শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

কুমারখালীতে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে ভ্যাটে কাজ করায় শত শত তাঁত শ্রমিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া): জেলার কুমারখালীতে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে ভ্যাটে সুতার রং করার কাজ করায় হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বিষাক্ত পানি নদীতে পড়ে দূষিত হচ্ছে মিঠা পানির গড়াই।

কুমারখালী উপজেলায় প্রায় ৫৫ হাজার তাঁতী শুধু মাত্র কাপড় উৎপাদন করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ সূতা তৈরি এবং সুতার রং এর কাজ করে। আর এই রং এর কাজে ব্যবহার হয় এসিড, কষ্টিক, সোডিয়াম, ডিটারজেন্ট, নাইট্রিকসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত কেমিক্যাল। এখানকার তাঁতীরা কোন ধরনের প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে খালি হাতে এসব বিষাক্ত কেমিক্যালের কাজ করে আসছে। এতে বিভিন্ন ধরনের চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। শ্রমিকদের অভিযোগ কোন বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এই কাজ করছেন বছরের পর বছর। কষ্টার্জিত এই কাজের সঠিক পারিশ্রমিকও পান না তারা। শুধু যে এখানকার শ্রমিকরাই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়, এসব কেমিক্যালের মিশ্রনযুক্ত পানি গিয়ে সরাসরি পড়ছে দেশের মিঠা পানির আধার গড়াই নদীতে। সরেজমিনে দেখা যায়, এসব সুতা ফ্যাক্টারির মালিকরা ছোট মাটির ড্রেন করে কেমিক্যালের বিষাক্ত দূষিত পানি গড়িয়ে দিচ্ছে গড়াই নদীতে। এতে করে নদীর পানি লালচে হয়ে গেছে, নদীর মাছও মারা যাচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার জীব ও বৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক হাজার তাঁত কারখানা থেকে একযোগে কাপড়ের কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি গড়াইয়ে মেশার কারনে পানির পিএইচ ও উৎপাদন ক্ষমতা থেকে শুরু করে এই নদীর পানি একেবারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মিঠা পানি ও সুন্দরবনের স্বার্থে কিংবা জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষায় এই পানিকে বাঁচাতে হবে। এখনই তাঁত শিল্পকে বাচাঁতে শ্রমিকদের ও মালিকদের সকল সমস্যা দূর করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গর্বিত এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার দাবি তাঁতীদের। অবশ্য তাঁত বোর্ড বলছে, এখানকার তাঁতীরা নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে তাঁত শিল্প চালিয়ে আসছে। কিন্তু এখন তাঁত বোর্ড এই শিল্পকে ডিজিটাল করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। হাত ছাড়া শুধুমাত্র যন্ত্রের মাধ্যমে রং মেশানোর কাজ চলছে। এজন্য তাঁতীদের ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। এতে করে উৎপাদনও বেশি হবে। চিকিৎসকরা বলছেন এভাবে চলতে থাকলে এসব কেমিক্যালের প্রভাবে শ্রমিকদের শুধু চর্ম রোগসহ ক্যান্সার পর্যন্তও হতে পারে। তাই এই ধরনের কাজ করার সময় সব দিক থেকে সুরক্ষিত থেকে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। না হলে অদূর ভবিষ্যতে কুমারখালী সহ সারা কুষ্টিয়া চরমভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ বললেন, তাঁত শিল্প কুমারখালীর ব্রান্ডিং শিল্প। তাঁতের মাধ্যমেই কুমারখালী প্রসিদ্ধ। এই শিল্প নানা কারনে হুমকির মুখে পড়েছে। সকল তাঁত মালিকদের সাথে কথা বলে এটিকে আধুনিক করার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এই শিল্পকে আরো গতিশীল আধুনিক করে এর সকল সমস্যা দূর করা হবে। এদিকে তাঁতবোর্ডে উদ্যোগে ইটিপি স্থাপনের কায্যক্রম আজও সফলতা পায়নি। তাঁত শিল্প মানেই কুষ্টিয়ার কুমারখালী। কুমারখালীর নামের সাথেই মিশে আছে প্রসিদ্ধ তাঁত। কুমারখালীতে আন্তজার্তিক পুরষ্কার প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বুলবুল টেক্সটাইল, নুরুল টেক্সটাইল, রানা টেক্সটাইলসহ প্রায় অর্ধশত দেশের খ্যাতিমান টেক্সটাইল রয়েছে। যেখানে উৎপাদন হচ্ছে দেশের সুনামধ্য লুঙ্গী, বেডশীট, চাদর, গামছাসহ তাঁতী পোশাক। এসব পোশাক দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী হচ্ছে দেশের বাইরে। আর এসব টেক্সটাইলে কাঁচা মাল হিসাবে যুগযুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সুতা। আর এই সুতা রং করে আসছে কুমারখালীর একটি গোষ্ঠি। বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানার ছোট ছোট ভ্যাটসহ ৭টি ফিরোজা ও কালো ডাইং স্থাপিত হয়েছে। এসব ডাইংয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোন রকম প্রতিরোধ ছাড়াই খালি হাতে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে রং এর কাজ করছেন এখানকার কয়েক হাজার তাঁত শ্রমিক। এতে চর্মসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ