বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কয়েক’শ টন প্লাস্টিক পোস্টার ঢাকার ড্রেন ও নালা-নর্দমায় ॥ পানিবদ্ধতার আশঙ্কা 

মুহাম্মদ নূরে আলম: সদ্য সমাপ্ত ঢাকা সিটি নির্বাচনের ভোটের পোস্টারে ব্যবহৃত প্লাস্টিক দীর্ঘদিন অপচনশীল থাকে। এগুলো দ্বিতীয়বার ব্যবহারও করা যায় না। এ ধরনের ওয়ান টাইম প্লাস্টিক যখন বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ, তখন উৎসবের সঙ্গে ঢাকায় লেমিনেটেড পোস্টারে চলেছিল নির্বাচনী প্রচারণা। ১ ফেব্রুয়ারি ভোট শেষ হলেও এসব প্লাস্টিকের শেষ ঠিকানা এখন রাজধানী ঢাকার পাড়া মহল্লার ড্রেন ও নালা-নর্দমা। এতে একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে পরিবেশের ভয়ংকর ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঢাকা সিটি নির্বাচনে ব্যবহৃত কয়েক’শ টন প্লাস্টিক পোস্টার এখন জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিকল করার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনে মোড়ানো পোস্টারে কিছু কিছু ছিঁড়ে পড়ছে পথে, নালা-নর্দমায়। আইনে নিষিদ্ধ পলিথিন দিয়ে পোস্টার মুড়িয়ে প্রচারণা প্রার্থীদের দায়িত্বহীনতাকে তুলে ধরেছে। এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে নগরবাসীর মধ্যে। তারা বলছেন, পলিথিনের কারণে হরদম নগরীর পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যখন-তখন বন্ধ হচ্ছে নালা-নর্দমা। তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে নগরবাসীর সেবার জন্য ভোটে নেমে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেরাই পরিবেশ দূষণের কারণ হচ্ছেন।

ভোট শেষে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। অথচ একেবারেই নির্বিকার সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর। হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা অমান্যের বিরুদ্ধে কোনো সংস্থাকেই এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অথচ রাজধানী ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচারণার প্রথমদিকে প্রায় ২৫০০ টনের  বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন দুটি সংস্থা। সিটি নির্বাচনে প্রতিযোগী প্রার্থীরা তাদের পোস্টার, লিফলেট এবং কর্মীদের পরিচয়পত্রের জন্য এসব প্লাস্টিক ব্যবহার করেছেন। 

পলিথিনে মোড়ানো বিপুল পরিমাণ পোস্টার নিয়ে চিন্তিত সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এসব পোস্টার সুষ্ঠুভাবে অপসারণ করা না হলে ম্যানহোল ও ড্রেনে আটকে পয়ঃনিষ্কাশনে বাধার কারণ হতে পারে। একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন শেষে প্রার্থীরা এসব পোস্টারের খবর রাখেন না। সিটি করপোরেশনের লোকজনকেই তা অপসারণ করতে হয়। 

শহরজুড়ে টানানো লেমিনেটেড পোস্টার নিয়ে গবেষণা করেছে ঢাকার দ’ুটি সংস্থা। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং পরিবেশ বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। 

এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি জানান, তারা ৩০ প্রার্থীর পোস্টার ধরে গবেষণাটি করেছেন। এতে দেখা যায়, প্রতিটি পোস্টারে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের গড় ওজন ১৩ দশমিক ৪৭ গ্রাম। কোনো কোনোটিতে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৫ গ্রাম প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১০০ টনের বেশি প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়েছে ঢাকার দুই সিটির ভোটের পোস্টারে।

ড. কামরুজ্জামান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রার্থীরা সবুজ নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা নিজেরাই প্রচারের মাধ্যমে আত্মঘাতী কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার পরিত্যক্ত হয়ে ড্রেনে চলে যাচ্ছে। বর্ষাকালে এর প্রভাব বোঝা যাবে।

এসডো’র মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা শহরের ৪৮টি প্রেস এবং প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে প্লাস্টিক দূষণের এই ভয়াবহ চিত্র দেখেছেন। প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থীদের প্রত্যেকে গড়ে ৩০ লাখের বেশি প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টার টাঙিয়েছেন। এ বছর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য মেয়র এবং কাউন্সিলর আনুমানিক ৩০ কোটি লেমিনেটেড পোস্টার টাঙিয়েছে। হোসেনের কাছে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, নির্বাচনী প্রচারণায় ২৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনের বিষয়টি তারা কিভাবে নিশ্চিত হয়েছেন? তিনি বলেন, আমরা কিছু পোস্টার থেকে কাগজ আলাদা করে শুধু প্লাস্টিকের কভারটি মেপে দেখেছি। সেখানে দেখা গেছে, একটি পোস্টারের জন্য দুই গ্রাম প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে।

এসডো’র শাহরিয়ার হোসেন বলেন, কয়েকদিন পরে যারা দায়িত্ব নেবেন তারাও জানেন না যে এটা কতটা ভয়াবহ হবে। এটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। তিনি আশংকা করেন, নির্বাচনের পর এসব পোস্টারের দায়িত্ব কেউ নেবে না। শেষ পর্যন্ত শহরের ড্রেন, নালা এবং নর্দমায় এসব প্লাস্টিকের স্থান হবে বলে তিনি ধারণা করছেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনী প্রচারে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক  পোস্টার ব্যবহৃত হয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, এবার ভোট উপলক্ষে ঢাকায় ব্যবহৃত হয়েছে ২৫০০ টনের বেশি পরিবেশবিধ্বংসী ওয়ান টাইম প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে নির্বাচনি পোস্টারে। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ভোটের পোস্টারে লেমিনেশন এবং তা প্রদর্শন চলে পুরো সময়েই।

ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৭৫৭ জন লড়ছেন দুই সিটিতে। কোনো কোনো মেয়র প্রার্থী পাঁচ লাখ পর্যন্ত পোস্টার ছাপিয়েছেন। কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত পোস্টার ছাপানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সে হিসাবে এবার ছাপা হয়েছে এক কোটির বেশি পোস্টার। এর অন্তত ৮০ শতাংশই লেমিনেটেড।

লেমিনেটেড পোস্টার ছাপা ও প্রদর্শন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে গত ২২ জানুয়ারি রুল জারি করেন হাইকোর্ট। মানার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। নির্বাচনের সময় সরেজমিন ঘুরেও দেখা গেছে, নির্বিঘেœই ছাপাখানায়ও ছাপানো হয়েছে লেমিনেশন পোস্টার। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় লেমিনেটেড পোস্টার ছাপা ও প্রদর্শন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এতে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, শিল্প সচিব, স্বাস্থ্য সচিব এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতি চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। তবে পোস্টারে লেমিনেশন ও প্রদর্শন বন্ধের বিষয়ে কোনো সংস্থাকেই তৎপর হতে এখনও দেখা যায়নি। 

ঢাকা দক্ষিণের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হয়েছে কিনা, তার জানা নেই। তবে ভোটের পরদিন থেকেই রাজধানীর পোস্টারগুলো অপসারণে তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে এখনও ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় সিটি নির্বাচনের পোস্টার রয়ে গেছে। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান গণমাধ্যমকে বলেন, পোস্টারে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো এটি ক্ষতিকর। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পরিবেশ ভালো রাখবেন এ প্রত্যাশা সবার। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি বিষয়টি না বোঝেন তাহলে পরিবেশ ভালো থাকবে কিভাবে?

নগরভিত্তিক সামাজিক সংগঠন ঢাকাবাসী’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শুকুর সালেক চিন্তিত এসব লেমিনেটেড পোস্টারের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তিনি আশঙ্কা করছেন নগরের সর্বত্র ব্যবহৃত এসব পোস্টার নগরের জন্য ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। শুকুর সালেক বলেন, আগে পোস্টার লাগানো হতো আঠা দিয়ে। এবার পোস্টার লেমিনেটেড বলে স্টাপ্লার পিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে এসব পোস্টার ছিঁড়ে-ছুটে পড়ছে। এই পোস্টারের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না হলে ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একটা দায়িত্ব রয়েছে। তারা নজর রাখবেন আশা করি।

নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে পোস্টারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কাগজ, কাপড়, রেক্সিন, ডিজিটাল ডিসপ্লেবোর্ড বা ইলেকট্রনিকস মাধ্যমসহ অন্য যেকোনো মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত কোনো প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং যেকোনো ধরনের ব্যানার ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।

অপরদিকে  ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬/ক ধারায় বলা হয়েছে, সরকার, মহাপরিচালকের পরামর্শ বা অন্য কোনভাবে যদি সন্তুষ্ট হয় যে, সকল বা যে কোন প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ, বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিনের তৈরী অন্য কোন সামগ্রী বা অন্য যে কোন সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তাহা হইলে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, সমগ্র দেশে বা কোন নির্দিষ্ট এলাকায় এইরূপ সামগ্রীর উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করিবার বা প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্তাধীনে ঐ সকল কার্যক্রম পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশ জারি করিতে পারিবে এবং উক্ত নির্দেশ পালনে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি বাধ্য থাকিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ