ঢাকা, বুধবার 23 September 2020, ৮ আশ্বিন ১৪২৭, ৫ সফর ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

কঠিনেরে ভালোবেসে

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান:

ঊনপঞ্চাশ বছর পূর্বে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের নিমিত্তে “দৈনিক সংগ্রাম” প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো- সেই লক্ষ্য -উদ্দেশ্য এতো সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়িত হওয়ার মুখ এখনো দর্শন করা যায়নি। কিন্তু সে লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণ করবার অবিরাম সংগ্রাম কি বন্ধ হয়েছে? হয়নি বরং বিরতিহীনভাবে সে সংগ্রাম চলছে তো চলছেই। এ অভিযাত্রার কোনো বিরাম-বিরতি “দৈনিক সংগ্রামের” জীবনে নেই বললেই চলে। দীর্ঘ এ পথ পরিক্রমায় “দৈনিক সংগ্রামের” কি অর্জন সম্ভব হয়েছে? সম্ভব হয়েছে এদেশের একটি বিশাল শিক্ষিত এবং সচেতন ধার্মিক জনগোষ্ঠীর মনের মধ্যে এ প্রত্যয় সৃষ্টি করিয়ে দেয়া- এ সংকল্প বদ্ধমূল করিয়ে দেয়া যে- বাংলার এ ভূখন্ডের আপামর জনগোষ্ঠীর জীবনে যদি শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ এবং নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা লাভের প্রত্যাশা থাকে একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য, কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংকল্প যদি থাকে তবে “দৈনিক সংগ্রাম” যে আদর্শের পতাকাবাহী এবং যে মহান আদর্শের আহবান সর্বস্তরের মানুষের নিকট প্রকাশ ও প্রচার করে তার ভিত্তিতে সে জীবন বিধানের দ্বারা যদি এদেশের সকল কিছুকে ঢেলে সাজানো যায় তবেই স্বস্তি ও নিস্তার। তাহলেই এদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনে হবে সুষমা মন্ডিত। আপামর জনগণ হবে সুখী ও সমৃদ্ধশালী। নইলে এদেশের এ জনপদের জনগণের বিপর্যয় ও দুঃখ কষ্টের চির অবসান এবং কখনো পরিসমাাপ্তি ঘটবার সম্ভবনা নেই সামান্যতমও। এ দেশবাসির জাতীয় আদর্শকে বাদ দিয়ে বিদেশী ও “তন্তমন্ত্র” দিয়ে দেশ ও জাতি চালানোর কসরৎ যারা করছেন- তারা সর্বতোভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সন্দেহাতীতভাবে তারা ব্যর্থতার চোরাবালিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন বৈ কী?

এটাতো শতভাগ সত্য - এদেশের অধিকাংশ মানুষের জাতীয় আদর্শ যা- তাই হচ্ছে “দৈনিক সংগ্রামে”র আদর্শ। যে আদর্শের তারা অনুসরণকারী, যে আদর্শের জন্যে তারা জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত। সে আদর্শই “দৈনিক সংগ্রামে”র আদর্শ। “দৈনিক সংগ্রাম” কোনো বিদেশী আদর্শে আস্থাবান নয়। মানব রচিত কোনো আদর্শই “দৈনিক সংগ্রামে”র নিকট কোনো মতেই গ্রহণ যোগ্য নয়। সুতরাং বিদেশ থেকে অন্য জাতির কোনো মতাদর্শ আমদানীর প্রয়োজন “দৈনিক সংগ্রাম” কখনো অনুভবই করেনা। বিদেশ থেকে প্রযুক্তিগত কলা কৌশল ব্যতীত অন্য জাতির জীবন পদ্ধতি বা আদর্শ আমদানী করণ এবং সেইসব প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালানো- তাই একদম আত্মঘাতী হতে বাধ্য। কারণ এদেশের সেক্যুলারপন্থী পত্র-পত্রিকাগুলোর যেসব আদর্শ এদেশবাসী দীর্ঘকাল ধরে অবলোকন করে আসছেন, সেসব তো ঐশী কোনো আদর্শ নয়। সেসবতো এদেশবাসির জীবন পদ্ধতি বা জীবনাদর্শ নয় বরং তা বিশ্বের লুটেরা জাতির আদর্শ বা নিয়ম-নীতি পদ্ধতি। সেসব জীবন পদ্ধতির দ্বারা এদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র চালানো হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তা কিন্তু আমাদের দেশ ও জাতিকে স্বস্তি ও প্রশান্তি প্রদানে আজ অবধি সক্ষম হয়নি। বরং চরম বিপর্যয় ও সংকটের মধ্যেই নিক্ষেপ করে ছেড়েছে বললে অত্যুক্তি হয়না। 

কোনো দিকেই স্থায়ী শান্তি, স্বস্থি ও নিরাপত্তার চিহ্ণ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। বরং সমস্যা ও সংকটের পর্বত যেনো জাতীয় জীবনের ঘাড়ে এসে ধীরে ধীরে চাপছে বলেই প্রতীয়মান। সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে। সমাজ জীবন অস্থিতিশীল করে শুধু লুটপাটই চলছে অবিরাম। জাতীয় সম্পদ ও অর্থ লুটের মহোৎসবই যেনো চালানো হচ্ছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। 

সুতরাং করুণ এ অব্যবস্থা দেখে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে- মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত চিন্তা-চেতনা এবং অন্য জাতির থেকে ধার করা মতাদর্শগুলো সবই বস্তা পঁচা এবং নিখুঁত ভেজাল সর্বস্ব বই অন্য কিছু নয়। যা মানব জীবনকে স্বস্তি ও প্রশান্তি প্রদানে সক্ষম হচ্ছেনা। জোড়াতালি দিয়েও নয়। পক্ষান্তরে নিদারুণভাবে পন্ড কর ছাড়ছে গণমানুষের সকল আশা ও সামর্থকে। সবই পাকা হচ্ছে কিন্তু মানুষের জীবন যে সর্বদিকেই কাঁচা রয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ স্বস্তি ও শান্তির প্রচন্ড অভাব প্রকট আকার ধারণ করছে তাতো মিথ্যে নয়। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও মনে হচ্ছে আমরা যেনো স্বস্তিহীন। আমাদের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। স্বাধীন হয়েও মনে হয় হাত পা বাঁধা। স্বাধীন দেশে স্বাধীন মতামতের কোনো মূল্য দেয়া হয় না। ভিন্ন মত ও পথকে গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। মনে যা আসে তাই করা হচ্ছে নির্বিচারে, নির্বিকারভাবে।  “দৈনিক সংগ্রাম” ছাড়া অন্য সব পত্র পত্রিকাগুলোর অধিকাংশের মুখ্য লক্ষ্য যেহেতু অর্থনৈতিক বা আর্থিক লাভালাভ। সেহেতু তাদের আদর্শ আর যা-ই থাক, আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনে যা-ই ঘটুক তাতে তাদের মাথা ব্যথা নেই বললেই চলে। কারণ দেখে শুনে মনে হয় তারা শুধুই আদর্শের জন্যে লড়াই করেন না। পত্রিকাও প্রকাশ করেন না। তাদের সমর্থিত দলবল যদি ক্ষমতায় থাকেন- তবেতো কথাই নেই। ষোল কলায় বর্তে যেতে বাধ্য তারা। 

 

পত্রিকার জন্যে ব্যাপক বিজ্ঞাপন হস্তগত করা এবং নানাবিধ সুযোগ সুবিধা পেতে তাদের বেগ পেতে হয়না। কারণ ঐসব পত্র পত্রিকাগুলোর প্রধান কর্মই হলো ক্ষমতাসীনদের গুণকীর্তন করে কীর্তিমালা ফলাও করে তুলে ধরা- বিনিময়ে নানাবিধ উপঢৌকনের অফুরন্ত মিছিল। উন্নয়নের ঢাক ঢোল পিটিয়ে জনগণের দৃষ্টিকে সম্মোহিত করে তোলা। বলাবাহুল্য এ কর্মে তারা অতীব পারদর্শী। তারা ঘি তেল খেয়েই একেকজন বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক মোক্তার হয়ে যান।

কিন্তু “দৈনিক সংগ্রাম” কর্তৃপক্ষের বিত্ত থাক বহুদূর- চিত্তই থাকে তাদের শংকায় ভরপুর। কখনো আবার খড়গ আসে নেমে। এমন ত্রিশংকু অবস্থা ও ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই “সংগ্রামের” পথ চলা। সাম্প্রতিক দস্যুপনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। “সংগ্রামের” এ পথ চলা কখনোই কুসমাস্তীর্ণ নয় আদৌ। ছিলোনা কোন কালেই। ‘সংগ্রাম’ যে সত্য পথের পথিক- সে সত্য পথ বড়ই কঠিন ও বন্ধুর। সে পথে চড়াই উৎরাই অবধারিত অনিবার্য এবং অত্যধিকও বটে। ধৈর্য্য ও সংযমের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন ব্যতীত টিকে থাকা এবং অগ্রসর হওয়া সহজসাধ্য নয়। 

সুতরাং এ কঠিনেরে ভালোবেসে “দৈনিক সংগ্রাম” তার সংগ্রামী কর্ম চালিয়ে যাচ্চে দীর্ঘকাল নিরবধি। এ অভিযাত্রার শেষ বলে কিছু নেই। এদেশ এজনপদ যতোকাল টিকে থাকবে তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রেখে ততোদিনই “দৈনিক সংগ্রাম” তার পথ চলাকে অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা তার চিরকালীন মহান দায়িত্ব। এদেশ এজনপদের সকল মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে, এদেশের সকল স্তরের আবাল বৃদ্ধ বণিতার পার্থিব ও পারত্রিক জীবনকে ঐশী আদর্শের আলোক মালায় সুসজ্জিত করবার আপ্রাণ প্রয়াস যেহেতু তার মুখ্য উদ্দেশ্য সেহেতু সে গুরুদায়িত্ব বোধের ঘাটতি যাতে না ঘটে সে প্রয়াস তার চিরকর্মের অন্তর্ভুক্ত। 

এর ব্যত্যয় ও ব্যতিক্রম কখনো কাম্য নয়। এ পথ চির দুর্গম-দুস্তর, চির কষ্টের এবং সর্বোপরি কলিজার ঘাম ঝরানোর অমোঘ নিয়মে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। পূর্বে যারা এ পথের পথিক ছিলেন- তাঁরা সকলেই চরম পরখ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সফলকামও বটে। 

সুতরাং “দৈনিক সংগ্রাম’’র ফেলে আসা দিনের দিকে ফিরে তাকানোর সময় ও সুযোগ নেই বললেই চলে। একমাত্র পরম সত্যকে অবলম্বন করে শুধু সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাই তার পথ চলার সম্বল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ