তারা বেশির ভাগই বইয়ের ক্রেতা। মেলার শুরু থেকেই এবার বিক্রি কম এমনটা শোনা গেলেও এই সময়ে এসে প্রকাশকদের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে।
গতকাল বুধবার ২৫-তম দিন মেলা চলে বেলা ৩:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। বিকাল ৪:০০টায় অনুষ্ঠিত হয় কামরুল হক রচিত বঙ্গবন্ধু ও সংবাদপত্র : ছয় দফা থেকে গণঅভ্যুত্থান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করেন সোহরাব হাসান। আলোচনায় অংশ নেন মোরশেদ শফিউল হাসান এবং হারুন হাবীব। লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন কামরুল হক। সভাপতিত্ব করেন কামাল লোহানী।
প্রাবন্ধিক বলেন, গত শতকের ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু যে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, এ দেশের মানুষ তার ভেতরেই তাদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখতে পায়। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আলোচ্য সময়ে পূর্ববঙ্গের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে ছয় দফাকে কেন্দ্র করেই। ঊনসত্তরে ছাত্রসমাজের ১১ দফা ছিল সেই ছয় দফারই সম্প্রসারণ ও পরিপূরক। ফলে সেদিন ছয় দফা ও এগার দফার আন্দোলন একাকার হয়ে গিয়েছিল।
আলোচকবৃন্দ বলেন, ১৯৬৬’র ছয় দফার সময় থেকে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময়কালেই বঙ্গবন্ধু জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত হন এবং স্বাধিকার আন্দোলনের পথে বাঙালিকে উজ্জীবিত করে তোলেন। সেই প্রবল ইতিহাস সৃষ্টিকারী সময়ে পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মূলধারার অনেক পত্রিকাই জাতীয়তাবাদী ভূমিকা নেয় এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে।
গ্রন্থের লেখক বলেন, ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক ঘটনাবলি পত্রিকার সূত্র ধরে ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত হয়েছে এ গ্রন্থে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জনগণকে কীভাবে সচেতন করেছেন, মানুষকে আন্দোলনের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং চূড়ান্ত সফলতা-স্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেনÑ ঐ সময়ে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো তার সাক্ষী হয়ে আছে।
সভাপতির বক্তব্যে কামাল লোহানী বলেন, ৬৬’র ছয় দফা থেকে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সময়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা প্রতিফলিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও সংবাদপত্র : ছয় দফা থেকে গণঅভ্যুত্থান গ্রন্থে। বঙ্গবন্ধুর মতো জনদরদি একজন মহান নেতা যিনি প্রতিটি কর্মীর ব্যক্তিগত খোঁজখবর রাখতেন, তাঁর সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক ছিল না, তা ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছেছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ আস্থা সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের মধ্য দিয়ে উঠে আসে।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন শামস আল মমীন, আলমগীর রেজা চৌধুরী, মুম রহমান এবং তানভীর আহমেদ সিডনী।     
কম্বোডিয়ার প্রতিমন্ত্রীর গ্রন্থমেলা পরিদর্শন : গতকাল বিকেল ৪:০০টায় কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইত সোফিয়া’র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিদর্শন করেন। বাংলা একাডেমিতে কম্বোডিয়ান প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানান একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি আবিদ আনোয়ার, জুয়েল মাজহার, নাসরীন নঈম, ফরিদ আহমেদ দুলাল, সোহেল হাসান গালিব। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী শাকিলা মতিন মৃদুলা ও আবু নাসের মানিক। সন্ধ্যায় ছিল মো. মাসুম হুসাইনের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘পরম্পরা নৃত্যালয়’-এর নৃত্য পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মানসী সাধু, উম্মে রুমা ট্রফি, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, কামাল আহমেদ, আজমা সুরাইয়া শিল্পী, মাহবুবা রহমান, নাসরিন জাহান, মুন্নী কাদের। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন বাবু জামান (তবলা), প্রদীপ কুমার কর্মকার (অক্টোপ্যাড), ডালিম কুমার বড়ুয়া (কী-বোর্ড) এবং মো. আবু কামাল (বেহালা)।
গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ঘোষণা : বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী আজ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চারটি গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ঘোষণা করেন।  ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য কথাপ্রকাশ-কে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২০, ২০১৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে শৈল্পিক ও গুণমান বিচারে সেরা গ্রন্থ বিভাগে আবুল হাসনাত রচিত প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য  গ্রন্থের জন্য জার্নিম্যান বুক্সকে, মঈনুস সুলতান রচিত  জোহানেসবার্গের জার্নাল গ্রন্থের জন্য প্রথমা প্রকাশনকে এবং রফিকুন নবী রচিত স্মৃতির পথরেখা  গ্রন্থের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশন্সকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২০ প্রদান করা হয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড-কে রোকনুুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০২০ এবং ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযান (এক ইউনিট), কুঁড়েঘর প্রকাশনী লিমিটেড (২-৪ ইউনিট), বাংলা প্রকাশ (প্যাভেলিয়ন)-কে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২০ প্রদান করা হয়। আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বই মেলা ২০২০-র সমাপনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পুরস্কার পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে তুলে দেয়া হবে। আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২৬-তম দিন। মেলা চলবে বেলা ৩:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। বিকাল ৪:০০টায় অনুষ্ঠিত হবে শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায়  শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করবেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশ নেবেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, এনামুল করিম নির্ঝর এবং আমীরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করবেন মাহফুজা খানম। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ