মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলাভাষা খোদার সেরা দান

 

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। উনিশশ’ বায়ান্ন সালের এই দিনেও ছাত্র-জনতার কর্মসূচি অব্যাহত ছিলো। ভাষা-আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিলো আমাদের আত্মপরিচয়ের আন্দোলন। সঙ্গত কারণেই সে আন্দোলনে এ জনপদের প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ততা পরিলক্ষিত হয়। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বদানকারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক নানা কর্মসূচির পাশাপাশি সঙ্গীত শিল্পীদের ভূমিকাও ছিলো উল্লেখ করার মতো। উদ্দীপক গানের কলিতে কেবল হৃদয়িক ঝংকারই সৃষ্টি হয়নি, আন্দোলনকারীদের চলার পথকে করেছে সাবলীল ও গতিময়। মূলত গণসঙ্গীত শিল্পী-গীতিকাররাই এর নেপথ্য নায়ক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের আগে ও পরে পঁচিশ বছর তারা নির্মোহভাবে প্রাণ সঞ্চারিত করেছেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে থেকে।

বলা যায়, উনিশশ’ সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গণসঙ্গীতে নতুন জমিন তৈরি হয় বাংলাদেশে। পাকিস্তানী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াবার জন্য দ্রুত গণসঙ্গীতের সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। ১৯৫০ সালেই গড়ে ওঠে ‘ধূমকেতু শিল্পী সংঘ’। এর সংগঠক-পরিচালক ছিলেন শিল্পী নিজামুল হক, মোমিনুল হক এবং তখনকার প্রখ্যাত ছাত্রনেতা গাজিউল হক। ধূমকেতু শিল্পী সংঘ প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শিল্পী সংসদ’। এ সময় ঢাকার বাইরেও নতুন দল গড়ে ওঠে। আব্দুল লতিফ-ভাষা আন্দোলনের এক সরব সংগ্রামী ও খ্যাতিমান শিল্পী। ভাষা আন্দোলন আবদুল লতিফের লেখনীকে ক্ষুরধার করে তুলল, তার কণ্ঠকে করে তুলল উদাত্ত। মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তিনি জ্বালাময়ী ভাষায় লিখলেন সেই গান যে গান শুনে জনগণের শিরা-উপশিরায় রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল। গানে সুরারোপ করলেন শিল্পী নিজে। তারপর গান গেয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে নেমে পড়লেন-“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়- এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়?” এই গানটি কত শতবার গীত হয়েছে তার হিসাব নেই। এই একটি গানের জন্য শিল্পী অমর হবেন বলে ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের ভবিষ্যদ্বাণী আজ সত্য। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রশংসা করে তার লেখা একটি গান এমন ‘আমার দেশের ছাত্র-ছাত্রীর নাই তুলনা নাই/ওরা বছর বছর মরছে বলে/আমরা বেঁচে যাই/ওরা বাংলা ভাষার মান রাখিতে/কইরাছে লড়াই/সেদিন ওরা রাইখ্যাছিল/বাঙালিদের মান/তাই বাংলা ভাষা বিশ্ব সভায়/পাইল রে সম্মান’। আরও একটি জনপ্রিয় গান-‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলিরে বাঙাল/... তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’। ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে এই গানটি খুলনায় ব্যাপক গীত হয়। পরে ঢাকায় প্রচার করেন বিশিষ্ট গীতিকার-সুরকার আলতাফ মাহমুদ। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের আরেক শিল্পী সুখেন্দু চক্রবর্তী ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা অনেক গান গেয়েছেন এবং তার নিজের লেখা গানও ছিলো। এক অখ্যাত বয়াতির কাছেও ভাষা আন্দোলনের গান শুনেছেন তিনি। সে গান ‘ছাড়ব না প্রাণ থাকিতে দুনিয়াতে/ বাংলা বলে প্রাণ যদি যায়’।

১৯৫৩ সালে মহান একুশের প্রথম গান লিখেছিলেন ভাষা সৈনিক আ ন ম গাজীউল হক। সে গানের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ যেন বুলেট। গানের বুলেট উপহার দিয়ে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে উদ্দীপিত করতে লিখলেন-“ভুলব না, ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারি, ভুলব না,/লাঠি, গুলি আর টিয়ার গ্যাস, মিলিটারী আর মিলিটারী/ভুলব না।/‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এ দাবিতে ধর্মঘট,/বরকত সালামের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ/ভুলব না....।” গাজীউল হকের এ গানটির পর আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো/একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি চিরায়িত, স্মরণীয়। গাফফার চৌধুরীর গানটিতে আব্দুল লতিফ ও আলতাফ মাহমুদ দু’জনে সুরারোপ করলেও আলতাফ মাহমুদের সুরে গাওয়া গানটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর বদরুল হাসানের লেখা গান ‘ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙ্গাতে/ ঘুমিয়ে গেল যারা’।

১৯৪৮-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের প্রথম পর্ব থেকে ভাষার গান রচনা শুরু হয়। সর্বপ্রথম গানটি রচনা করেন কবি ও গীতিকার অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী। এতে সুরারোপ করেন প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী শেখ লুৎফর রহমান। গানটির একাংশ এমন: ‘শোনেন হুজুররা/ বাঘের জাত এই বাঙালেরা/ জান দিতে ডরায় না তারা,/ তাদের দাবি বাংলা ভাষা/ আদায় করে নেবে তাই’। তিনি পরবর্তীকালে আরও গান রচনা করেন। যার পটভূমি বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। দুটি গানের কয়েকটি চরণ: ১. ‘বাংলার বুকের রক্তে রাঙানো আটই ফাল্গুন/ ভুলতে কি পারি শিমুলে পলাশে হেরি লালে লাল খুন’, ২. ‘বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা যখন একই নামের সুতোয় বাঁধা’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ