সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

করোনা ভাইরাসে মহামারির চেয়ে বিশ্বে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা

# আক্রান্ত হলেন ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী
# মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭০১
স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা, মারা যাচ্ছেন বহু মানুষ। এ কারণে করোনা ভাইরাসে মহামারির চেয়ে বিশ্বে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০১ একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইরানের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং করে আসছিলেন উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইরাজ হারিরছি। এবার তিনি এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক উপদেষ্টা। দেশটিতে এখন পর্যন্ত এতে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের  মৃত্যু হয়েছে। 
চীনে এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৮০ হাজার ১৫০ জন। ৩৭টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনার অধিকাংশই চীনের মূল ভূখণ্ডে। চীনে নতুন করে আরও ৫শ আটজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথমবার করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। বর্তমানে এশিয়ার বেশ কিছু দেশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপেও এই ভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের মূল ভূখণ্ডে নতুন করে আরও ৭১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬৮ জনই হুবেই প্রদেশের উহান শহরের। চীনে এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৬৬৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অপরদিকে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৬৬৮।
অপরদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে আরও ৬০ জনের এই ভাইরাসে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত সেখানে ৮৯৩ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ৮ জন। এদিকে, জাপানি প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেসের আরও এক যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ওই প্রমোদতরীর চারজন প্রাণ হারিয়েছে। দু’সপ্তাহ ধরে ওই প্রমোতরীর যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। করোনা ভাইরাসে জাপানের বিভিন্ন স্থানে ৫, ইতালিতে ৭, হংকংয়ে ২, তাইওয়ানে একজন, ফ্রান্সে একজন এবং ফিলিপাইনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৭ হাজার ৪৬৯ জন।
মহামারির চেয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা: বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের কারণে ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। যদিও বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির পরও একে এখনও মহামারির স্বীকৃতি দেয়নি সংস্থাটি। তবে খুব শিগগিরই এটি মহামারির চেয়েও বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা। সোমবার ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস এক ব্রিফিংয়ে বলেন, করোনা সংকটকে এখনও মহামারির চেয়ে বড় বিপর্যয় (প্যানডেমিক) বলার সময় আসেনি। সাধারণত কোনও নির্দিষ্ট এলাকা বা সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনও রোগ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে তাকে মহামারি হিসেবে ধরা হয়। আর কোনও মহামারি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে তাকে প্যানডেমিক বলা হয়। করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে ডব্লিউএইচও প্রধান বলেন, এই ভাইরাসের কি প্যানডেমিক হওয়ার সম্ভবনা আছে? অবশ্যই আছে। আমরা কি সে পর্যন্ত পৌঁছেছি? আমাদের হিসাবে, এখনও নয়।
কোনও মহামারিকে প্যানডেমিক বলা হবে কি-না তা নির্ভর করে এর বিস্তৃতির ধরন, সংক্রমণের হার, ভয়াবহতা প্রভৃতির ওপর। গ্যাব্রিয়েসুস বলেন, ‘আমরা বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তৃতি এখনও দেখিনি, আর অনেক বড় হারে রোগের ভয়াবহতা বা প্রাণহানিও দেখা যায়নি।
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সব দেশকে তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন টেড্রস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস। পাশাপাাশি, ভাইরাস সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্যেও জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া, ভাইরাস প্রতিরোধে যেসব দেশের পর্যাপ্ত সংস্থান নেই, তাদের এর হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন গ্যাব্রিয়েসুস।
এদিন চীনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাঠানো প্রতিনিধি দলের পাওয়া তথ্যও উপস্থাপন করেছেন সংস্থাটির প্রধান। তিনি জানান, চীনে ২৩ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি ছিল। এরপর থেকেই তা ধীরে ধীরে কমছে। কোভিড-১৯ রোগাক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর নয়, তারা সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হচ্ছেন। আর যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের তিন থেকে ছয় সপ্তাহ লাগছে সুস্থ হতে। বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো এই ভাইরাসে উৎস শহর উহানে মৃত্যুর হার সময়ভেদে দুই থেকে চার শতাংশ। এর বাইরে মৃত্যুর হার মাত্র ০.৭ শতাংশ।
আক্রান্ত হলেন ইরানের উপ স্বাস্থ্যমন্ত্রী: ইরানের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং করে আসছিলেন উপ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইরাজ হারিরছি। এবার তিনি এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক উপদেষ্টা। মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় উপদেষ্টা আলিরেজা বাহাবজাদেহ একথা জানিয়েছেন। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরাজ হারিরছিকে হাঁচি-কাশি দিতে দেখা যায়
চীনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমতে শুরু করলেও সম্প্রতি ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার নিয়েছে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত এতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৫ জন আর আক্রান্ত হয়েছে আরও ৯৫ জন। ভাইরাস মোকাবিলায় ইরানি প্রচেষ্টার নেতৃত্বে ছিলেন উপ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইরাজ হারিরছি। গত সোমবার ইরান সরকারের মুখপাত্র আলি রাবেয়ির সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন ইরাজ হারিরছি। সেখানে তাকে কাশি দিতে এবং ঘাম ঝরতে দেখা যায়। এরপর দিনই তার করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার তথ্য জানা গেল। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর দেশের বিভিন্নস্থানে গানের অনুষ্ঠান ও ফুটবল ম্যাচ বাতিল করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বহু স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেশিরভাগ মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়া মানুষই কোম শহরের বাসিন্দা বা সেখানে সফর করে আসা।
৫০০ কিট দিল চীন: করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় বাংলাদেশকে ৫০০টি কিট দিয়েছে চীন সরকার। মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কাছে কিট হস্তান্তর করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বন্ধুপ্রতীম দেশ চীনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কিছু মেডিকেল জিনিসপত্র দিয়েছিলাম। যেটা ব্যবহার করে ডাক্তার ও নার্সরা রোগীর চিকিৎসা দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় চীন সরকারও শুভেচ্ছা স্বরূপ বাংলাদেশকে ৫০০টি টেস্টিং কিট আজকে আমাদের দিয়েছে। আমাদেরও নিজস্ব প্রায় ২ হাজারের মতো কিট রয়েছে। চীন আরও ৫০০টি দিচ্ছে। ইনশাআল্লাহ কিটের কোনো অভাব হবে না। তিনি বলেন, ‘একটি কিট দিয়ে একজনকেই পরীক্ষা করা যাবে। এখনকার জন্য এই কিটই যথেষ্ঠ, এছাড়া আরও কিট পাইপলাইনে আছে। আমরা এ পর্যন্ত ৭৯ জনের (করোনা ভাইরাস আছে কিনা) পরীক্ষা করেছি। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘তারা আমাদের করোভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ‘ট্রিটমেন্ট প্রটোকল’ দিয়েছেন। তারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এটা করেছেন। এটা আমাদের হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে দেব। তারা শিখে যাতে এটা গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের একটি ট্রিটমেন্ট প্রটোকল রয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ