শনিবার ০৬ জুন ২০২০
Online Edition

রসূল মুহাম্মাদ (স.)- মানবতাবাদী নাট্যকার জর্জ বার্নাডশ’র দৃষ্টিতে

মনসুর আহমদ : রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায় মধ্যযুগ যার বিস্তৃতি ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত, তার শুরুতে যখন রাষ্ট্রদর্শন ছিল একান্তভাবে ধর্ম ও রাজনীতি বিবর্জিত, গোটা সভ্য জগৎ যখন রোম, ও ইরান তথা প্রাচ্যের সম্রাটদের হাতে নিষ্পেষিত নির্যাতিত হয়ে বার বার চিৎকার দিয়ে ‘কোথায় মুক্তি দাতা কোথায়’ রবে আকাশ বাতাস ভারী করে তুলছিল তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্যাতিত, নিগৃহিত,  লাঞ্ছিত বিশ্বমানবতাকে মুক্তি দিতে এলেন রসূল মুহাম্মাদ (স.) ।
গ্রীস, রোম, পারস্য, চীন এমনকি ভারত বর্ষের প্রাচীন সভ্যতায় ঘূণ ধরে যাওয়া সমাজের বিপুল জনসাধারণ যে চরম দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিল, তা থেকে বাঁচিয়ে রসূল (সঃ) বিশ্বকে এক আলোকোজ্জ্বল রাষ্ট্র ব্যবস্থা উপহার দিয়েছিলেন।
রসূল (স.) লক্ষ্য করেছিলেন বিশ্ব অশান্তির মূলে বিরাজ করছে বংশীয় মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। তাই তিনি নির্যাতিত মানবতাকে  এই দ্বন্দের হাত থেকে মুক্তি দিতে ঘোষণা প্রদান করলেন, “হে লোকেরা, সমস্ত মানুষ মাত্র দু’টি ভাগে বিভক্ত। একটি ভাগের লোক সৎকর্মশীল ও আল্লাহভীরু, অল্লাহনুগত্য। আল্লাহর দৃষ্টিতে সে খুবই সম্মানার্হ। আর দ্বিতীয় প্রকারের লোক পাপ প্রবণ, দুস্কৃতিকারী, হতভাগ্য।
আল্লাহর নিকট অসম্মর্নাহ, লাঞ্ছিত। আসল কথা হল সমস্ত মানুষ আদমের সন্তান।” বিশ্বের জালেম শক্তি যারা এ ধারণাকে বর্জন করে মানুষের উপরে শাসক হয়ে বসে ছিল তাদেরকে ইসলামের এই শিক্ষাকে গ্রহণ করার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। হিজরী সপ্তম বছরে হোদাইবিয়ার সন্ধি সম্পাদন শেষে বিশ্বব্যাপী ইসলামের আহ্বান ছড়িয়ে দিতে রসূল (স.) এক আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। তিনি তৎকালীন বিশ্বের বৃহৎশক্তি বর্গের ছয় জন সম্রাটের প্রতি ইসলামের আহ্বান জানিয়ে লিপি পাঠালেন।
রসূলের এই আহ্বান অনেকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। যে কারণে রসূল (স.)-কে নির্যাতিত বিশ্ব মানবতাকে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীনভাবে আল্লাহর দাসত্বে আনার জন্য বিশাল বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে।
বর্তমান বিশ্ব এক ভয়ানক রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। দুর্বলদের প্রতি সবলদের অত্য্াচার, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ জগতকে প্রকম্পিত করে তুলছে। বিশ্বের নেতৃত্ব আজ এসে পড়েছে আনাড়ি ও জালিম অধিনায়কদের উপর, যে কারণে তাদের কাছ থেকে বিশ্ববাসী মানবিক আচরণ লাভ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতাকে মুছে ফেলে পর্যদুস্ত মানবতাকে বাচাতে রসূল (স.)-এর আদর্শে ওহীর প্রেরণা নিয়ন্ত্রিত এক দল যোগ্য রাষ্ট্র নায়কে প্রয়োজন। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র জর্জ বার্নাড শ’ তাই বলেছেন, I have studied him, the wonderful man, and in my opinion, far from being an anti- christ he must be called the savior of humanity. I believe that if a man like him were to assume the dictator of the modern world  he would succeed in solving its problems  in a way that would bring it the much needed peace and happiness. “-অর্থাৎ আমি এই চমৎকার মহান ব্যক্তিকে গভীরভাবে দেখেছি । আমার বিচারে তিনি খ্রিষ্টবিরোধিতার বহু দূরে অবস্থান করছেন। তাকে অবশ্যই মানবের মুক্তি দাতা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস কারি যদি তার মতে এক ব্যক্তি আধুনিক বিশ্বের একনায়কত্ব গ্রহণ করেন, তা হলে তিনি বর্তমান বিশ্বের উদ্ভূত সমস্যাবললীর এমন সুন্দরভাবে সমাধান দিতে সক্ষম হবেন যে, তা বিশ্বকে অতি প্রয়োজনীয় শান্তি ও সুখ উপহার দিতে সক্ষম হবে।
বার্নাড শ’ তার এ ঘোষণা করতে গিয়ে অধ্যয়ন করেছেন আধুনিক সভ্যতার উৎসভূমি আমেরিকা ও বৃটেনকে। বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে তিনি আমেরিকা ও বৃটেনকে চরমভাবে ঘৃণা করেছেন। শ’ কখনও আমেরিকা যাননি। তিনি ১৯৩৫ সালে Simpleton of the unexpected নাটকটি মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে আমেরিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
অবশ্য ১৮৯৭ সালে আমেরিকাকে উদ্দেশ্য করে রচনা করেছেন Devil’s Disciple  আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাকে ব্যথিত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বার্নাড শ’কে অশ্রুসিক্ত করেছে। তিনি যুদ্ধকালীন সময়ে রচনা করেন তিনি তখনই গ্রেটবৃটেন এবং তার মৈত্রীদেশগুলোকে জার্মানীর সাথে সমান যোগ্য অপরাধী বলে দায়ী করেন।
তিনি ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। যুদ্ধের করুণ চিত্র তুলে ধরে রচনা করেন ১৯২৫ সালে A Hearthbreak House
শুধু প্রথম বিশ্ব যুদ্ধই নয়, তিনি দেখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।
১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় সম্পূর্ণ বিনা কারণে ওদ্ধত্য আমেরিকা আনবিক বামা নিক্ষেপ করে লাখ লাখ মানুষের হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু করে ছিল সাম্প্রতিক কালের (Latest period) অভিযাত্রা।
এই অভিযাত্রা এক মুহূর্তের জন্য থেমে থাকেনি। জার্মানির জাতিপূজা, রাশিয়ার শ্রেণী পূজা,আফ্রিকা ও আমেরিকার বর্ণ পূজা তাদের সকলের জাতীয় রাষ্ট্র পূজা গত দুই শতাব্দী ধরে বিশ্বে মানুষকে যুদ্ধের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে জ¦ালিয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
মানবতা প্রতিষ্ঠার নামে শক্তির আরাধনা ও গোত্রীয় আত্মপূজা পশ্চিমা সভ্যতাকে মানুষের স্তর থেকে পশু স্তরের নিচে নামিয়ে এনেছে। তাদের অত্যাচারে  নিরীহ মানবতার ক্রন্দন ধ্বণি আকাশ বাতাসকে ভারী করে তুলছে। বিশ্বকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে তাই বার্নাড শ’ আকাক্সক্ষা করেছেন মুক্তিদাতা হিসেবে রসুলের আদর্শের অনুসারী আদর্শবান রাষ্ট্র নায়কদের।
বার্নাড শ’ কী খুঁজে পেয়েছিলেন নবী চরিত্রে? বর্তমান জগতের জন্য মানব দরদী নেতৃত্বের সমস্ত বৈশিষ্ট্য পেয়েছেন তিনি রসূল (স.)-এর মধ্যে। যে যুদ্ধের ভয়াবহতা বার্নাড শ’কে আহত করেছিল, উদ্বুদ্ধ করে ছিল নাটক রচনায়, তিনি তখন দেখতে পেয়েছেন নবী (স.)-এর মধ্যে এক অসাধারণ মানব দরদী মন।
জাতীয়তাবাদ নয়, বর্ণবাদ নয়, বৈশি^ক কোন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উদ্দেশ্যে নয় বরং মানব শাসনাধীন দুর্গত মানবতাকে মানুষের অত্যাচারের কঠিন শৃঙ্খল ভেঙ্গে আল্লাহর অধীনে এনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
কিন্তু কি আশ্চর্য, অতি অল্প সময়ে তিনি মাত্র ২৫০জন সৈন্যের রক্তের বিনিময় জয় করেন ৩০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী এক বিশাল এলাকা।
অপরদিকে এ জন্য দশ বছরে গড় হিসেবে মুসলমানদের পক্ষে প্রতি মাসে একজন শহীদ হন। মানবেতিহাসের পাতায় তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও মানুষের প্রতি এমন নির্মল সম্মানের দ্বিতীয় নজির মিলবে না। রসূল (স.)-এর যুদ্ধগুলোর সঙ্গে আমাদের বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধের সঙ্গতি কেবল মাত্র নামকরণে ।
রসূল (স.)-এর আগমনের পূর্ব-পর কোন সময়ই ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন ব্যবস্থাধীন রাষ্ট্রে বিজিত সৈন্যদের সাথে মানবিক আচরণ করা হয়নি। ১৮৬৪ সালে জেনেভা কনভেনশন, ১৮৬৮ সালের সেন্টপিটার্সবার্গ ঘোষণা, ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন, ১৯৪৯ সালের ১২ই আগস্ট সাক্ষরিত জেনেভা কনভেনশন ইত্যাদি যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি মানবিক আচরণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বসনিয়া- হার্জেগোভিনা, চেচনিয়া, কাশ্মীরসহ সাম্প্রতিককালের আফগানিস্তান, জেরুজালেমসহ বাগদাদের মুসলিম জনসাধারণ ও মুসলিম সৈন্যদে উপর ইঙ্গ- আমেরিকার অত্যাচারের চিত্র গোটা বিশ্বসমাজকে লজ্জায় মাথা নত করতে বাধ্য করছে।
যে জাতি আল্লাহর দেয়া আমানত ভার মাথা নিয়ে মানব প্রেমে আত্মহারা হয়ে মজলুম মানবতাকে জুলমাতের নিকষ কালো আধার থেকে মুক্ত করে হেরার রোশনীতে জীবন ও জগতকে উজ্জ্বল করার জন্য জীবন দান করেছিলেন তারা আজ শক্তিতে মদমত্ত জাতির জাতীয়তার গর্বদীপ্ত পদভারে নিষ্পেষিত হয়ে চলছে। মানবতা রক্ষার নামে একের পর এক মুসলিম দেশগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে মুসলিম বিরোধী শিবির। গায়ে মানে না অপনি মোড়ল সেজে ভিন্ন স্বাধীন দেশে অক্রমণ চালিয়ে সে সব দেশে যে নারকীয় আচরণ চালাচ্ছে তার দিকে বিশ্বের শন্তিপ্রিয় মানুষ থুথু নিক্ষেপ করছে।
বিশ্বকে এ অত্যাচার থেকে বাচাতে রসূলের পথ ধরতে হবে এ আহ্বান জানাচ্ছেন বার্নাডশ’। তার ছোট্ট একটি কারণ ইতিহাসের পাতার দিকে তাকালে সবাই দেখতে পাবেন। মক্কা বিজয়ের পর রসূল (স.) মদীনায় ফিরে যান।
তিনি তার বাহিনীর একজন সৈন্যকেও মক্কা প্রহরার জন্য রেখে যাননি। অথচ তিনি মক্কা নগরীর দায়িত্বভার দিয়ে গেলেন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী আত্তাব ইবনে অলীদের উপরে। এ নিয়ে রসূল (স.)-কে পরবর্তীতে কোন দুঃখ  বোধ করতে হয়নি।
মানুষের হৃদয় জয় এবং রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার এমন দৃষ্টান্ত দেখেই জজর্ বার্নাড শ’ বলেছিলেন তার উপরে বর্ণিত কথা।
আজ বিশ্ববাসী যত  তাড়াতাড়ি রসূলের আদর্শ গ্রহণ করবে তত তাড়াতাড়ি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, যুদ্ধের অনল নিভে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ