ঢাকা, মঙ্গলবার 29 September 2020, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ১১ সফর ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

সা ক্ষা ৎ কা র - মেজর জেনারেল (অব.)  সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম , চেয়ারম্যান বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

 

আমার মতে তথ্য প্রযুক্তি আইনকে জরুরী ভিত্তিতে সংশোধন করা প্রয়োজন। তা না হলে সাহসী সাংবাদিকগণ তাদের মেধা বিকশিত করতে পারবে না। একইসাথে দেশ ও জাতি বস্তুনিষ্ঠ  সত্য সংবাদ থেকে বঞ্চিত হবে। 

সংগ্রাম : আগামী ১৭ জানুয়ারি দৈনিক সংগ্রামের ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠানটির সাংবাদিক-কর্মচারী ও পাঠকের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : দৈনিক সংগ্রামের সকল শুভানুধ্যায়ী, পাঠক সম্প্রদায় বর্তমান ও সাবেক কর্মকতাদের শুভেচ্ছা থাকলো। দৈনিক সংগ্রাম এই সরকারের আমলে একটি কঠিন সময় পার করছে। এই কঠিন সময়ে আমার এই শুভেচ্ছা বক্তব্যটি তাদের জন্য যেন সুমিষ্ট পানির মতো উপকারে আসে, সেই আশাই করবো। আমি দৈনিক সংগ্রামের সাথে জড়িত সবার কল্যাণ কামনা করছি। আশা রাখছি পত্রিকাটি দেশ, দেশের গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সাবভৌমত্ব রক্ষায় তাদের ভূমিকা রাখবে। 

সংগ্রাম : তথ্য-প্রযুক্তি আইন গণমাধ্যমের মাথার উপর ঝুলন্ত খাঁড়ার মত। আপনার অভিমত বলুন।

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : খুব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তথ্য প্রযুক্তি আইনটি পাশ হয়েছে। পাশ হবার আগে এটি নিয়ে যথেষ্ট আলাপ আলোচনা হয়েছে। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী এটার পক্ষে অনেক যুক্তি দিয়েছেন যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটির প্রয়োগ করা হবেনা। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি আইনের অধীনে এ পর্যন্ত যত ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, তাদের মধ্যে ব্শেীর ভাগ সংখ্যাই হচ্ছে কিন্তু সাংবাদিক। একইসাথে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অধীনে আরও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। এই আইন মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর বিরাট একটি আঘাত এসে দাড়িয়েছে। আমি মনে করি সাংবাদিক ভাইগণ যে শব্দটি ব্যবহার করেন সেটি সঠিক। শব্দটি হলো ‘সেলফ সেন্সরশীপ’। স্ব নিয়ন্ত্রিত সেন্সরশীপ। এটি টেলিভিশনের ক্ষেত্রে সাংঘাতিকভাবে প্রযোজ্য। মুদ্রিত পত্রিকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবং অনলাইন পত্রিকাগুলোর জন্য আরও বেশী প্রযোজ্য। তবে এর মধ্যে কথা আছে। অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা আবার অনেক বেশী। কিছু সংখ্যকের ভৌত কাঠমো ভালো। কিছু সংখ্যকের ভৌত কাঠমো দুর্বল। কিছু সংখ্যক অন্যের কাছ থেকে ধার করে চলে। কিছু সংখ্যক নিজেরাই সংবাদ সংগ্রহ করে ভেরিফাই করে তারপর চাপান। আমার বক্তব্য দাড়ালো, উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে শক্তিশালী বলিষ্ঠ  ও দক্ষ সাংবাদিক সম্প্রদায় যেমন গড়ে উঠেনা, তেমনি উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে দক্ষ, সাহসী সাংবাদিকগণ যারা বিধ্যমান, তাদের মেধাও বিকশিত হতে পারে না। মাঝখানে জনগণ কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ  সংবাদ থেকে বঞ্চিত হন এবং দেশ বিপদে পড়ে। মানুষ যদি অজ্ঞ থাকে, মানুষকে যদি অসচেতন রাখা হয় তাহলে যে শেষ পর্যায়ে দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার মতে তথ্য প্রযুক্তি আইনকে জরুরী ভিত্তিতে সংশোধন করা প্রয়োজন। 

সংগ্রাম : ২০ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, জাতীয় মুক্তি মঞ্চ গঠনের বিষয়গুলোকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?  

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : বিষয়টি স্পর্শকাতর। যাদেরকে নিয়ে কথা বলবো তারা আমাদেরই সংগঠন, আমারই সংগঠন। আমরা সকলেই সহকর্মী। সকলেই রাজপথের সহকর্মী। সুতরাং আমাদের যা কিছু বলা দরকার সেটি বস্তুনিষ্ঠভাবেই বলতে হবে। ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে। অন্তত আমার সাক্ষীটা আমি দিতে পারি। তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সদর দপ্তরের চেয়ারম্যান কার্যালয়ে আসেন দাওয়াত নিয়ে। অনেকক্ষণ আলোচনা হয়। কল্যাণ পার্টির সবাই ছিলেন। আলোচনার পর উনি দাওয়াত দিয়েছিলেন যে, উনি চারদলীয় জোটকে সম্প্রসারিত করতে চান। এবং এই লক্ষ্যে আরও অনেকগুলো দলকে দাওয়াত দিতে চান। কল্যাণ পার্টি নিজেরা আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয় যে সম্প্রসারিত চারদলীয় জোটে যাবে। দাওয়াতের কিছুদিন পর আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গুলশান কার্যালয়ে গিয়েছিলাম এবং উনার সাথে কথা বলার পর ২০১২ সালে আমরাসহ ১৮ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে আরও দুটি দল যোগ দেয়ায় সেটি ২০ দল হয়েছিল। এরপর আরও ৩টি দল যোগ দিলে সেটি ২৩ দলীয় জোট হয়। কিন্তু নামটা আমরা রেখে দিয়েছি ২০ দলীয় জোট হিসেবেই। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সাড়ে তিনমাস আগে বিএনপির উদ্যোগে এবং অন্যান্য কয়েকটি দলের আগ্রহে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি জোট আত্মপ্রকাশ করে। 

 

২০ দলীয় জোটের সকলেই সেখানে যায় নাই। সকলের পক্ষ থেকে বিএনপি সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে ড. কামাল, আ স ম রব, মান্নারা ছিলেন। বি চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্প ধারা নামক দলটিও থাকার কথা ছিল। কিন্তু অনেক টানাপোড়েন, বাক বিতন্ডার পর তারা থাকেনি। ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে। তখনই ধু¤্রজাল ছিল কিছুটা। এর কারণ হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের বেশীর ভাগ নেতৃবর্গ সাবেক আমলে আওয়ামী ঘরানার ছিলেন। বিএনপি ঘরানার বিরোধী ছিলেন। যখন ঐক্যফ্রন্ট হয় তখন এই প্রশ্নটি বারবার এসেছে যে, উনারা বেগম খালেদা জিয়ার নাম কতবার নিবেন , শহীদ জিয়ার নাম কতবার নিবেন, তার মুক্তির জন্য কিছু করবেন কিনা ইত্যাদি। তখন আরও একটি বিষয় এসেছিল বিএনপি নামক একটি বিখ্যাত দল ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। যেখানে জামায়াত বিএনপি পাশাপাশি বসে। একই বিএনপি আবার ঐক্যফ্রন্টে আসছে। তাদের গায়ে জামায়াত গন্ধ আছে। ঐক্যফ্রন্টের সাথে বসব কিনা। এই ধরণের অনেক প্রিশ্ন উঠেছিল। 

নির্বাচন হয়ে গেল। আমি বলতে চাচ্ছি, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের নির্বাচন যেটা ২৯ ডিসেম্বর রাতে হয়ে যায়, যেখানে অবৈধভাবে, ডাকাতি করে, লুন্ঠন করে ভোট নেয়া হয়। সেটা শেষ হবার পর বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যাবে কি যাবে না এই অবস্থা ১৮০ ডিগ্রীতে সব কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। ২০ দলীয় জোটের ২/৩টি দল আমরা মনে করলাম ২০ দলীয় জোট কখন দাওয়াত দিবে, কখন আওয়াজ দিবে সেটির জন্য অপেক্ষা না করে আমরা একটি পৃথক জানালা খুলি। আমাদের ঘরের নাম বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। আমরা এই ঘর থেকে একাধিক জানালা খুলি। সেই একটি জানালার নাম হলো ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’। উদ্দেশ্য বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করা। সেখানে সমমনা অনেকগুলো দল থাকলো। কিছু দল প্রকাশ্যে না এসে পেছন থেকে সহযোগিতা করলেন। বললেন, সময়মত আসবো। এরকম করতে করতে আবার জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ ২০১৮ আমরা লক্ষ্য করলাম ‘গণতন্ত্র উদ্ধার মঞ্চ’ নামে আরেকটি দল বা ব্যানার রাজপথে নামলো। সেখানে রব, মান্না, সম্ভবত গণফোরাম আছেন।  তারা মৎস্যভবনের সামনে যে সমাবেশ করলেন সেখানে জাতীয় মুক্তি মঞ্চের পক্ষ থেকেও মিছিল গেল। কিন্তু সেই মিছিলটিকে সানন্দে বা স্বহৃদয়ে গ্রহণ করা হলো না। মিছিলটির নাম প্রকাশ করা হলো না। ঘোষণা আসলো না।

দেশের সিনিয়র এ রাজনীতিবিদ বলেন, অনেক ধরণের টানাপোড়ন শুরু হয়ে গেছে। এর মধ্যে কেউ প্রশ্ন করছে যে এখন এতগুলো ফ্রন্ট, জোট, ম্ঞ্চ। তাহলে বেগম জিয়ার মুক্তির কি হবে? বা ২০ দলীয় জোটের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। আমি বারবার বলবো অতীতেও বলেছি ২০ দলীয় জোট থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে। থাকতে হবে। ঘর একটাই। ঘরটার নাম হচ্ছে স্বৈরাচার হটাও আন্দোলনের ঘর। অবৈধ সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হটিয়ে দেওয়ার আন্দোলনের ঘর। তার একাধিক জানালা বের হবে। একাধিক জানালা কেটে মানুষ আওয়াজ দেয়ার চেষ্টা করছে। সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় নিশ্চয়ই এই সরকারের পতন হবে। তবে ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করতে হলে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া দরকার সেগুলো এখন নেয়া যাচ্ছেনা। এগুলো এখানে প্রকাশ্যে না বলে উপযুক্ত ফোরামে বলতে পারলে ভালো হবে। ২০ দলীয় জোটটি সময়ের তালে তালে পুরোপুরি চলতে পারে নাই। এটি জনগণের সমস্ত আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটাতে পারে নাই। অতএব আবার সবকিছুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ঘাড়ে গিয়েই পড়বে। তাদের সামনেই চ্যালেঞ্জগুলো এসে যাচ্ছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন প্রয়োজন। আমরা সেই আন্দোলনে থাকতে চাই। এবং সেই আন্দোলনের প্রধান নেতা হবে বিএনপি, তাদের পাশে থাকতে চাই। আমরা পাশে আছিও। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামের নেতৃত্বে বিএনপি তাদের সাথে কল্যাণ পার্টি সবসময় থাকবে। 

সংগ্রাম : প্রশাসনসহ সর্বত্র দলীয়করণের একটি অভিযোগ উঠেছে-এটিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কাঠামো যাই থাকুক না কেন এখন সেটি নিয়ান্ত্রত হচ্ছে এক জায়গা থেকে। সেটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি কতটুকু কাম্য এটা বিবেচনার বিষয়। কিউবাতে ৪০ বছরের বেশী শাসন ক্ষমতায় ছিলেন ফিডেল কাস্ট্রো। তিনি মারা যাবার পর সেই একদলীয় শাসন থেকে মুক্তি পেতে তাদের ১০/১২ বছর লেগেছিল। আরেকটি রাষ্ট্র লিবিয়া। ভীষণ ধনী দেশ ছিল। ৪৪/৪৫ বছর শাসন করেছিল গাদ্দাফি নামক এক ব্যক্তি। তিনি ক্যুর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে শাসনভার নিয়েছিলেন। তিনিও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখে ক্ষমতা হারালেন একইসাথে নিজের প্রাণও হারালেন। আমি বলতে চাচ্ছি যত টাইট নিয়ন্ত্রণে একটি দেশকে রাখা হয় সেই দেশটির আসল নিরাপত্তা কিন্তু ততই বিঘিœত হতে থাকে। কারণ একক ব্যক্তিত্ব সরে গেলে তখন তাসের ঘরের মতো সকল কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে। আমি মনে করি বাংলাদেশে বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বাধীন এ চলছে। আওয়ামী লীগের মধ্যকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আমার মন্তব্য করা উচিৎ না। কিন্তুৃ দেশের প্রসঙ্গে দেশের নাগরিক হিসেবে আমি মন্তব্য করবো  প্রধানমন্ত্রী যেন এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেন। তিনি যেন আরও বেশী ব্যক্তিকে, প্রশাসনিক যন্ত্রকে তিনি ইনভলব করেন। 

সংগ্রাম : দেশে এখন নানাবিধ সমস্যা বিরাজমান। আপনার দৃষ্টিতে চলমান মূল সমস্যাগুলো কি কি? একইসাথে করণীয় কি?

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : দেশের সমস্যা অনেক বলা যায়। আমরা শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু হাজারো সমস্যা বিরাজমান। এর মধ্যে বজ্য ব্যবস্থাপনা দেশের জন্য মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করছে। বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। পলিথিনের কারণে ভূগর্ভে পানি যাচেছনা। আমি মরে যাবো। কিন্তু আমার সন্তানের পরিবেশ কে দেবে। নদী রক্ষায় কেউ কেউ চেষ্টা করছে। কিন্তু এককভাবে সেই চেষ্টা কখনো সফল হবেনা। নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে দুই পাড়ের মানুষকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ কঠিন সময়ের সামনে দাড়াবে। জীবনযাত্রা প্রণালী পরিবর্তন হচ্ছে। ক্যাসিনো অভিযানে যাদের নাম এসেছে তারা আবার নির্বাচন করছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। তার মানে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতেই এই ক্যাসিনো অভিযান। এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি এখন আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ব্যাংক, শেয়ারবাজার, কুইকরেন্টাল, পদ্মাসেতু, এগুলোতে দুর্নীতির খবর প্রকাশ হলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। 

রাজনীতিক বিভাজন দেশের বড় একটা সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং বিপক্ষের শক্তি বলে বিতর্ক আর কত দিন চলবে সেটি এখন বড় প্রশ্ন। অনেকেই বলছেন, এই বিভাজন এখন চলে যাবার সময়। কারণ এখন এসে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষ এবং স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করার পক্ষ। যুদ্ধের সময় সারা দেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। বিরোধীতা করেছে এটিও ঠিক। তারা ছিল খুবই সামান্য। কিন্তু তাদের সেই সংখ্যা এখন অনেক কমে এসেছে। তাদের আনুগত্য করে গেছে। বিভাজীত সমাজ উন্নীত হতে কষ্ট হয়। আমি মনে করি যারা ক্ষমা করে দেন তারাই বেশী উদার হন, তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। 

এছাড়া পররাষ্ট্রনীতিতে আমাদের ত্রিমুখী টানাটানি আছে। একপক্ষ হচ্ছে ভারতপন্থী। একপক্ষ হচ্ছে চীনপন্থী। একপক্ষ হচ্ছে মার্কিন বা ইউরোপ পন্থী। এরকম একটা টানাটানির মধ্যে একটা দেশ চলা খুবই মুশকিল হয়ে যায়। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় অকাতরে সহযোগিতা করেছে এটাও ঠিক। কিন্তু তাদের একটা লক্ষ্য ছিল । আমরা তাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বলা হচ্ছে তাদের সাথে বন্ধুত্ব এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। কিন্তু এই সরকারের আমলে আমাদের স্বার্থ হানিও সবচেয়ে বেশী হয়ে যাচ্ছে। আমরা এটাকে কিভাবে পুনরুদ্ধার করবো জানি না। তাদের কৃতজ্ঞতার সীমারেখা নিয়ে কখনো আমরা আলোচনা করি নাই। এখনো আলোচনা করা প্রয়োজন। যে কোন বিষয় বেশী টানলে নষ্ট হয়ে যায়, ছিড়ে যায়। 

সংগ্রাম : তৃণমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলন চায় আর আপনারা নীতিনির্ধারকরা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে কি বলবেন? 

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগকে দেশে ক্ষমতায় আনা হয়েছে। বর্তমান সরকার ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করেছে। তখনই বিরোধী জোটের রাজপথে আন্দোলন নামা উচিৎ ছিল কিন্তু কেন তারা আন্দোলন স্থগিত করেছেন সেটি আমি জানিনা। সেটি ছিল মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল। ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচনে যাই না। অনেকেই বলেন, এটি কুত্তা মার্কা নির্বাচন ছিল। আমি সেটি বলতে চাইনা। বলতে চাই ভোটারবিহীন নির্বাচন। প্রতিবাদে খালেদা জিয়া অবরোধ ডেকেছিলেন। সেটি কতটুকু কার্যকর হয়েছে সেটি মূল্যায়নের দাবি রাখে। আমি বলতে চাই, পরিকল্পনাবিহীন কোন রাজনৈতিক ডাকের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। 

এখন আবার অনেকেই বলছে, তৃণমূল চাচ্ছে আন্দোলন। তৃণমূল যে আন্দোলন চাচ্ছেন সেটি কোন নিয়মে চাচ্ছেন। কারণ আন্দোলন মানেই রাজপথে গেলে মারপিট, মাথা ফাটাফাটি, গুলী-রক্ত। মামলা চালানোর খরচ কে দেবে? অনেকেই শুধু মামলা চালাতে গিয়ে নি:স্ব হয়ে গেছেন। দেশ ছেড়েছেন। চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। মুখে মুখে একাত্মতা পোষণ করলে হবে না। দলীয় বা জোটের তহবিল কি আছে? মামলা চালাতে না পারলে আন্দোলনে যাওয়া যাবেনা। আবার একটি কথা হচ্ছে আন্দোলন না হলে এই সরকার সরবে না। কথা হচ্ছে আমরা মামলা মোকাবেলা করবো নাকি আন্দোলনে যাবো। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

সংগ্রাম : আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারেনা বলে তারপরও বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। ২০ দল তাদের সমর্থন দিচ্ছে, এটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : সিটি নির্বাচনে বিএনপি যাবে। তাদের যুক্তি হচ্ছে এই সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না সেটি প্রমাণ করা। আরেকটি হচ্ছে, দলগুলো যদি দৌড়াদৌড়ি করে তাহলে রক্তসঞ্চালন বাড়বে। সবার সাথে দেখা হবে। সরকার তো জিততে দিবেনা এটা নিশ্চিত। কিন্তু আন্দোলনের একটি শক্তি সঞ্চার হবে।  

সংগ্রাম : গত ১৩ ডিসেম্বর একদল দুর্বৃত্ত সংগ্রাম কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে। পত্রিকাটির সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক আবুল আসাদকে টেনে হিঁচড়ে নিচে নামানো হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : অতি সম্প্রতি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার উপর আক্রমণ হয়েছে। আমি শুনেছি দৈনিক সংগ্রাম সংবাদ পরিবেশনায় ভুল করেছে। এখন কথা হচ্ছে, সেই ভুলের সংশোধনী কি নিয়ে হবে, কিভাবে হবে বা শাস্তি কি হবে সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু একটি সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে বেসরকারিভাবে গিয়ে আক্রমণ করে, পত্রিকাটির সম্পাদককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে অফিস বন্ধ করে দেয়া যুদ্ধের শামিল। আজকে তো ১৯৭১ সাল নয়, যে আমি আইনের বাইরে। সে আমলে মুক্তিযোদ্ধাগণ শক্রকে বধ করা হয়েছে, বিপক্ষ শক্তি মুক্তিযোদ্ধাদের বধ করেছে। আজকে তো সে অবস্থা নেই। আশা করি সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখবে এবং গণমাধ্যমের কোন অংশ যদি দেশের মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক বা রাজনীতিক ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে তার বিচার আইনী প্রক্রিয়ায় হবে। আইন কারো হাতে যেন না যায়। আইনকে যেন কেউ হাতে তুলে না নেয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে দৈনিক সংগ্রামের 

স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

 

 

 

 

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ