শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

স্মৃতির পাতায় মাওলানা আবদুস সুবহান

২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৬, দারুল আমান ট্রাস্ট পরিচালিত পাবনা ইসলামিয়া মাদরাসার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মুহাম্মদ আবদুস্ সুবহান এম.পি.। এ সময় মাদরাসার পতাকা উত্তোলন করেন দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুর রহীম। ছবিতে মাদরাসার অধ্যক্ষ এবং ২ জন বিদেশী শিক্ষককে দেখা যাচ্ছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রহীম : ১৯৬৭/৬৮ সালে আমি যখন পাবনা পুষ্পপাড়া আলীয়া মাদরাসার ছাত্র; সে সময় মাওলানা আবদুস্ সুবহান মাদরাসাটির ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি। মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ঘটে যাওয়া একটি অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিরসনের জন্য তিনি মাদরাসায় যান। তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে পৃথক-পৃথকভাবে কথা বলেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ঘটনা যা-ই হোক, শিক্ষকবৃন্দের সাথে তোমাদের একটা ভাল সম্পর্ক থাকা দরকার; শিক্ষকবৃন্দের প্রতি তোমাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা থাকা দরকার। সমস্যা সমাধানে শিক্ষকবৃন্দের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা দরকার।’ মাওলানা সাহেবের পক্ষ থেকে এ সব উপদেশমূলক কথাবার্তা শোনার পর, আমরা আন্দোলন থেকে নিবৃত হই। এতে সৃষ্ট সমস্যাটিরও সমাধা হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ দূর হয়।’ সেই সময় থেকে মাওলানা আবদুস্ সুবহানের সাথে আমার পরিচয়।
এরপরে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ঘটে। আন্দোলনের সময় উনার (সুবহান) আহ্বানে পুষ্পপাড়া মাদরাসা থেকে আমরা পাবনা শহরে আসতাম এবং মিছিল করতাম। সে সময়ে আমরা দেখেছি, মাওলানা আবদুস্ সুবহান সাহেব এবং ঐ সময়ে পাবনা আলীয়া মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল, বর্তমান খেলাফত মজলিসের একাংশের চেয়ারম্যান মাওলানা ইসহাক সাহেব; তাঁরা ২ জন এ সকল মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ সেই সময়ে এই ২ ব্যক্তির ডাকে সাড়া দিয়ে পাবনা শহরে মিছিল করতো। আমরা মিছিল শেষে কোনো দিন গাড়িতে, গাড়ি না পেলে কোন কোন দিন পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরে যেতাম। খালি পায়ে মিছিল করে ফেরার পথে রাস্তার সুড়কি পায়ে বিঁধতো খুব। সে সময় থেকেই, মাওলানা আবদুস্ সুবহান বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে পাবনায় আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। বিশেষ করে যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়; মাওলানা আবদুস্ সুবহান সাহেব এবং মাওলানা ইসহাক সাহেবের নেতৃত্বে পাবনাতে যত বড়-বড় মিছিল এবং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে; ঐ সময়ে আমরা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের অত বড় মিছিল-মিটিং দেখিনি।
আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন যখন সফল হলো, পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আবদুস্ সুবহান সাহেব, জাতীয় পরিষদে পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির এবং মাওলানা ইসহাক সাহেব প্রাদেশিক পরিষদের এমপি হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করলেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসাবে মাওলানা আবদুস্ সুবহান সাহেব দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দিতা করলেন। আর মাওলানা ইসহাক সাহেব, নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী হিসাবে বই মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করলেন। ঐ সময় থেকেই আমাদের এলাকায় ইসলামী পরিবেশ বজায় ছিল বলে উভয় দলের প্রার্থীর জন্যই, আমরা যারা তরুণ ছিলাম; সদর থানার আতাইকুলা, সাদুল্লাপুর এবং গয়েশপুর, এই ৩টি ইউনিয়নে ভোট চাওয়া এবং প্রচার-প্রোপাগাণ্ডার কাজ করতাম।
৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন
১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; তখন আমি পাবনা সদর উপজেলা আমীর। ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পাবনা সদর আসনের প্রার্থী ছিলেন মাওলানা আবদুস্ সুবহান। সদর আসনের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল আমার ওপর। আমাদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর জনসাধারণের বিপুল ভোটে মাওলানা আবদুস্ সুবহান স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের ২৮ জুন থেকে ২০১৬ সালের নবেম্বর মাস পর্যন্ত একটানা প্রায় ২৬ বছর, আমি পাবনা জেলা জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমার দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মাওলানা আবদুস্ সুবহান গ্রেফতার হন। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, আদালত তাঁকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয়া হয়। সে রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপীল আবেদন করেন। বিচারাধীন আপীল নিষ্পত্তির আগেই ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, মাওলানা আবদুস্ সুবহান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
আটক থেকে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ
২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, যখন মাওলানা আবদুস্ সুবহান বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব টোল প্লাজা থেকে আটক হন; তখন তাঁকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও তাঁর মুক্তির দাবিতে পাবনা জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে ৩ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল- মাওলানা আবদুস্ সুবহানের মুক্তি কামনায় গ্রেফতারের পরদিন শুক্রবার বা’দ জুম’আ জেলার সকল মসজিদে দোয়া মাহফিল, শনিবারে তাঁর মুক্তির দাবিতে জেলা সদরসহ সকল উপজেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং রোববার হরতাল।
২০১২ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে, প্রায় ৯ বছর আগে (২০০৩ সালে) খারিজ হওয়া একটি মামলা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সচল করে। এই মামলার হাজিরা দিতে, ঢাকা থেকে পাবনা যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব টোল প্লাজা থেকে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দারা তাঁকে আটক করেন। সকালে আটকের পর প্রায় ১০ ঘন্টা পর পাবনার একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রাতে পুলিশ প্রিজন ভ্যানযোগে তাঁকে পাবনা পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের চর তারাপুর গ্রামে বাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে সদর থানায় দায়েরকৃত জিআর মামলাটির নম্বর ১৩৬/১২; বাদী চরতারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুল কুদ্দুস। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল বারী তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল, মাওলানা আবদুস সুবহানকে প্রধান আসামী করে ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ঐ দিনই পাবনা আমলী আদালত-১ এর বিচারক আবু সালেহ মোঃ সালাউদ্দীন অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে মাওলানা আবদুস্ সুবহানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করেন। মামলার বাকি ২৮ জন আসামী জামিনে ছিলেন।
২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, পাবনা আনার ৪ দিন পর, ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, তাঁকে পাবনা থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের আবেদন আমলে নিয়ে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নিদের্শ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ এপ্রিল থেকে মাওলানা আবদুস্ সুবহানের মানবতাবিরোধী অপরাধের অনুসন্ধানে প্রসিকিউশনের তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মোঃ নূর হোসাইন কাজ শুরু করেন। তদন্ত কর্মকর্তাদ্বয় ২০১২ সালের ৫ এপ্রিল থেকে নিয়ে ২০১৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেন। তাঁকে গ্রেফতারের প্রায় ১ বছর পর, ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র জমা দেন প্রসিকিউশনের তদন্ত কর্মকর্তাদ্বয়। ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর, ৮ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে ৯টি অভিযোগ গঠন করে তাঁর বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল-১। পরবর্তী সময়ে মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়।
২০১৪ সালের ১ এপ্রিল মামলার শুনানি শুরু হয়। এতে তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মোঃ নূর হোসাইনসহ সরকার পক্ষের স্বাক্ষীর সংখ্যা ছিল ৩১ জন। আর আসামীপক্ষকে মাত্র ৩ জন সাফাই স্বাক্ষীর অনুমোদন দেয়া হয়। আপীল আবেদনের ১১৮২ পৃষ্ঠার ভলিউম থেকে জানা যায়, উক্ত ৩১ জন সরকার পক্ষের স্বাক্ষীর মধ্যে, ৬ জন স্বাক্ষীর বয়স ১৯৭১ সালে মাত্র ২ থেকে ৬ বছরের মধ্যে ছিল। যুক্তি-তর্ক ও স্বাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা আবদুস্ সুবহানকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। প্রসিকিউশনের ৯টি অভিযোগের মধ্যে ৬টিতে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে ৩টিতে মৃত্যুদণ্ড ও অপর দু’টিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। অপর একটি অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, প্রসিকিউশনের আনা ১ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদী উপজেলার কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বের করে ২০ জনকে হত্যা, ৪ নম্বর অভিযোগে একই উপজেলার সাহাপুর গ্রামে ৬ জনকে হত্যা এবং ৬ নম্বর অভিযোগে সুজানগর থানার ১৫টি গ্রামের কয়েক শ’ মানুষকে হত্যার দায়ে মাওলানা আবদুস্ সুবহানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। প্রসিকিউশনের আনা ২ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের যুক্তিতলা গ্রামে ৫ জনকে হত্যা এবং ৭ নম্বর অভিযোগে পাবনা সদর থানার ভাঁড়ারা ও দেবোত্তর গ্রামে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া ঈশ্বরদী উপজেলার অরণখোলা গ্রামে কয়েকজনকে অপহরণ ও আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁকে। প্রসিকিউশন তাদের ৫, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় সেগুলি থেকে আবদুস্ সুবহানকে খালাস দেয়া হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ, মাওলানা আবদুস্ সুবহানের খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল দায়ের করেন তাঁর আইনজীবীগণ। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন আপীল নিষ্পত্তির আগেই, ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার দুপুর ১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাওলানা আবদুস্ সুবহান ইন্তিকাল করেন। ফিচারটি লেখার সময় জানতে পারি, গত মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ৪ বিচারপতির আপীল বিভাগ, মাওলানা আবদুস্ সুবহানের আপীল মামলা অকার্যকর ঘোষণা করে আদেশ দেন।
কর্মবীর মাওলানা আবদুস্ সুবহান
মরহুম মাওলানা আবদুস্ সুবহান তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে যে সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে গেছেন, তা পাবনাবাসী তো বটেই, সারা বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর সহনশীলতা ও সহাবস্থানের যে নজীর তিনি রেখে গেলেন; তা বর্তমান সময়ের প্রথম সারির রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণীয়, অনুকরণীয়।
ছাত্রজীবনে সমাজকল্যাণমূলক কাজে আঞ্জাম দিতে তিনি ১৯৫৬ সালে ‘আঞ্জুমানে রফিকুল মুসলেমীন’ নামক একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাবনা সদর উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার এবং ১৯৬২ সালে একই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালেই তিনি ১ম বার এবং ১৯৬৫ সালে ২য় বার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য থাকাকালীন, ১৯৬৭ সালে পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এবং ১৯৬৮ সালে জালালপুর জুনিয়র হাই স্কুল ও বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতার পর পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলটি পাবনা ক্যাডেট কলেজে রুপান্তরিত হয়।
এ ছাড়া তিনি পাবনার বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তন্মধ্যে পাবনা ইমাম গাজ্জালী ট্রাস্ট, দুলাই আল্-কুরআন ট্রাস্টের নাম উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন পদে বিভিন্ন সময়ে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, কোমরপুর পদ্মা কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ পরিচালনার সাথে জড়িত ছিলেন। ৫ম ও ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসাবে তিনি পাবনায় অসংখ্য রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের ব্যবস্থা করেন।
দারুল আমান ট্রাস্টের কার্যক্রম ও মাওলানা আবদুস্ সুবহান
১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ডীড-অব-ট্রাস্ট দলীল নিবন্ধনের মাধ্যমে দারুল আমান ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পরপরই পাবনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামের কাছ থেকে শহরের দিলালপুর মৌজার মোক্তারপাড়ায় ট্রাস্টের জন্য পৌনে ৪ কাঠা জমি ক্রয় করা হয়। দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুর রহীম; প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্ট কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ আবদুস্ সুবহান, প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্ট কমিটির সেক্রেটারি মোঃ আবুল হুসাইন, সদস্য মোহাম্মদ আবু তালেব মণ্ডল, কোষাধ্যক্ষ মোঃ আবু হানিফ এবং সর্বশেষ সদস্য মুহাঃ আবদুর রউফ। পরবর্তীতে দারুল আমান ট্রাস্টে মাসজিদে নূর অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে মাসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব আবুল কাশেম আজাদকে ট্রাস্ট কমিটির সদস্য করা হয়। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ মাস পর, ১৯৯৩ সালে ট্রাস্টের সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাবনার কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনালের উত্তরে সাড়ে ৭ বিঘা জমিদাতা আলহাজ্ব আছির উদ্দীন সরদার সাহেবকে ট্রাস্ট কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয়।
কর্মচঞ্চল কর্মবীর মাওলানা আবদুস্ সুবহান, সদাসর্বদা মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রচেষ্টায় আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষার তা’কিদ ও সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন। দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুর রহীম (জেলা আমীর) এবং ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুস্ সুবহান সাহেবের সাথে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পাদিত বিভিন্ন সমাজকর্মের ৩টি দূর্লভ আলোকচিত্র ব্যবহার করে তার সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো।
মাওলানা আবদুহ সুবহানের সর্বশেষ অবদান
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুস্ সুবহান সর্বশেষ নিজস্ব অর্থায়নে দারুল আমান ট্রাস্ট ক্যাম্পাসে একটি দৃষ্টিনন্দন মস্জিদ নির্মাণ করে গেছেন; যা স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্যের দিক থেকে জেলায় সুন্দরতম মসজিদ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বিশালকায় গম্বুজ ও সুউচ্চ মিনার, মাস্জিদটির সৌন্দর্য্য আরও বৃদ্ধি করেছে। ১৫০০ মুসল্লীর ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ মস্জিদটি মাওলানা আবদুসু সুবহান সাহেবের একক অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে।
২০১১ সালের শুরুর দিকে মস্জিদটি নির্মাণের জন্য ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করা হয়। ভূমি উন্নয়নের পর ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন দারুল আমান ট্রাস্টের বর্তমান কমিটির চেয়ারম্যান কন্ট্রাক্টর আবুল হুসাইন সাহেব। দীর্ঘ ৭ বছরে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০১৮ সালে পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মিত হয়। মাসজিদ ভবনে কারুকার্য ও শিল্পকর্ম সম্পাদন শেষে হওয়ার পর; ২০১৯ সালের মে মাসের ৩ তারিখ, শুক্রবার,  আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা কামাল উদ্দীন জা’ফরী সাহেব জুম’আর সালাত আদায়ের মাধ্যমে মাসজিদটি উদ্বোধন করেন।
একটি ভুল তথ্যের অপনোদন
পাবনা দারুল আমান ট্রাস্টের ‘প্রতিষ্ঠাতা কে?’ বিষয়টি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে। এ সম্পর্কে দু’একজন মিডিয়াকর্মীর সঠিক তথ্য না জানার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে আমি মনে করি। জনশ্রুতি, ভাবাবেগে যা বলা হচ্ছে- লিখা হচ্ছে, ‘পাবনা দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা অথবা প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুস্ সুবহান’ কথাটি সঠিক নয়। বরং মাওলানা আবদুস্ সুবহান ছিলেন দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্ট কমিটির চেয়ারম্যান।
প্রকৃত বিষয় হলো, দারুল আমান ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর। দারুল আমান ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের মরহুম হারুনর রশীদ প্রামাণিকের ছেলে মুহাম্মদ আবদুর রহীম ‘প্রথমপক্ষ’ এবং ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার জিম্মাদারগণ ‘দ্বিতীয় পক্ষ’ হিসেবে ‘সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট, ১৮৬০’ অনুসারে সম্মিলিতভাবে ‘ডীড অব ট্রাস্ট’ নিবন্ধিত করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের ‘প্রথম ট্রাস্ট কমিটি’-কে ডীড-অব-ট্রাস্টে ‘জিম্মাদারগণ’ বলা হয়েছে। বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য, ডীড-অব-ট্রাস্টের দলীলের নমুনাকপি (facebook.com/DarulAman.Trust) লিংক-এ গেলেও দেখা যাবে।
নিম্নে দারুল আমান ট্রাস্ট গঠনকালীন সময়ে সম্পাদিত দলিলের প্রথমাংশ হুবহু উল্লেখ করা হলোঃ
“পরম করুণাময়ের নামে আরম্ভ করিতেছি যে, এই জিম্মা দলিলটি (Deed of Trust) ইংরেজী ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারিখে প্রস্তুত হয়েছে, মৌলানা মোহাম্মদ আবদুর রহিম, পিতা মরহুম হারুন অর রশিদ প্রামাণিক সাকিন মধুপুর, থানা ও জেলা পাবনা (এই দলিলে যাকে প্রতিষ্ঠাতা বলা হবে) একপক্ষ এবং
১। মৌলানা মোহাম্মদ আবদুস সোবহান, পিতা মরহুম মুন্সী নঈম উদ্দিন আহ্মেদ পাথরতলা, হাজী মোহসিন রোড, থানা ও জেলা পাবনা।- চেয়ারম্যান।
২। মৌলানা মোহাম্মদ আবদুর রহিম, পিতা মরহুম হারুন অর রশিদ সাকিন মধুপুর, থানা ও জেলা পাবনা। ভাইস চেয়ারম্যান।
৩। মোহাম্মদ আবুল হোসেন, পিতা মরহুম আবদুল মান্নান সাকিন গোপালপুর, থানা ও জেলা পাবনা। সেক্রেটারী
৪। মোহাম্মদ আবু তালেব মণ্ডল, পিতা মোহাম্মদ আছির উদ্দিন মণ্ডল সাকিন ভেলুপাড়া, থানা ঈশ্বরদী, জেলা- পাবনা।
৫। মোহাম্মদ আবু হানিফ. পিতা মরহুম আলহাজ্ব চাঁদ আলি প্রামানিক সাকিন শালগাড়িয়া, থানা ও জেলা- পাবনা। কোষাধ্যক্ষ।
৬। মৌলানা মোহাম্মদ আবদুর রউফ, পিতা মরহুম শরীয়তুল্লাহ্ মণ্ডল সাকিন চক ছাতিয়ানী, থানা ও জেলা- পাবনা।
(অত্র দলিলে যাদের জিম্মাদারগণ বলা হবে) অপর পক্ষের মধ্যে ... যাহাদের নিকট এই দলিল পৌঁছিবে তাদের সকলের উদ্দেশ্যে আমি প্রতিষ্ঠাতা এতদ্বারা নিম্নরূপ ঘোষণা করছি,
১। আমি এই ট্রাষ্টের প্রশাসনের জন্য নিজেকে প্রথম জিম্মাদার (ঞৎঁংঃবব) নিযুক্ত করছি এবং এই ট্রাস্ট পরিচিত হবে “দারুল আমান ট্রাস্ট” নামে সবশেষে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে প্রার্থনা করছি- কর্মবীর মরহুম মাওলানা আবদুস সোবহানের জীবনে সম্পাদিত যাবতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডকে তিনি সদকাতুল জারিয়াহ্ হিসেবে কবুল করুন এবং চিরসূখী জান্নাত নসীব করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ