মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতারদের পাচার করা হাজার কোটি টাকা ফেরত আনা অনিশ্চিত

# অস্ত্র মাদক মানি লন্ডারিং (অর্থপাচার) আইনের মামলা তদন্ত চলছে
# আইনি প্রকিয়া শেষ করতে সময় লেগে যেতে পারে ১০-২০ বছর 
নাছির উদ্দিন শোয়েব: ক্যাসিনো কাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের নামে দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, অবৈধ উপার্জন ও মানি লন্ডারিং (অর্থপাচার) আইনে মামলা করা হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অন্যান্য মামলার তদন্ত চলছে। দুর্নীতিদমন কমিশনও (দুদক) একাধিক মামলা তদন্ত করছে। এসব রাঘববোয়ালদের জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত সংস্থা জানতে পেরেছে, বিভিন্ন পন্থায় তারা বিদেশে অন্তত হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন।
এসব টাকা হুন্ডি অথবা ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানি-রফতানির আড়ালে পাচার করেছেন বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বি আইএফইউ) অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। পাচার হওয়া এসব টাকা ফেরত আনতে আইনি জটিলতার কথা বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী পাচার করা টাকা ফেরত আনা খুবই জটিল। আইনি জটিলতা কাটিয়ে অন্তত ১০ থেকে ২০ বছরও সময় লেগে যেতে পারে।
এদিকে ক্যাসিনো গডফাদাররা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হওয়ার পর সর্বোচ্চ আদালত সোমবার দেশে সব ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আদালত এধরনের জুয়া খেলা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের এ নির্দেশের পর এখন দেশে সব ধরনের জুয়া খেলা অবৈধ হলো। এর আগে গত বছর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাসিনো বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে বেশ কয়েকজন রাঘব বোয়াল গ্রেফতার হওয়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এরমধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, শফিকুল আলম ফিরোজ, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, এনামুল হক এনু ও তার ভাই রূপন ভুইয়া, এবং রয়েছেন ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম)।
গ্রেফতার কয়েকজনের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কয়েক কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব-পুলিশ।  সন্ধান মিলছে তাদের কোটি টাকার সম্পদ, ফ্যাট, বাড়িসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদের। তাদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তথ্য মিলছে নানা গ্রেফতারকৃতরা নানা উপায়ে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
জানা যায়, ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালরা অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকায় লন্ডন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ফ্ল্যাট কিনেছেন কিংবা সেখানকার ব্যাংকে জমা রেখেছেন। কেউবা পাচারকৃত অর্থ বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। এ ছাড়া রাঘব বোয়ালরা তাদের ক্যাসিনো বাণিজ্য নির্বিঘ্নে টিকিয়ে রাখতে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের সভাপতি, গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতা (সদ্য বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি, কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক (বিসিবি) লোকমান হোসেন ভূঁইয়া ক্যাসিনোর অর্থ বিদেশে পাচার সংক্রান্ত ব্যাপক তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে লোকমান অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ ও এএনজেড ব্যাংকে ৪১ কোটি টাকা জমা রাখার কথা স্বীকার করেছেন। খালেদ মাহমুদ ভূইয়া বিদেশে ক্যাসিনোর অর্থ পাচারের কথা স্বীকার করলেও মোট টাকার পরিমাণ তিনি জানাননি। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, তার পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ একশ কোটি টাকার কম নয়।
অন্যদিকে গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভুইয়া বিদেশে অন্তত দেড় শত কোটি টাকা পাচার করেছে বলে গোয়েন্দারা প্রাথমিকভাবে বেশকিছু তথ্য প্রমাণ পেয়েছে। যা তারা নানাভাবে ক্রসচেক করে দেখছে। সূত্র জানায়, প্রাথমিক তালিকার তথ্য অনুযায়ী, ক্যাসিনো গডফাদারদের পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে এ অর্থের সঠিক পরিমাণ জানা যাবে।
ক্যাসিনো সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের মালয়েশিয়ার আমপাং তেয়ারাকুণ্ডতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। অনুসন্ধানকালে পুলিশের ইমিগ্রেশন উইং, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ, পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, সেকেন্ড হোমের এজেন্ট, মালয়েশিয়ান হাইকমিশন অনুমোদিত বিভিন্ন ভিসা এজেন্ট থেকে পাওয়া তথ্য, পাসপোর্টের কপি, সেকেন্ড হোম প্রকল্পে অনুমোদনপ্রাপ্তদের অনুমোদনপত্রের কপি ও ব্যাংক হিসাব বিবরণী যাচাই-বাছাইয়ে সম্রাটের মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেসব গডফাদারের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোর অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন শুদ্ধি অভিযানের আগেই বিদেশে ছিলেন। অভিযানের পর আরো অন্তত ১০ জন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। বাকিরা দেশেই কোথাও ঘাপটি মেরে আছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাসিনো গডফাদারের বিশাল অংকের অর্থ পাচারের বিষয়টি তারা পুরোপুরি নিশ্চিত। তবে এর মোট পরিমাণ কত আর্থিক গোয়েন্দারা তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। অর্থের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন তা ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো হবে। যে প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু করা হয়েছে। পাচারকৃত টাকার সিংহভাগ দ্রম্নতই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে দাবি করে সংশ্লিষ্ট সূত্রটির।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা খুবই জটিল প্রক্রিয়া। মূলত দুই প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, অর্থ পাচারের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেতে হবে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা করতে হবে। স্থানীয় আদালতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পক্ষে রায় দিতে হবে। আদালতের এ রায়ের কপি অ্যাটার্নি জেনারেলের অফিস থেকে যে দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে ওই দেশের অ্যাটার্নি জেনারেলের অফিসকে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটার্নি জেনারেল অফিস অর্থ ফেরত দেয়া যায় কি না তা নিয়ে ওই দেশের আদালতে মামলা করবে। সংশ্লিষ্ট দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা রয়েছে কী না তা যাচাই-বাছাই করবে। পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়ে রায় প্রদান করবে। এর পরই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
দ্বিতীয়ত, মামলা করা ছাড়াও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যায়, যদি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কোনো জটিলতা না থাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থা এগমন্ড গ্রম্নপের সদস্য হতে হবে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ ফেরত আনতে ৫ থেকে ১০ বছর, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ