ঢাকা, মঙ্গলবার 29 September 2020, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ১১ সফর ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

সা ক্ষা ৎ কা র -কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ চেয়ারম্যান এলডিপি

 

গণমাধ্যমসহ আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে সত্যকে তুলে ধরা এবং সেটি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যেন কেউ এমন না ভাবি যে, এই রাষ্ট্র বা সমাজ আমার একার সম্পত্তি। 

সংগ্রাম : দেশের সংবাদপত্র এবং অন্যান্য গণ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে দেশ ও জনগণের জন্যে কতটা জরুরী মনে করেন? 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের কাজ হলো সমাজের সমস্যাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা। সরকারকে সচেতন করা। তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা। অণ্যদিকে দেশে কি ধরণের কাজ হচ্ছে বা না হচ্ছে তা সবাইকে জানানো। তবে এখানে শর্ত থাকে যে, একজন সাংবাদিককেও দায়িত্বশীল হতে হবে। মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একে অপরকে দোষারোপ করার যে প্রবণতা যেন না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে কোন সংবাদ ছাপানোর পূর্বে সাংবাদিকের নিকট সঠিক তথ্য থাকা উচিৎ। অন্যথায় কারো বিরুদ্ধে কোনো কিছুর বিনিময়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করাটা ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকেও পাপ। সকল ক্ষেত্রে মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। এবং দেশের প্রচলিত নিয়মনীতিকে শ্রদ্ধা করতে হবে। বর্তমানে কাগুজে কলমে দেশ স্বাধীন কিন্তু আমরা কৃতদাসের মতো জাীবনযাপন করছি। 

সংগ্রাম : দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে গণমাধ্যমেও সংকট সৃষ্টি হয়। এর থেকে বেরিয়ে আাসর উপায় কি? 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : আমাদের সকলের উচিত শুধু আল্লাহকে ভয় করা।  মানুষকে নয়। ক্ষমতায় যারা আছেন তাদেরকে ভয় করা নয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করে অন্যায়কে প্রতিহত করা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। নিজের লিখনী শক্তিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা। 

সংগ্রাম : তথ্য-প্রযুক্তি আইন গণমাধ্যমের মাথার উপর ঝুলন্ত খাঁড়ার মত। আপনার অভিমত বলুন 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : এ আইনটা একেবারেই একতরফাভাবে করা হয়েছে। আমি মনে করি প্রত্যেকটি কাজে আমাদের সকলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমি যখন সরকারে থাকি তখন দেশকে বাপের সম্পত্তি মনে করা উচিৎ না। অন্যদিকে সাংবাদিকদের উচিৎ কারো বিরুদ্ধে প্রতিশোধ পরায়ণ না হয়ে বা অন্য কিছুর বিনিময়ে বিরুদ্ধোচরণ না করা। সত্যকে তুলে ধরা এবং প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। 

সংগ্রাম : এলডিপি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম অংশ । আপনি কি মনে করেন জোট গঠনের উদ্দেশ্য এখনো বর্তমান রয়েছে? যদি থাকে তাহলে কিভাবে? 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : বেগম জিয়ার জেলে যাবার পর থেকে জোটের কার্যক্রম তেমন গতিশীল নয়। এখানে নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। আমরা অনেকে নিজের ছায়ার সাথে যুদ্ধ করছি। ঐক্যবদ্ধভাব্ েঅন্যায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিবাদ করা উচিত ছিল তা আমরা করতে পারি নাই। ফলে জনগণ আমাদের উপর আস্থা রাখতে পারছেনা। 

সংগ্রাম : ২০ দলীয় জোটের বাইরে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে যদি কিছু বলেন। 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : আমি কোনভাবেই ঐক্যফ্রন্টের সাথে একমত নই। এবং তাদের কর্মকান্ডের সাথেও সম্পৃক্ততা নেই। সুতারাং জনগণই বিচার করবে এই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সফলতা এবং ব্যর্থতার কি। 

সংগ্রাম : দেশে এখন নানাবিধ সমস্যা বিরাজমান। আপনার দৃষ্টিতে চলমান মূল সমস্যাগুলো কি কি? একইসাথে করণীয় কি? 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ :  দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে। ব্যক্তি বা বাক স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশে ন্যায়বিচার বলতে কিছুই নাই। মানবাধিকার বই-পুস্তকে সীমাবদ্ধ। শুধু বড় বড় দালান, রাস্তাঘাট দিয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করা যায় না। সমগ্র পৃথিবীতে দিনের বেলায় নির্বাচন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন হয় সরকারি অফিসার এবং কর্মকর্তাদের ভোটের মাধ্যমে রাত্রির অন্ধকারে। এ নির্বাচনগুলোতে জনগণের সম্পৃক্ততা মোটেও নেই। জনগণ এবং সরকারের মধ্যে যখন দূরত্ব সৃষ্টি হয় যা বাংলাদেশে হয়েছে। তখন কিন্তু দেশে শান্তি বা আস্থা বা সুশাস কোনটাই থাকে না। এলডিপির পক্ষ থেকে এবং জাতীয় মুক্তি মঞ্চের পক্ষ থেকে বিগত ৬ মাস আমরা বারবার বলে এসেছি, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে কোনো নির্বাচন হয়নি। এ নির্বাচনে জনগণের নূন্যতম সম্পৃক্ততা ছিলনা।

 দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুসংহত করতে হলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দেশে শান্তি শৃঙ্খলা, মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে হলে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার ছাড়া সম্ভব নয়। 

সংগ্রাম : অভিযোগ রয়েছে যে, ২০ দলীয় জোট আগের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ নয়, দীর্ঘদিন ধরে জোটের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচিও নেই। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন।  

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ :  নির্বাচনের পর থেকে ২০ দলীয় জোটের কর্মকান্ডে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। হয়ত বিএনপি নিজেদের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। বা নিজেদের দল গোছাতে ব্যস্ত। জনভিত্তিহীন অনেকেই আমরা এই জোটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি বিধায় ‘গাধা-ঘোড়াকে’ এক সাথে করা হয়েছে। সুতারাং কাজও সেভাবে মন্থর গতিতে এগুচ্ছে। 

সংগ্রাম : প্রশাসনসহ সর্বত্র দলীয়করণের একটি অভিযোগ উঠেছে-এটিকে আপনি কিভাবে দেখছেন।

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : শতভাগ সত্য। সরকারি কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করছেনা। এবং অনেকেই আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। যা দেশের জন্য দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে। কারণ আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই। দায়িত্ববোধ নেই। আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস নেই। যদি থাকতো তাহলে আমরা দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করে কোনো ব্যক্তি বিশেষের আশা আকাংখা পূরণের জন্য অতি আগ্রহী হয়ে জনগণের উপর অত্যাচার, নিপীড়ন, অবিচার বা হয়রানি করতাম না।

সংগ্রাম :  আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারেনা, তারপরও বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। ২০ দল তাদের সমর্থন দিচ্ছে, এটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে নই। তবে ২০ দলের অধিকাংশ নেতারা যে সিদ্ধান্ত নেন তা আমাকেও মেনে চলতে হয়। 

সংগ্রাম : কেউ বলে বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র আছে, কেউ বলে স্বৈরতন্ত্র। আপনি কি বলেন? 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : বর্তমানে এ দুটোর কোনটিরই অস্তিত্ব নেই। আছে শুধু ব্যক্তিতন্ত্র। 

সংগ্রাম : তৃণমূল নেতাকর্মীরা আন্দোলন চায় আর আপনারা নীতিনির্ধারকরা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে কি বলবেন?

 কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : আপনি কোন তৃণমূলের কথা বলছেন তা আমি জানিনা। তবে দেশের জনগণ এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। এবং প্রতিনিয়ত এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে আসছে।

সংগ্রাম : রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা গুঞ্জন রয়েছে-খালেদা জিয়ার মুক্তির বিপরীতে বিএনপির নির্বাচিত ৬ সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করেছেন।  বিষয়টি নিয়ে কি বলবেন?

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : এ বিষয়গুলোর সাথে আমি কোনভাবেই সম্পৃক্ত নই। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য স্পষ্ট ছিল। যেখানে জনগণ নির্যাতিত, নিপীড়িত, অথ্যাচারিত, অবিচারের শিকার হচ্ছে, দিনের বেলায় কোন নির্বাচন হয় নাই, রাত্রির অন্ধকারে সরকারি কবর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভোট দিয়েছে, ওই সরকারের বৈধতা দেয়ার পক্ষে আমি নই।

 সংগ্রাম : আন্দোলন ছাড়া আইনী প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। এটাকে কীভাবে ব্যাখা করবেন। 

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : বিএনপি কি বলেছে সে ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নাই। তারা একটি রাজনৈতিক দল। নিশ্চয়ই বুঝে শুনে ভালো-মন্দ বিবেচনায় নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ব্যাপারে মন্তব্য করা উচিত হবেনা। আমরা সবাই চেষ্টা করছি। তবে মনে হয় সরকার প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ২০ দলের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিবে না।

সংগ্রাম : আগামী ১৭ জানুয়ারি দৈনিক সংগ্রামের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠানটির সাংবাদিক-কর্মচারী ও পাঠকের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ : আমি এবং আমার দলের পক্ষ থেকে আপনাদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। এবং আশা করি জনগণের আশা আকাংখা পূরণে সত্যকে ধারণ করে আপনারা জনগণের পাশে থেকে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবেন।

সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ