মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরোধিতা : প্রেক্ষাপট ও অর্জন

শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজির:

মা ও সন্তানের সেতুবন্ধ হচ্ছে মাতৃভাষা। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য মা যে ভাষা ব্যবহার করেন তাই হয় সে মায়ের সন্তানের মাতৃভাষা। তাই মাতৃভাষায় কথা বলা যেমন কোনো মায়ের, আল্লাহতায়ালা কর্তৃক প্রদত্ত প্রাকৃতিক অধিকার তেমনি তা তার সন্তানের জন্মগত অধিকারও। প্রাকৃতিক ও জন্মগত এই অধিকার থেকে কোনো মানুষকে বঞ্চিত করা অন্যায়। প্রাকৃতিক ও জন্মগত এই অধিকার থেকে বাংলাদেশের মানুষকে, পাকিস্তানী তৎকালীন শাসকগোষ্টির বঞ্চিত করার নির্দেশনা থেকেই মূলতঃ অন্যায়ের সূচনা হয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রক্তঝরা প্রতিবাদ। আল্লাহ যাকে জন্মগতভাবে যে মায়ের কোলে দিয়েছেন, তার সে জন্মগত অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা মানে আল্লাহর অভিপ্রায়কে ব্যর্থ করার চেষ্টা। আল্লাহর অভিপ্রায়কে ব্যর্থ করার চেষ্টা চুড়ান্তভাবে কখনও সফল হয়না। আর এ ধরণের চেষ্টা করার পরিণতি পৃথিবীতে কারো জন্য সুখকর হয়নি। ভাষার প্রশ্নে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠির অবস্থানও ছিল আল্লাহর অভিপ্রায়কে ব্যর্থ করার শামিল। আর এর রক্তাক্ত পরিণতিতে মাতৃভাষা বাংলা, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জন করেছিল। জন্মগত অধিকার ফিরে পেয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ; যারা আল্লাহর অভিপ্রায়েই বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিল।

মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত ইতিহাসের সাথে তিনটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে :

০১. তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দেশ শাসনের নীতি ও তার অপপ্রয়োগ।

০২. বিদ্বগ্ধ সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের পরস্পরবিরোধী ভূমিকা।

০৩. বাংলা ভাষার স্বরূপ নির্ধারণে আরবী, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষার আগ্রাসন। 

তৎকালীন পাকিস্তানের সরকারের দেশ শাসনের নীতি ও তার অপপ্রয়োগ :

১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারী। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তাক্ত হল রাজপথ। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি স্বাধীন নাগরিকদের মাতৃভাষায় বিকশিত হবার, মৌলিক অধিকার ভোগের প্রাকৃতিক সুবিচার (Natural Justice) হতে বঞ্চিত করার ফলে রক্ত পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে মাতৃভাষার অধিকার অর্জন করতে হয়েছিল। ১৯৫২ হতে ২০১৯, ৬৭ বছর পেরিয়ে এসেছি আমরা। মাতৃভাষার অধিকারের নায্যতার প্রশ্নে এই রক্তের ইতিহাস, পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃত্বের পাকিস্তান সৃষ্টির মূল চেতনা, ইসলামী মূল্যবোধ বিষয়ে অজ্ঞতাপ্রসূত অবিমৃশ্যকারিতার ইতিহাস, শ্বাশ্বত মানবাধিকারের লংঘন ও অহংকারের পতনের ইতিহাস। 

মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। বিজিত জাতি হলে অনেক সময়ই বিজয়ীরা এধরণের অনেক মৌলিক অধিকার হতে বিজিত জাতির মানুষকে বঞ্চিত করে। বিজিত ও বিজয়ী, এরকম কোনো সর্ম্পক ছিল না তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। পাকিস্তান ছিল ইসলামী জীবনাদর্শ ও মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে জন্ম নেয়া একটি সদ্য স্বাধীন দেশ। পূর্ব বা পশ্চিম উভয় প্রদেশের নাগরিকরা ছিল স্বাধীন নাগরিক। দুই প্রদেশে দু’টি ভাষা ছিল প্রধান। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষা। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দ্দু ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা সংখ্যাগুরু এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকরা সংখ্যালঘু। 

স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা তাহলে কি হওয়া উচিত? 

সচেতন যে কোনো পাকিস্তানী নাগরিকের কমনসেন্সের (Common Sense) উত্তর হলো দুটো :

০১. সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বিবেচনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাতো বাংলা হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি নাগরিকরাই সংখ্যাগুরু। 

০২. যেহেতু পাকিস্তান, ইসলামী জীবনাদর্শ ও মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে জন্ম নেয়া একটি সদ্য স্বাধীন দেশ তাই, ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা এবং পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় প্রদেশের নাগরিকেরা স্বাধীন ও সমমর্যাদার, এই উভয় বিবেচনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দ্দু হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দ্দু প্রধান ভাষা হলেও তা পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলের মাতৃভাষা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের কর্ণধারেরা যখন উর্দ্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলেন, তখন স্বভাবতই দুটো প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে :

০১. পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তানের পরাধীন কোনো বিজিত রাষ্ট্র কী না? কারণ, যে কথা একটু আগে বলছিলাম, বিজিত জাতি হলে অনেক সময়ই বিজয়ীরা এধরণের অনেক মৌলিক অধিকার হতে বিজিত জাতির মানুষকে বঞ্চিত করে।

০২. ইসলামী জীবনাদর্শ ও মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে জন্ম নেয়া পাকিস্তানের কর্ণধারেরা মাতৃভাষার বিষয়ে ইসলামী জীবনাদর্শ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে উপেক্ষা করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন নাগরিকদের উপর এমন কান্ডজ্ঞানহীন (Nonsense) একতরফা ইসলামী জীবনাদর্শ বিরোধী অজ্ঞতাপ্রসূত মত চাপিয়ে দেয়ার কারণ কী ? 

প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পেলাম, পাক-ভারত উপমাহাদেশ একসময় শাসন করেছে মোগল সম্রাটরা। মোগলরা তাদের মাতৃভাষা ফার্সিকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে এই উপমহাদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। কারণ মোগলরা ছিল বিজয়ী শক্তি। পরবর্তীতে ইংরেজরা মোগলদের পরাজিত করলে ইংরেজরা এই উপমহাদেশ শাসন করলো ২০০ বছর। তখন ইংরেজদের মাতৃভাষা ইংরেজিকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে এই উপমহাদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। বিজয়ী ইংরেজরা ইংরেজি ভাষায় ২০০ বছর শাসন করলো আমাদের এই পাক-ভারত উপমহাদেশ।

পশ্চিম পাকিস্তানীরা, ইংরেজ ও মোগল সম্রাটদের মতো বিজয়ী কোনো শক্তি ছিলনা। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন নাগরিকদের সাথে তাদের আচরণ ছিল বিজয়ীদের মতো। যা ছিল অনভিপ্রেত, অনাকাংখিত, অভদ্রোচিত এবং অসম্মানজনক। মানুষকে যিনি বানিয়েছেন, তিনি তাকে আত্মসম্মানবোধ দিয়েই বানিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিযক (সূরা বানী ইসরাইল : ৭০)।” এই inbuilt আত্মসম্মানবোধের ফলে মোগল বা ইংরেজ শাসনামলে যে আন্দোলন দানা বাধতে পারেনি, ভাষার অধিকার নিয়ে সে আন্দোলন দানা বাধলো, বৃটিশদের নিকট হতে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীন হবার একমাসের মধ্যেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাসেম ছিলেন এই আন্দোলনের অবিসংবাদিত পথ প্রদর্শক। ভাষা আন্দোলনের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। সে কথায় পরে আসছি।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ভাষা ও মানুষ নিয়ে ইসলাম কী বলে তা খুঁজতে গিয়ে পেলাম, পৃথিবীর সকল মানুষের সৃষ্টি এবং সব গোত্র, সম্প্রদায় ও জাতির তাবৎ মাতৃভাষার সৃষ্টি আল্লাহরই। মাতৃভাষার বৈচিত্র্যের মতো, মানুষের বৈচিত্রপূর্ণ বর্ণও আল্লাহর নিদর্শন। আল্লাহ বলেন :

০১. “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো (সুরা হুজুরাত : ১৩)। অর্থাৎ সময়ের পরিক্রমায় আল্লাহ বিভিন্ন জাতি ও গোত্র সৃষ্টি করেন এবং তা পরস্পর পরিচিত হবার লক্ষ্যে। অহংকার, দলাদলি, ঝগড়াঝাটি, শ্রেষ্ঠত্ব ফলানোর জন্য নয়। প্রসঙ্গত: বলে রাখা দরকার যে, বাংলা ভাষাভাষি এই জাতি গঠনে যে সময় পরিক্রম হয়েছে তা সংরক্ষিত তথ্য মতে ৭ম শতক থেকে ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯ শতক পর্যন্ত বিবেচনা করলে ১২০০ বছর। ধর্ম, বর্ণের বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলাভাষা ও বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের জাতি, হাজার বছরের পুরোনো। ৭ম শতকে ‘বাংলা লিপির পূর্বতন রূপ কুটিল লিপি’-র উপর ভিত্তি করে ৯ম-১২শ শতকে “বাংলা ভাষা রূপলাভ” করে।২ 

০২. “তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে (সূরা আর-রাহমান : ৩-৪) আল্লাহ আরো বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য (সূরা রূম : ২২)। অর্থাৎ সাদা, কালো, বাদামী বিভিন্ন বর্ণের মানুষ আল্লাহ তৈরী করেছেন এবং তাদের মাতৃভাষাও তাঁর সৃষ্টি, আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মতো হরেক রঙের মানুষ ও অগণিত মাতৃভাষাও তাঁর নির্দশন। তাই উর্দ্দু ও বাংলাভাষা দুই জাতির (ভাষা ভিত্তিক জাতি) মাতৃভাষা এবং দুটো নির্দশনও। মানুষের মতো মানুষ হতে যে বিশ্বাস ও মূল্যবোধ প্রয়োজন, সে বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দর্শন মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিতে আল্লাহ প্রত্যেক রাসূলকে পাঠিয়েছেন তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষি করে। অর্থাৎ স্বজাতির মাতৃভাষায়। আল্লাহ বলেন, “আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষি করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য (সূরা ইবরাহীম : ০৪)” ধর্ম-বিশ্বাস, বর্ণ ও কর্মের যোজন-যোজন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ‘প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষি করে পাঠানোর কথা বলে’ আল্লাহ ভাষাভিত্তিক জাতির ধারণাকেই এই আয়াতে স্পষ্ট করে দিলেন। রাসূল সা: যে আরব জাতির মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন তাদের সভার ভাষা ছিল আরবী। কিন্তু বিশ্বাসগত বিবেচনায় তাদের কেউ ছিলেন হিন্দু বা মুর্তিপূজক, কেউ ছিলেন ইহুদী, কেউ ছিলেন খৃষ্টান, কেউ ছিলেন অগ্নি উপাসক। বর্ণ বিবেচনায় কেউ ছিলেন শুভ্র, কেউ ছিলেন রক্তবর্ণ, কেউ ছিলেন বাদামী, কেউ ছিলেন ধুসর আর কেউবা ছিলেন নিকষ কালো। এই সকল বৈশিষ্ট্য নিয়েই ছিলো, রাসূল সা:-এর সমসাময়িক আরবী ভাষাভাষি আরবজাতি। ইসলামকে ধারণ করার পর এই আরব জাতিই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা শিখে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌছিয়েছেন আল্লাহর বাণী। পৌছিয়েছেন সভ্যতার আলো। রক্ত, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষের মর্যাদা সমান-মানবজাতিকে এই মৌলিক মানবাধিকারের পথ দেখিয়েছেন তারা। যখন গোটা ইউরোপ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। সভ্যতার আলো বঞ্চিত। আর আজকের আমেরিকাতো তখন আবিষ্কারই হয়নি। সে যাক্, ‘ভাষাভিত্তিক জাতির’ মধ্যেই সেই জাতির মাতৃভাষায় আল্লাহ তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন। 

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি মানুষ বা পৃথিবীর যে কোনো দেশের বাংলা ভাষাভাষি মানুষকে উর্দ্দু ভাষায় পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করে কোনো কিছুই হৃদয়ঙ্গম করানো সম্ভব ছিল না। আর যেখানে আল্লাহ নিজেই বলছেন যে, “আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষি করে পাঠিয়েছি” তাহলে প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষা আল্লাহর কাছে কতটা গুরুত্ব রাখে, তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং ইসলামই যদি পাকিস্তানের জীবনাদর্শ হয়ে থাকে তবে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি মানুষের উপর উর্দ্দুকে চাপিয়ে দেয়ার এই অপচেষ্টা ইসলামী জীবনাদর্শের পরিপন্থি ছিল। পাকিস্তানের মূল চেতনা ও আদর্শের পরিপন্থি ছিল। পাকিস্তানের কর্ণধারদের, পাকিস্তানের অঙ্গীকারকৃত চেতনা ও আদর্শ ইসলাম ও মুসলিম জাতীয়তার সেন্টিমেন্টকে টেকসই করার লক্ষ্যে উর্দুর সাথে বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা অপরিহার্য ছিল। যাতে করে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা সহজেই ইসলামী জীবনাদর্শ তথা ইসলামী মূল্যবোধের সাথে পরিচিতি লাভের সুযোগ পায়। মাতৃভাষা বাংলা ব্যতীত বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের ভেতর অন্যকোনো ভাষায় ইসলামের মূল্যবোধের আলো ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব ছিল না। 

সমসাময়িক বিদ্বগ্ধ বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের পরস্পরবিরোধী ভূমিকা :

বলছিলাম, ভাষা আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম-এর কথা। যিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অবিসংবাদিত পথ প্রদর্শক। আন্দোলনের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী, অলি আহাদ, গাজীউল হক, ভাষা আন্দোলনের এসব কিংবদন্তী ভাষা সৈনিকের মুখে শোনা যাক্ অধ্যাপক আবুল কাসেম-এর কথা। 

ভাষা সৈনিক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী বলেন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ’৪৭ সাল থেকেই এ মহান ঐতিহাসিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে এ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ০১লা সেপ্টেম্বর তাঁর উদ্যোগে এবং নের্তৃত্বেই তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হয়। তিনিই তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী সম্পর্কিত প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দ্দু’ প্রকাশ করেন। ভাষা আন্দোলনের বিপ্লবী মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকারও তিনি প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নেতৃত্বে এবং সভাপতিত্বে আমরা ’৪৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে প্রথম ছাত্র সভা ও প্রতিবাদী মিছিলে স্লোগান তুলি। ... ’৪৮ সালের ১১ই মার্চের আন্দোলন না হলে এবং ১৫ই মার্চের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে বায়ান্নর বিস্ফোরণ কোনোদিনই হতো না। ১৫ই মার্চের রাষ্ট্রভাষা চুক্তির সাথে তৎকালীন সরকার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল বলেই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর বিস্ফোরণ এবং উদ্ভব হয়েছে।”৩

ভাষা সৈনিক অলি আহাদ বলেন, “জাতীয় ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি প্রতিবাদী চেতনার নাম। ... ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তনে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও তমদ্দুন মজলিশ-এ দুটি নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মান্যবর অধ্যাপক আবুল কাসেম-এর একক ঐকান্তিক চিন্তা-চেতনা প্রয়াসের কারণেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তমদ্দুন মজলিশের আবির্ভাব। নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, তাঁর সুযোগ্য পরিচালনা, নির্ভেজাল আন্তরিকতা ও প্রশ্নাতীত নিষ্ঠা তমদ্দুন মজলিশকে ভাষা আন্দোলনে ইতিহাস সৃষ্টির ভূমিকায় অবতীর্ণ করে। নিঃসংশয়ে স্বীকার করতেই হবে ভাষা-আন্দোলন গোড়াপত্তনে শ্রদ্বেয় অধ্যাপক আবুল কাসেম-এর অবদান অনবদ্য ও উত্তরসূরীদের জন্য অনুকরণীয়।”৪ 

ভাষা সৈনিক গাজীউল হক বলেন, “বাংলায় ‘কাব্যে উপেক্ষিতা নায়িকা’ বলে একটা কথা আছে। এদেশের সামগ্রিক ভাষা আন্দোলনকে যদি একটি ছন্দোময় কাব্য হিসাবে বিবেচনা করা যায় তাহলে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম সেই কাব্যের উপেক্ষিত নায়ক। ভাষা আন্দোলনের সুবিশাল ক্যানভাসে এই নায়কের উপস্থিতি উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বরে একটি বিরাট জিজ্ঞাসা নিয়ে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ হিন্দু ও মুসলমান এই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সদ্য গঠিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৪ আগস্ট হতে ১৫ সেপ্টেম্বর মাত্র এক মাস বয়স। তখনও এই দেশের মানুষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশ্ন করতে শিখেনি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চেও তখন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কায়েদে মিল্লাত নওয়াব জাদা লিয়াকত আলী খান, গজনফর আলী খানদের বিরাট দাপট! ... ... ঠিক তেমনি সময়ে এই বাঘাবাঘা নেতাদের মোকাবিলায় এক তরুণ অধ্যাপকের জিজ্ঞাসা এবং তারই প্রদত্ত উত্তর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারেরর ভাষা হবে উর্দ্দু ও বাংলা। এক অসম সাহসীকতাই শুধু নয় এক অনন্য বীর মানসেরই স্বাক্ষর বহন করে। প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলার ঐতিহাসিক ছাত্র সভায় সভাপতিত্ব করেন। যে সভায় সর্বপ্রথম প্রকাশ্য দাবী সুস্পষ্ট এবং তীক্ষøভাবে উত্থাপিত হয়েছিল : ‘বাংলাকে পাকিস্তান ডমিনিয়নের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করা হোক।’ প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম সৃষ্ট তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগেই প্রথম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তাঁরই প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ সেই দিনগুলোতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে সার্বিক প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। বাংলাভাষার আন্দোলন যখন সূতিকাগারে তখন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তাকে মাতৃ¯েœহে লালন করেছেন। তার প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছেন। ১৯ নম্বর আজিমপুরে কাসেম ভাই-এর সান্নিধ্যে আমরা ভাষা সৈনিকেরা উজ্জীবিত হয়েছি।”৫ 

১৯৪৭ সালের ২৮ ও ২৯ জুলাই তারিখে চলন্ত অভিধান খ্যাত বহুভাষাবিদ ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দীকে গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামন্তর হইবে। ... ... কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দীর অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে।... ... যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নাই (কারণ উর্দু পাকিস্তান ডোমেনিয়নের কোনো অঞ্চলের ভাষা নয়। এই অর্থে উর্দুও বিদেশী ভাষা)। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য।” .... “পূর্ব পাকিস্তানের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দীকে গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।”৬

উপরের বিদ¦গ্ধজনদের সবগুলো মতামতই ১৯৪৭ সালের। 

তার পরবর্তী বছর ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ৭ তাঁর এক ভাষণে বললেন (উর্দুতে নয়, ইংরেজীতে) “ But ultimately it is for you, the people of this province, to decide what shall be the language of your province. But let me make it very clear to you that the State Language

of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Any one who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.Without one State Language, no nation can remain tied up solidly together and function. Look at the history of other countries. Therefore, so far as the State Language is concerned, Pakistan’s Language shall be Urdu. But, as I have said, it will come in time.’৮

মাতৃভাষা পছন্দ করে নেবার কোনো অবকাশ কোনো মায়ের সন্তানেরই নেই। তাই বাংলা মায়ের সন্তানের মাতৃভাষা বাংলা হবে - এটা পছন্দ করে নির্ধারণ করার কিছু নেই। যেমনটি পাকিস্তানের গর্ভণর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জনসভায় নির্দেশনা দিয়ে বললেন,‘But ultimately it is for you, the people of this province, to decide what shall be the language of your province.’ আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত প্রকৃতির বিরুদ্ধে পথচলার এই নির্দেশনাই ছিল একটি অন্যায়। মাতৃভাষায় বিকশিত হবার প্রাকৃতিক এই অধিকার থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাভাষাভাষি এদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার এই নির্দেশনা থেকেই অন্যায়ের সূচনা হয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ভাষার অধিকারের প্রশ্নে তখন হিন্দু-মুসলিম, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাভাষাভাষি নাগরিকরাই এই প্রতিবাদে শামিল ছিল। 

কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র উক্ত বক্তব্যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা বিষয়ে দ্ব্যর্থবোধকতা থাকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র মৃত্যুর৯ পরও অমীমাংসিতই থেকে যায়। 

১৯৫২-র ২৬ জানুয়ারী। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ-র মৃত্যুর পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খওয়াজা নাজিম উদ্দীন১০, পূর্ব পাকিস্তানের পল্টন ময়দানের এক ভাষণে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দ্দু” উল্লেখ্য প্রধানমন্ত্রী খওয়াজা নাজিম উদ্দীন ছিলেন একজন বাঙালী। এ উক্তির প্রতিবাদে ব্যাপক গণ বিক্ষোভ শুরু হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩১ জানুয়ারী, ১৯৫২য় খওয়াজা নাজিম উদ্দীনের ভাষা সর্ম্পকিত ঘোষণার প্রতিবাদে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরী হলে আহুত এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পূর্ব পাক মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, আওয়ামী মুসলিম লীগ, নিখিল পূর্ব পাক ছাত্রলীগ, যুবলীগ, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ প্রভৃতি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনের প্রায় ৪০ জন প্রতিনিধি সমবায়ে একটি সর্বদলীয় ‘কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’১১ গঠিত হয়। তৎকালীন ছাত্রনেতা কাজী গোলাম মাহবুব এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। সর্বদলীয় এ সভায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অফিস আদালতের ভাষা ও কেন্দ্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণের জন্য খওয়াজা নাজিম উদ্দীন ১৯৪৮ সালের মার্চে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সংগে যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তা ভঙ্গ করার জন্য তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং অবিলম্বে তাঁর ভাষা সর্ম্পকিত উক্তি প্রত্যাহার করে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে নেয়ার জোর দাবী জানানো হয়। রাষ্ট্রভাষা ব্ংালার দাবীতে দুর্বার গণআন্দোলনের মুখে ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার নুরুল আমিন বিকেলে ঢাকা শহরে একমাসব্যাপী ১৪৪ ধারা জারী করে সভা ও শোভাযাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। আর অন্যদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ২১শে ফেব্রুয়ারী সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান ব্যাপী সাধারণ হরতাল, সভা ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক প্রস্ততি গ্রহণ করা হয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কর্মসূচী সর্ম্পকে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ৯৪, নওয়াবপুরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে জনাব আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার প্রশ্নে দীর্ঘ আলোচনা ও উত্তপ্ত বিতর্কের পর সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।১২ সংগ্রাম পরিষদের সদস্য জনাব অলি আহাদ যে কোনো পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সপক্ষে বক্তব্য রেখে সভায় প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। সর্বজনাব অলি আহাদ, আব্দুল মতিন (আহ্বায়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি), মাওলা (সহ-সভাপতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ) ও শামসুল আলম (সহ-সভাপতি, ফজলুল হক মুসলিম হল) সভায় আনীত প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা ভোট দানে বিরত থাকেন। ৯৪, নওয়াবপুরে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা চলাকালেই ফজলুল হক হল ছাত্রসভা, সলিমুল্লা মুসলিম হল ছাত্র সভা ও মেডিকেল কলেজ ছাত্রসভায় ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ছাত্র সভার এই সিদ্ধান্ত ফজলুল হক হলের ছাত্র আবদুল মমিন ও মেডিকেল কলেজের ছাত্র এম, এ, আজমল নওয়াবপুর গিয়ে জনাব অলি আহাদের মাধ্যমে বৈঠকরত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের জ্ঞাত করান।১৩

১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারী। সকাল থেকেই ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আমতলায় সমবেত হতে শুরু করে। ছাত্ররা তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনকে ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করতে অনুরোধ জানায়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেনা এই শর্তে তিনি সভাপতিত্ব করতে সম্মত আছেন বলে জানান। সাধারণ ছাত্রবৃন্দ বিনয়ের সাথে তাঁর শর্ত গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়। এরপর যুবলীগ নেতা জনাব এম. আর. আখতার মুকুল (মোস্তফা রওশন আখতার)-এর তাৎক্ষণিক প্রস্তাব ও যুবলীগ কর্মী জনাব কামরুদ্দীন শহুদের সমর্থনের মধ্য দিয়ে যুবলীগ নেতা জনাব গাজীউল হকের সভাপতিত্বে প্রায় দুপুর ১২টার দিকে ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রসভা শুরু হয়। সভাপতির ভাষণে জনাব গাজীউল হক ছাত্রসভার পক্ষে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ছাত্রসভা শেষ হওয়ার পর শুরু হল ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার প্রতিবাদী মিছিল।১৪

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেইটসহ চারিদিকে তখন সশস্ত্র পুলিশের প্রহরা। 

ছাত্ররা কলাভবনের প্রধান গেইট দিয়ে বের হওয়া মাত্রই পুলিশ ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে এগিয়ে আসে। চারজন চারজন করে মিছিল করে তারা এগিয়ে যায়। ছাত্রীদের এ মিছিল প্রায় বিনা বাধায় এগিয়ে যেতে থাকে। এ মিছিলে ছিলেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের জি. এস. (ডক্টর) শাফিয়া খাতুন, (ডক্টর) সুফিয়া আহমেদ, শামসুন্নাহার আহসান, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর মাহমুদ, মাহফিল আরা, খোরশেদী খানম এবং আরো অনেকে।১৫ ছাত্রীদের মিছিল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেইন গেইট পর্যন্ত এলে ছাত্ররাও দেয়াল টপকে চারিদিক থেকে মিছিলে যোগ দিতে থাকে। এমন সময় টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া শুরু হয়। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে মিছিলে ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল আরো দুর্বার ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে দুর্বার প্রতিবাদী মিছিল ঠেকাতে আনুমানিক বেলা ০৩টার দিকে পুলিশের গুলি শুরু হয়। শহীদ হন আবুল বরকত, জব্বার, শফিউর, সালাহউদ্দিন আরো নাম না জানা অনেকে।১৬

এভাবে জীবনের দামে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষার অধিকার। বাংলাভাষা, রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে, পাকিস্তানের সংবিধানে।

বাংলা ভাষার স্বরূপ নির্ধারণে আরবী, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষার আগ্রাসন :

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর হতে বাংলা ভাষার উপর একের পর এক আগ্রাসন চলতে থাকে। উর্দু হরফে বা আরবী হরফে বাংলাভাষার নুতন রূপ তৈরী, এবং বাংলাভাষা ও সাহিত্যে মৃত সংস্কৃত ভাষার শব্দ প্রয়োগ ও ব্যাকরণ প্রনয়ণের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। 

উদ্দর্ুু বা আরবীর আদলে বাংলা হরফ প্রর্বতনের বিরুদ্ধে ১৯৪৯ সালের ৪ঠা মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ‘পূর্ব পাকিস্তানের হরফ সমস্যা ও সোজা বাংলা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রহমান খান। সভায় ‘সোজা বাংলা’ বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভায় বাংলা হরফ পরিবর্তনের সুপারিশের বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন করে প্রস্তাব গৃহীত হয়।১৭

সমসাময়িক সময়ে তমদ্দুন মজলিসের চট্রগ্রাম শাখা ও পূর্ব-পাকিস্তানের ছাত্রলীগের চট্রগ্রাম শাখার উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও বাণিজ্য মন্ত্রী ফজলুর রহমান-এর বাংলা হরফ পরিবর্তনের তৎপরতা সর্ম্পকে একটি ‘খোলা চিঠি’ প্রচার করে, যেখানে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় :

“আসল কাজ না করে শিক্ষা বিভাগের অদ্ভুত পরিকল্পনা হরফ সমস্যা নিয়ে আপনি বড্ড বাড়াবাড়ি আরম্ভ করেছেন। বাংলা হরফে নাকি হিন্দুয়ানীর গন্ধ পাচ্ছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন যে বাংলা ভাষার ¯্রষ্টা ও বাংলা হরফের প্রচারক ছিলেন কবি আলাওল, দৌলত কাজী, নছরত শাহ? একটা জাতির উন্নতি প্রগতি নির্ভর করে তার শিক্ষার উপর। সে শিক্ষা একমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই সম্ভবপর। অথচ লিপির আবরণে আপনি পাকিস্তানের দুই তৃতীয়াংশ অধিবাসীর (যারা অধিকাংশ মুসলমান) মাতৃভাষাকেই হত্যা করবার ব্যাপক যজ্ঞে মেতে আছেন, কেন?” আপনাদের বড় যুক্তি আরবী কোরআন শরীফের অক্ষর। কিন্তু আপনাদের জানা উচিত কোরআন শরীফের অমূল্য সম্পদ আল্লাহর অর্ন্তনিহিত বাণী, আদেশ-নির্দেশ, অক্ষর নয়। ইসলামী সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাকে আরবী হরফে লেখার দরকার নেই। দরকার কোরআনের শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়া। কিন্তু তা না করে কোরাআনের শিক্ষাকে ছেড়ে হরফ নিয়ে-আত্মাকে ছেড়ে খোলস নিয়ে টানাটানিতে কেন মত্ত রয়েছেন? ইসলামের নাম দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করবার একি প্রচ্ছন্ন প্রয়াস নয়?”১৮

বাংলাকে আরবী হরফে লেখার পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির সে অবিমৃশ্যকারী প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাংলাকে সংস্কৃতায়নের বৃটিশ আমল হতে পরিচালিত প্রচেষ্টাও অব্যাহত ছিল। বৃটিশ আমল হতে পরিচালিত বাংলা বিদ্বেষী সে প্রচেষ্টার স্বরূপ নিয়ে ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, “বৃটিশ বিদ্বেষী মুসলমানদের প্রভাব ও ঐতিহ্য থেকে বাংলা ভাষাকে মুক্ত করার মানসে বৃটিশ সা¤্রাজ্যের আমলে ফোর্ট উইলিয়াম তথা হিন্দু কলেজের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে সহজ বাংলা ভাষা ও বর্ণমালাকে সংস্কৃতায়িত করা হয়েছিল (দ্রষ্টব্য : ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’-ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দ্বিতীয় খন্ড, ১৯৬৫), যদিও সংস্কৃত পন্ডিতেরা বাংলাকে ছোট লোকের ভাষা বলে ঘৃণা করতেন। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সে ঘৃণার পক্ষে তারা ধর্মকেও কাজে লাগিয়েছেন। তারা বলেছিলেন, বাংলা ভাষায় লিখলে পড়লে ‘রৌরব’ নামক নরকে যেতে হবে। বাংলা বিদ্বেষী এই সংস্কৃত পন্ডিতেরাই বৃটিশের অনুগ্রহ লাভের জন্য বাংলা চর্চা শুরু করেন এবং তাদের বর্ণগত (ঈধংঃব) সুবিধা ও বৃটিশের ইচ্ছানুসারে বাংলাকে সংস্কৃতায়িত করে কৃত্রিম ও জটিল করে তোলেন। এ বিষয়ে পশ্চিম বঙ্গের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলার ‘ষ’ ও ‘ণ’ বর্ণ দুটি আমদানী করা উচিত হয় নাই। ই-কার, ঈ-কার, উ-কার, ঊ-কার, তিন-শ’ (স, ষ, শ), দুই জ (জ, ঝ) সম্বন্ধে একই কথা বলা চলে। সংস্কৃত ণ ও ষ কে অনাবশ্যকভাবে আমদানী করে আমরা ণত্ব বিধির ও ষত্ব বিধির মত জটিল ব্যাকরণের নিয়মে আমাদের ভাষাকে বন্দী করে রেখেছি। এইরূপ বহু সংখ্যক সংস্কৃত নিয়ম-নীতির ফলে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, উচ্চারণ ও বানান হয়ে পড়েছে অবৈজ্ঞানিক ও জটিল।”১৯

বাংলাভাষার স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত এ নিয়ে বিদ্বগ্ধজনদের মতামত ছিল এমন :

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম

যে সমস্ত শব্দ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে ও বুঝে, তার মূল যে ভাষা হতেই আসুক না কেন-তা সমস্তই বাংলা ভাষার শব্দ।২০

ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক অনেক দূর। যাঁহারা বাংলাকে সংস্কৃতের পথে চালাইতে চান, তাঁহাদের চেষ্টা সফল হইবার সম্ভাবনাও খুব কম।

সংস্কৃতের গতি একরূপ ছিল। এতদিনে বাংলার গতি আরেকরূপ হইয়া গিয়াছে। এখন এই বাংলাকে সংস্কৃতের দিকে চালাইবার চেষ্টা আর গঙ্গার ¯্রােতকে হিমালয়ের দিকে চালাইবার চেষ্টা একইরকম।২১

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যত বড় নিষ্ঠাবান হিন্দুই হোন না কেন ঘোরতর রাগারাগির দিনেও প্রতিদিনের রাশি রাশি তৎসম ও তদ্ভব মুসলমানী শব্দ উচ্চারণ করতে তাদের কোনো সংকোচ বোধ হয় না। ... ... বদমায়েশকে দুর্বত্ত বললে তার চোট বেশী লাগবে না। এই শব্দগুলি যে এত জোর পেয়েছে তার কারণ বাংলা ভাষার প্রাণের সঙ্গে এদের সহজ যোগ হয়েছে।২২

কবি কাজী নজরুল ইসলাম

আমি শুধু ‘খুন’ নয়, বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবী ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। ... ... বাংলার কাব্যে লক্ষীকে দুটো ইরানি জেওর পরালে তার জাত যায়না। বরং তাঁকে আরও খুবসুরতই দেখায়। 

... ... আজকে কাব্য লক্ষীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই মুসলমানি ঢঙের। আদালতকে না হয় বিচারালয় বলব, কিন্তু নাজির, পেশকার, উকিল, মোক্তারকে কি বলব? আরবী, ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি-আমার বহু আগে ভারত চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।২৩ 

প্রমথ চৌধুরী

আমাদের কর্মজীবনের যা ভিত্তি অর্থাৎ দেশের মাটি, তারও নাম জমি। বাংলার মত মিত্র ভাষা এক উর্দু বাদ দিলে ভারতবর্ষে বোধ হয় আর দ্বিতীয়টি নেই। তারপর আমাদের কর্মজীবনের যা চড়া অর্থাৎ আইন-আদালত, তার ভাষাও আরবী-ফার্সি। আরজি থেকে রায়, জরিমানা, পর্যন্ত মামলার আদ্যোপান্ত সকল কথাই বাঙলা ভাষায় মুসলমানের দান।২৪

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

“একদল খাঁটি সংস্কৃতবাদী-যে গ্রন্থে সংস্কৃতমূলক শব্দ ভিন্ন অন্য শব্দ ব্যবহার হয়, তাহা তাঁহাদের বিবেচনায় ঘৃণার যোগ্য। ... ... যে ভাষা বাঙ্গালা সমাজে প্রচলিত, যাহাতে বাঙ্গালার নিত্য কার্য সকল সম্পাদিত হয়, যাহা সকল বাঙ্গালীতে বুঝে, তাহাই বাঙ্গালা ভাষা-তাহাই গ্রন্থাদির ব্যবহারের যোগ্য। অধিকাংশ সুশিক্ষিত ব্যক্তি এক্ষণে এই সম্প্রদায়ভুক্ত। ... ... যদিও আমরা এমন বলিনা যে ঘর প্রচলিত আছে বলিয়া গৃহ শব্দের উচ্ছেদ করিতে হইবে, অথবা মাথা শব্দ প্রচলিত আছে বলিয়া মস্তক শব্দের উচ্ছেদ করিতে হইবে। কিন্তু আমরা এমত বলি যে, অকারণে ঘর শব্দের পরিবর্তে গৃহ, অকারণে মাথার পরিবর্তে মস্তক, অকারণে পাতার পরিবর্তে পত্র এবং তামার পরিবর্তে তাম্র ব্যবহার করা উচিত নহে। কেননা ঘর, মাথা, পাতা, তামা, হইল বাঙলা-আর গৃহ, মস্তক, পত্র, তাম্র হইল সংস্কৃত। বাঙলা লিখিতে গিয়া অকারণে বাঙলা ছাড়িয়া সংস্কৃত কেন লিখিব? আর দেখা যায় যে, সংস্কৃত ছাড়িয়া বাঙলা শব্দ ব্যবহার করিলে রচনা অধিকতর মধুর, সুস্পষ্ট ও তেজস্বী হয়। “হে ভ্রাত:” বলিয়া যে ডাকে, বোধ হয় যেন সে যাত্রা করিতেছে, “ভাইরে” বলিয়া যে ডাকে, তাহার ডাকে মন উছলিয়া উঠে। ... ... বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবে-যতটুকু বলিবার আছে, সবটুকু বলিবে-তজ্জন্য ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য, যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন তাহা গ্রহণ করিবে, অশ্লীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তারপর সেই রচনাকে সৌন্দর্যবিশিষ্ট করিবে-কেন না, যাহা অসুন্দর, মনুষ্যচিত্তের উপরে তাহার শক্তি অল্প। ... ... আমরা দেখিয়াছি, সরল প্রচলিত ভাষা অনেক বিষয়ে সংস্কৃতবহুল ভাষার অপেক্ষা শক্তিমতী। ” বঙ্কিমচন্দ্র আরো বলেন, “... ... ... আমাদের স্থুল বুদ্ধিতে ইহাই উপলব্ধি হয় যে, যাহা বুঝিতে না পারা যায়, তাহা হইতে কিছু শিক্ষালাভ হয় না। আমাদের এইরূপ বোধ আছে যে, সরল ভাষাই শিক্ষাপ্রদ। ... ... স্থুল কথা, সাহিত্য কি জন্য? গ্রন্থ কি জন্য? যে পড়িবে, তাহার বুঝিবার জন্য। না বুঝিয়া, বহি বন্ধ করিয়া, পাঠক ত্রাহি ত্রাহি করিয়া ডাকিবে, বোধ হয় এ উদ্দেশ্যে কেহ গ্রন্থ লিখে না। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে যে ভাষা অধিকাংশ লোকের বোধগম্য-অথবা যদি সকলের বোধগম্য কোন ভাষা না থাকে, তবে যে ভাষা অধিকাংশ লোকের বোধগম্য তাহাতেই গ্রন্থ প্রণীত হওয়া উচিত। ... ... অপ্রচলিত ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করিতে চেষ্টা করিবেন না। ... ... এ বাঙ্গালাদেশে কোন চাষা আছে যে, ধান্য, পুস্করিণী, গৃহ বা মস্তক ইত্যাদি শব্দের অর্থ বুঝে না। যদি সকলে বুঝে তবে কি দোষে এই শ্রেণীর শব্দগুলি বধার্হ? বরং ইহাদের পরিত্যাগে ভাষা কিয়দংশে ধনশূন্য হইবে মাত্র। নিষ্কারণ ভাষাকে ধনশূন্য করা কোন ক্রমে বাঞ্ছনীয় নহে।” 

বাংলাভাষা নিয়ে উপরোক্ত বিদ্বগ্ধজনদের এসব কথা বাংলাভাষা কিভাবে বিকশিত হবে তার একটি নিখুঁত রোডম্যাপ যেন। রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উপর আরবী হরফ বা উর্দু হরফের আগ্রাসনের যেমন অবসান হয়েছে, তেমনি বিদ্বগ্ধ ঐসব সুধীজনদের মতামতে সংস্কৃতভাষার আগ্রাসনও লুপ্ত হয়েছে।২৫

শেষ কথা 

অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে বাংলাভাষা আজ যে অবস্থানে দাড়িয়ে আছে, বাংলা ভাষার পথচলা এখন যতটা মসৃণ হয়েছে তা যে ভাষার জন্য দীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রামের ফসল, এ কথা বলাই বাহুল্য। এই মসৃণ পথে চলার দায়িত্বও রয়েছে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত। এখন ভাষার উৎকর্ষতা প্রয়োজন। প্রয়োজন ভাষাকে ধনী করা। প্রয়োজন বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধি করা। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসের প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন হলেও ভাষার প্রশ্নে বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষি মানুষ এক সুতোয় গাঁথা। টেকচাঁদ ঠাকুর, ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড: সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম, ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রমথ চৌধুরী ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এসব প্রথিতযশা বাংলা ভাষার বিদ্বগ্ধজনদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন হলেও বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারকে ধনী করতে, বাংলাভাষার গতিপথকে সঠিক নির্দেশনা দিতে তাঁদের কথাগুলো চির অনুসরণীয়। এরা সবাই ছিলেন বাংলা ভাষার উৎকর্ষের আপনজন ও সাধক।

====

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার খওয়াজা নাজিম উদ্দীন, ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারী ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক জনসভায় এই ঘোষণা দেন : “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দ্দু এবং উর্দ্দু হরফে বাংলা লিখনের প্রচেষ্টা সাফল্যমন্ডিত হইতেছে।” উল্লেখ্য প্রধানমন্ত্রী খওয়াজা নাজিম উদ্দীন ছিলেন একজন বাঙালী।

মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা -১৮০।

মোস্তফা কামাল, ভুমিকা, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮। 

মোস্তফা কামাল, প্রাসংগিক কথা, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮। 

মোস্তফা কামাল, এই প্রসংগে, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮।

মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি:, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭। 

Mohammad Ali Jinnah, (25 December 1876-11 September 1948 in Karachi) was a Pakistani politician, ... After the partition of Pakistan, he became the Governor-General of Pakistan. As a mark of respect, Pakistanis call him Quaid-e-Azam. Quaid-e-Azam is a phrase which, in the Urdu language, means “the great leader.

২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক জনসভায় প্রদত্ত ভাষণ হতে উদ্বৃত, মোস্তফা কামাল, ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা-৩৮৩।

 ০৯. On September 11, 1948, just a little over a year after he became governor-general of Pakistan, Jinnah died of tuberculosis near Karachi, Pakistan—the place where he was born. 

 10. Former Prime Minister of Pakistan, Sir Khawaja Nazimuddin, KCIE, CIE, was a Bengali politician, conservative figure, and one of the leading founding fathers of Pakistan. He is noted as being the first Bengali leader of Pakistan who led the country as Prime Minister, as well as the second Governor-General. 

Born : July 19, 1894, Dhaka,

Died : October 22, 1964, Dhaka,

Award : Order of the Indian Empire

Resting place : Mausoleum of three leaders

Previous offices : Prime Minister of Pakistan (1951–1953), Governor-General of Pakistan (1948–1951)

Education : University of Cambridge, Dunstable Grammar School, Aligarh Muslim University, Trinity Hall Cambridge.

 ১১. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-৯২।

 ১২. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-৯৭।

 ১৩. বিশেষ সাক্ষাতকার, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ, মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ প্রাগুক্ত, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা-৩২৬।

 ১৪. বিশেষ সাক্ষাতকার, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ, মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ প্রাগুক্ত, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা-৩২৮।

 ১৫. বিশেষ সাক্ষাতকার, ভাষা সৈনিক ডঃ শাফিয়া খাতুন, মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ প্রাগুক্ত, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা-২১৯।

 ১৬. বিশেষ সাক্ষাতকার, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ, মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’ প্রাগুক্ত, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা-৩৩০।

১৭. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, “আরবী হরফ প্রবর্তনের চেষ্টা”, পৃষ্ঠা-(৭) ৯৭।

 ১৮. সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯৪৯।

 ১৯. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, “বাংলা চালূ প্রসঙ্গে”, পৃষ্ঠা-১০৭।

 ২০. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-১৮।

 ২১. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-১৮।

 ২২. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-১৬১।

 ২৩. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-১৬৬।

২৪. মোস্তফা কামাল, ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও ভাষা আন্দোলন’, ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৮, পৃষ্ঠা- ১৭৯।

 ২৫. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালা ভাষা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও সৈয়দ আকরম হোসেন সম্পাদিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২। পৃষ্ঠা-২৩-৩১।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ